কর ব্যবস্থায় ‘বিপ্লব’ ও অর্থনৈতিক সংস্কার তদারকিতে নতুন কাঠামোর প্রস্তাব

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪৭আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪৭

কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে কর ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকিতে পৃথক ‘ইকোনমিক রিফর্ম অ্যাক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেছেন, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক এবং কর ব্যবস্থার দুর্বলতা অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব প্রস্তাব উঠে আসে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। এ সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে না; বরং পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানি একটি নেতিবাচক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। ফলে অনেক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। করজাল সম্প্রসারণ করতে হলে এ ধরনের হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই। এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে সহনশীল হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। খেলাপি ঋণ কমাতে বিদ্যমান কাঠামোগত সমস্যা দূর করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য ‘ইকোনমিক রিফর্ম অ্যাক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে কার্যত ‘বিপ্লব’ ঘটাতে হবে। তার মতে, চলতি বাজেটে রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি বলেন, বাজেটে কিছু ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এ কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতির সংস্কার জরুরি।

জনগণ যে পরিমাণ কর পরিশোধ করছেন, তার সবটুকু রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে না বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া বিদেশি ঋণ গ্রহণ ও ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের নীতিমালা ও তার বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে অনেক ভালো নীতিরও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে দেশ যতটা উদার হওয়ার চেষ্টা করছে, আমদানির ক্ষেত্রে এখনও তুলনামূলক কঠোর নীতি ও উচ্চ শুল্কহার বজায় রয়েছে। এতে স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে।

এলডিসি উত্তরণের জন্য হাতে থাকা সময়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত কৌশল প্রণয়ন ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

সেমিনারের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ৯৬ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসে। বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও প্রস্তাব দেন তিনি।

প্রাক্তন সভাপতি আবুল কাসেম খান দেশের লজিস্টিক খাতের উন্নয়নে সরকারের একটি একক সংস্থা গঠন এবং সব করদাতার জন্য কর কার্ড চালুর প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে দেশীয় কয়লা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন তিনি।

অপরদিকে, প্রাক্তন সভাপতি বেনজীর আহমেদ এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য অর্থনীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। আরেক প্রাক্তন সভাপতি হোসনে খালেদ রিয়েল এস্টেট খাতকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।

সেমিনারে বক্তাদের আলোচনায় একটি বিষয়ই বারবার উঠে আসে—অর্থনীতির সামনে এখন শুধু নতুন নীতি গ্রহণ নয়, বরং বিদ্যমান সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

/জিএম/এম/
সম্পর্কিত
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে সব বাধা দূর করার অঙ্গীকার অর্থমন্ত্রীর
বন্ধ হলো কত কারখানা, চাকরি গেল কতজনের? 
গ্যাস নেই, থেমে যাচ্ছে কারখানা, ঝুঁকিতে লাখো শ্রমিকের চাকরি 
সর্বশেষ খবর
কোন কারণে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’
কোন কারণে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’
ইতিহাসের সাক্ষী, অথচ অযত্নে, যে স্থাপনাগুলো বাঁচানো জরুরি
ইতিহাসের সাক্ষী, অথচ অযত্নে, যে স্থাপনাগুলো বাঁচানো জরুরি
ভাঙচুর ছাড়াই পুরোনো বাড়িকে স্মার্ট করার উপায়
ভাঙচুর ছাড়াই পুরোনো বাড়িকে স্মার্ট করার উপায়
পুলিশের সোর্স পরিচয়ে প্রতারণাকারী গ্রেফতার
পুলিশের সোর্স পরিচয়ে প্রতারণাকারী গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
বাবার শূন্যস্থানে তরুণ বয়সে এমপি, এবার প্রতিমন্ত্রী লিংকন
বাবার শূন্যস্থানে তরুণ বয়সে এমপি, এবার প্রতিমন্ত্রী লিংকন
নতুন দায়িত্ব পাচ্ছেন দুই মন্ত্রী
নতুন দায়িত্ব পাচ্ছেন দুই মন্ত্রী
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে ২৫ বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে ২৫ বাংলাদেশি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ
মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন হুমায়ুন কবিরও, মিল্লাত হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রী
মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন হুমায়ুন কবিরও, মিল্লাত হচ্ছেন পূর্ণমন্ত্রী
এক মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী?
এক মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী?