ভারতে অনুষ্ঠিত গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যায়নি বাংলাদেশ। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ছিল তুঙ্গে। এ নিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মূলত সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ দল।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে মঙ্গলবার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ দলের না যাওয়া নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তথা বিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ছিল না। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে তখন আসিফ নজরুল নিরাপত্তাঝুঁকির কারণ দেখিয়ে স্বাধীন কোনও পর্যবেক্ষণ ছাড়াই এককভাবে বিশ্বকাপে না যাওয়ার নির্দেশ দেন।
২২ পৃষ্ঠার যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে ১২ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে তদন্ত কমিটি। সেখানে তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপও তুলে ধরা হয়। তাতে ক্রিকেটারদের মধ্যে রয়েছেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এছাড়া সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদ সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, বিসিবির কোচ ও ওই সময়ে জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং ওই সময়ের বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীন ফাহিমের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
কমিটি যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গেও কথা বলেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে এই কমিটি সাক্ষাৎকার নেয় বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেজোয়ান উজ জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের।
অবশ্য বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও সেই সময়ের বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি বলে জানায় কমিটি।
সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর জানান, যে আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানের বাদ পড়ার ঘটনাটি ছিল ভারতের ঘরোয়া লিগের সিদ্ধান্ত। আর এটিকে আন্তর্জাতিক কোনও টুর্নামেন্টের সঙ্গে মেলানো উচিত নয়। ক্রিকেটারদের সঙ্গে সভাতেও আসিফ নজরুল শুধুমাত্র নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এ সময় দস্তগীর আরও জানান, যে ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ছিলেন, তিনি হচ্ছেন প্রফেসর ড. আসিফ নজরুল।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনও একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।’
জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা।
সেদিন তিনি বলেছেন, ‘কোনও অনুশোচনা বা প্রশ্নের সুযোগ নেই। এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ও ক্রিকেট বোর্ড। তারা দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার প্রশ্নে আত্মত্যাগ করেছে। এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।’
অথচ এর আগে, ২২ জানুয়ারি আসিফ নজরুল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেটারদের ভারতে পাঠাচ্ছে না। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সিদ্ধান্তের দায় বোর্ড ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি মনে করে, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
তিন সদস্যের এই তদন্ত কমিটিতে ছিলেন- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) ড. এ. কে. এম ওলি উল্যা, সদস্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর ও সাবেক জাতীয় অধিনায়ক, জাতীয় দলের বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।









