কয়েক বছর ধরেই কঠিন সময় পার করছে নাইকি। প্রাচীন গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’র নামে নামকরণ করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া পোশাকের ব্র্যান্ডটি সাম্প্রতিক সময়ে হারাচ্ছে বিক্রি, ক্রেতা ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে বাজারের ব্যবধান।
একসময় ক্রীড়া শিল্পে বড় পরিবর্তন আনা প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রতিষ্ঠিত শক্তি। বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে কঠিন পুনর্গঠন পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তারা। নাইকির সর্বশেষ আর্থিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এলিয়ট হিলের নেতৃত্বে নেওয়া পুনর্গঠন পরিকল্পনা কিছুটা কাজ করছে। তবে পরিবর্তনের গতি দ্রুত নয়। দুই বছর আগে অবসর থেকে ফিরিয়ে হিলকে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে আনা হয়।
এর মধ্যেই ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে হারিয়েছে নাইকি। গত সপ্তাহে ব্র্যান্ডটির সঙ্গে প্রায় ২০ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে দ্রুত বেড়ে ওঠা সুইস প্রতিদ্বন্দ্বী ‘অন’-এ যোগ দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। এমবাপ্পের বিদায় প্রশ্ন তুলেছে, শুধু তারকা খেলোয়াড়দের নয়, তাদের অনুসরণ করা ভক্তদের কাছেও নাইকি কি আগের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ড হয়ে থাকতে পারবে?
অবশ্য নাইকি এখনও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড। তবে নানা ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাবে গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। এতে বাজারমূল্য থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে কোম্পানিটি। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর তালিকা এসঅ্যান্ডপি ১০০ সূচক থেকেও বাদ পড়ে নাইকি।
কোথায় ভুল করেছে নাইকি?
ক্রীড়া খুচরা শিল্পের অভিজ্ঞ বিশ্লেষক ও পরামর্শক ম্যাট পাওয়েলের মতে, নাইকি বেশ কয়েকটি কৌশলগত ভুল করেছে, যেগুলো এখন সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে সরাসরি অনলাইনে গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রির ওপর জোর দেওয়া এবং সীমিত সংস্করণের জুতাকে আরও সহজলভ্য করার সিদ্ধান্ত উল্লেখযোগ্য। পাওয়েলের ভাষায়, জুতাগুলো যত বেশি সহজলভ্য হয়েছে, ক্রেতাদের আগ্রহ তত কমেছে।
নাইকির আরেকটি ভুল ছিল গবেষণা ও উন্নয়নের অর্থ নতুন পণ্যের বদলে ডিজিটাল কার্যক্রমে ব্যয় করা। এতে পণ্যের উদ্ভাবনের গতি কমে যায়। এ নিয়ে রসিকতা করে কেউ কেউ বলেছিলেন, নাইকি যেন নিজেদের ই-বে বানানোর চেষ্টা করছে। মন্তব্যটি করা হয়েছিল ই-বে’র সাবেক প্রধান জন ডোনাহোকে ঘিরে, যিনি নাইকির অনলাইন সরাসরি বিক্রির কৌশলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরে তার জায়গা নেন এলিয়ট হিল।
ডোনাহোর নাইকিতে চার বছরের নেতৃত্বের সময়েই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দামে বড় পতন ঘটে। তার সময়ে মহামারির বিধিনিষেধে অনলাইন কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ায় নাইকির বিক্রি প্রথমে দ্রুত বাড়ে। কিন্তু পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের খরচ কমে যায়। চীনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বাজারে চাহিদা কমতে থাকলে নাইকি ব্যয় কমানো ও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়।
এদিকে ডিজিটাল কার্যক্রমে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ নেয় নতুন প্রজন্মের জুতার ব্র্যান্ডগুলো। দোকানের তাকেও নাইকির জায়গা দখল করে নেয় অন ও হোকাসহ নতুন ব্র্যান্ড। উদ্ভাবনকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে গড়ে তোলা নাইকির জন্য এটি ছিল বড় সতর্কবার্তা।
যে উদ্ভাবন নাইকিকে শীর্ষে তুলেছিল
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি নবাগত মাইকেল জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি করেছিল নাইকি। তখন বাস্কেটবলে নাইকি বড় কোনও শক্তি ছিল না। মূলত দৌড়ানোর জুতার জন্যই পরিচিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
জর্ডান এনবিএতে খেলার আগেই নিজেদের পুরো বাস্কেটবল বাজেট তার পেছনে বিনিয়োগ করেছিল নাইকি। সেই ঝুঁকিই পরে প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসে। জর্ডানকে ঘিরে এয়ার জর্ডান নামে একটি জুতার ব্র্যান্ড তৈরি করে নাইকি। লাল-কালো রঙের সেই জুতা এনবিএর নিয়ম ভাঙলেও নাইকি সেটিকে বিপণনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে এবং জরিমানাও দেয়।
পরবর্তী সময়ে টাইগার উডস, সেরেনা উইলিয়ামস ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো প্রজন্মসেরা তারকাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে নাইকি। গলফ, টেনিস ও ফুটবলে এসব তারকার সাফল্যের সঙ্গী হয়ে ওঠে ব্র্যান্ডটি।
নাইকির সঙ্গে এখনও ররি ম্যাকইলরয় ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো বড় তারকারা রয়েছেন। তবে ফুটবলে সবচেয়ে বড় তারকা এমবাপ্পেকে হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নয় বছর বয়স থেকেই নাইকির সঙ্গে ছিলেন এমবাপ্পে। একই সময়ে বিশ্বকাপজয়ী লামিনে ইয়ামালও নাইকি ছেড়ে অ্যাডিডাসে যোগ দিয়েছেন।
ইয়ামালের মতে, অ্যাডিডাসে যোগ দেওয়ায় তিনি নাইকির তারকাখচিত তালিকা থেকে আলাদাভাবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। আর এমবাপ্পে বলেছেন, অন-এ তিনি এমন উদ্ভাবকদের মাঝে থাকবেন, যারা তার মতো একই স্বপ্ন দেখেন।
নাইকি কি পারবে ঘুরে দাঁড়াতে?
সব হতাশার মধ্যেও নাইকি শীর্ষ অবস্থানে থাকবে বলে মনে করেন পাওয়েল। তার মতে, তরুণদেরসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও নাইকির প্রতি অনুগত। তবে বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির আধিপত্যে প্রভাব ফেলেছে।
পাওয়েল মনে করেন, নাইকি আগের মতো বাজারের একচ্ছত্র শক্তি হয়ে উঠবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে ব্র্যান্ডটি আবার প্রবৃদ্ধি ও লাভজনক অবস্থায় ফিরতে পারে।
তার মতে, উদ্ভাবনের গতি বন্ধ হয়ে গেলে সেটিকে আবার আগের গতিতে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। নাইকির স্পোর্ট অফেন্স নামে পুনর্গঠন পরিকল্পনার ইতিবাচক ফল আগামী বছর থেকে দেখা যেতে পারে। এলিয়ট হিল জানিয়েছেন, স্পোর্টসওয়্যার, জর্ডান ব্র্যান্ড ও চীনের বাজারে নাইকির আরও কাজ করতে হবে। সর্বশেষ প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় হয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে কম।
বিশেষ করে চীনের বাজারে আয় ২৬ শতাংশ কমেছে। বিশ্বজুড়েও জর্ডান ব্র্যান্ডের বিক্রি কমেছে। হিল জানান, আইকনিক রেট্রো জুতার অতিরিক্ত সরবরাহ করা হয়েছিল। এখন এই ব্র্যান্ডের পণ্যের পরিমাণ ও বাজারে ছাড়ার হার কমানো হবে। আগামী অর্থবছরে নাইকির আয় ‘উচ্চ এক অঙ্কের’ হারে কমতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ২০৩১ সালের মধ্যে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি অংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে হতে পারে।
নাইকির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা ডেভ ডেন্টন বলেন, তাদের ফলাফল প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা দুটোরই নিচে রয়েছে এবং এই ব্যবধান কমানোর দিকেই তারা এখন মনোযোগ দিচ্ছেন। গত বছর তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে নাইকি তাদের বিখ্যাত ‘জাস্ট ডু ইট’ স্লোগানের পাশাপাশি ‘হোয়াই ডু ইট?’ নামে নতুন প্রচারাভিযান শুরু করেছিল।
সূত্র: বিবিসি