ফুলন দেবী, ভারতের অপরাধ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক চিরন্তন বিস্ময়। সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের চোখ তাকে কখনও উপস্থাপন করেছে ‘ডাকাত’ হিসেবে, কখনও ‘দস্যু সুন্দরী’, আবার কখনও ‘রক্তলোলুপ প্রতিশোধপরায়ণ নারী’ হিসেবে। তবে চটকদার এসব তকমার পেছনে চাপা পড়ে গেছে জাতপাত ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার এক নারীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
উত্তর প্রদেশের জালৌন জেলার শেখপুর গুড়হা গ্রামে এক দরিদ্র মল্লাহ (নিম্নবর্ণ) পরিবারে জন্ম ফুলন দেবীর। দারিদ্র্য আর নদীকূলের অনটনই ছিল তার শৈশব। মাত্র ১১ বছর বয়সে তার চেয়ে তিন গুণ বড় পুত্তি লালের সঙ্গে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামীর ঘরে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। ফুলনের খুড়তুতো ভাই ইন্দ্রজিৎ সিং স্মৃতিচারণ করে বলেন, সে তাকে খুব মারধর করত। সব ধরনের নির্যাতন চালানো হতো। বহুবার সে ধর্ষণের শিকার হয়, যা সহ্য করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে গ্রামে ফিরলেও সমাজের উচ্চবর্ণের ঠাকুরদের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে ফুলনের পরিবার। ১৯৮১ সালে দস্যুর দল অপহরণ করে বেহমাই গ্রামে নিয়ে যায় তাকে। ইন্দ্রজিৎ সিং বলেন, আমরা সবাই তাদের কাছে অনুনয় করেছিলাম তাকে ছেড়ে দিতে। কিন্তু তারা তাকে বেহমাই নিয়ে যায় এবং উচ্চবর্ণের পুরুষেরা তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও প্রকাশ্যে অপমান করে।
পরে বিক্রম মল্লাহর সাহায্যে মুক্ত হয়ে ফুলন চম্বলের গিরিখাতে আত্মগোপন করেন এবং নিজের বাহিনী গড়ে তোলেন। দস্যু হওয়াটা তার পছন্দ ছিল না বলে জানান তার স্বজন মূলন দেবী। ইন্দ্রজিৎ সিংও বলেন, ডাকাত হওয়া তার ভাগ্যে লেখা ছিল না; পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিল।
১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেহমাই গ্রামে ২২ জন ঠাকুর সম্প্রদায়ের মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে ফুলনের প্রতিশোধকে দায়ী করা হয়। যদিও বেহমাই গ্রামের ৮৪ বছর বয়সী প্রবীণ ঠাকুর ধর্ম সিং বলেন, সে তার গ্যাং নিয়ে আমাদের গ্রামে আসতো। আমরা তাকে খাবার ও পানি দিতাম। একদিন দুই গ্যাংয়ের লড়াইয়ের মাঝে সে আমাদের লোকদের মেরে ফেলে।
বেহমাই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ১৯৮৩ সালে আত্মসমর্পণ করেন ফুলন। কোনও বিচার ছাড়াই ১১ বছর কারাগারে থাকার পর ১৯৯৪ সালে তিনি মুক্তি পান। এরপর সমাজবাদী পার্টির টিকিটে ১৯৯৬ ও ১৯৯৯ সালে মির্জাপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৫ জুলাই নয়া দিল্লিতে নিজের বাসভবনের সামনে শের সিং রানা নামক এক ব্যক্তির গুলিতে তিনি নিহত হন। ফুলনের বাল্যবন্ধু অনিল কুমার বলেন, ডাকাতরা স্বেচ্ছায় ডাকাত হয়, কিন্তু ফুলন ছিলেন ‘বাঘি’ (বিদ্রোহী)। পরিস্থিতি মানুষকে বিদ্রোহী বানায়।
তবে সংবাদমাধ্যম ও বিনোদন জগতে ফুলনের এই সংগ্রামকে সাজানো হয়েছিল মুখরোচক খবরের মোড়কে। ওয়ানইন্ডিয়া হিন্দি’র মতো গণমাধ্যম শিরোনাম করেছিল: ‘১১ বছর বয়সে বিয়ে, ২১ দিন গণধর্ষণ, ২২ জন ঠাকুরকে একসঙ্গে হত্যা—ফুলনের রক্তাক্ত গল্প।’ আবার আজতক তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘দস্যু সুন্দরী’। অনলাইনের বিভিন্ন তথ্যসূত্রে বলা হয়, তৎকালীন সাংবাদিকেরা এই খর্বকায় ও শ্যামলা বর্ণের নারীর শারীরিক গঠন দেখে হতাশাও প্রকাশ করেছিলেন!
পরিচালক শেখর কাপুরের বিখ্যাত ছবি ‘ব্যান্ডিট কুইন’-এও যৌন সহিংসতা ও প্রতিশোধকে প্রধান উপজীব্য করা হয়। এ বিষয়ে প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায় তার ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান রেপ ট্রিক’ প্রবন্ধে তীব্র সমালোচনা করে লিখেছিলেন, চলচ্চিত্রে যৌন সহিংসতাকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করে ফুলন দেবীকে কেবল এক রূপক বা ‘সংস্করণে’ পরিণত করা হয়েছে। ইন্দ্রজিৎ সিং আফসোস করে বলেন, বিশেষ করে হিন্দি পত্রিকার সাংবাদিকেরা তাকে ভিলেন বানিয়েছিল। তারপর এলো সিনেমা, যেখানে অনেক অতিরঞ্জিত ও কষ্টদায়ক দৃশ্য ছিল।
তবে লেখক মালা সেন তার ‘ইন্ডিয়াজ ব্যান্ডিট কুইন’ বইয়ে ফুলনের জীবনকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেছেন। জেলে ফুলনের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা জানিয়ে মালা সেন লিখেছেন, ফুলন নিজের ওপর হওয়া যৌন নির্যাতনের বিশদ বিবরণ দিতে চাননি, সংক্ষেপে শুধু বলেছিলেন, ওরা আমার সঙ্গে খুব অপমানমূলক আচরণ করেছিল। মালা সেনের মতে, সমাজ যৌন নিপীড়িত নারীকেই উল্টো লজ্জিত করে, তাই ফুলন নিজের সম্মান রক্ষার্থেই মুখ খুলতে চাননি।
দলিত নারীবাদী সক্রিয় কর্মী রিয়া সিং মনে করেন, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন কখনোই নিরপেক্ষ ছিল না, তারা উচ্চবর্ণের আধিপত্য বজায় রেখেছিল। ফুলনকে কেবল অপরাধী হিসেবে না দেখে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। অন্যদিকে, নারী অধিকার কর্মী রঞ্জনা কুমারী বলেন, ফুলনের জীবনকে খবরের কাগজে এক ‘মসলাদার গল্প’ বানিয়ে ফেলা হয়েছিল, যেখানে তার শারীরিক গঠন ও প্রতিশোধকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও কাঠামোগত নিপীড়ন ঢাকা পড়ে যায়।
আজও জালৌনের গ্রামের বাড়ির প্রবেশদ্বারে সাদা শাড়ি, গোলাপি লিপস্টিক ও সিঁদুর পরা ফুলন দেবীর একটি মূর্তি রয়েছে। সেখানে গ্রামের শিশুরা পরীক্ষার আগে আশীর্বাদ নিতে আসে। শেখর কাপুর বা সংবাদমাধ্যমের কল্পিত ‘ব্যান্ডিট কুইন’ নন, গ্রামের মানুষের কাছে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক আইকন। স্থানীয় পুরুষেরা আজও গর্ব করে বলেন, ঝাঁসির রানি আর ফুলন দেবী একবারই জন্মায়। অন্যায়ের শিকার হয়েই তিনি সত্যিকার অর্থে ‘দেবী’ হয়ে উঠেছিলেন।
সূত্র: আউটলুক ইন্ডিয়া