বুমার মা ও মিলেনিয়াল মেয়ের সম্পর্কে ফাঁটল ধরে যেভাবে

বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:১২ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:১২

মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য একটু সময় বের করেছেন। হয়তো নিজের কোনও সুখবর জানাবেন, কিংবা অনেক দিন পর মন খুলে গল্প করবেন। ফোন ধরেই মা বললেন, ‘ওহ, ম্যাডাম! এত ব্যস্ত থাকো যে মায়ের সঙ্গে কথা বলারও সময় পাও না!’

কথাটা হয়তো অভিমান মেশানো রসিকতা। মা হয়তো সত্যিই মেয়েকে কাছে পেতে চান। কিন্তু মেয়ের কাছে মুহূর্তেই কথার অর্থ বদলে যেতে পারে। যে ফোনটা করা হয়েছিল আনন্দ ভাগ করে নিতে, সেটিই হয়ে উঠল নিজের ব্যস্ততার কৈফিয়ত দেওয়ার উপলক্ষ। কেন সময় দিতে পারেননি, কেন নিয়মিত খোঁজ নেওয়া হয় না—এসব বোঝাতে বোঝাতেই মেয়েকে আবার আশ্বস্ত করতে হয়, মা তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কের টানাপোড়েনটা এখানেই। যোগাযোগ করতে এসেও মেয়েকে এমন একটি দূরত্ব মেরামতের দায়িত্ব নিতে হয়, যে দূরত্ব তৈরি করার ইচ্ছা তার কখনও ছিল না।

একবার এমন হলে হয়তো কিছুই আসে যায় না। কিন্তু বারবার একই অভিজ্ঞতা হলে প্রিয় সম্পর্কটিও একসময় ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা কি আলাদা?

মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মধ্যে যোগাযোগের প্রত্যাশা সব সময় এক রকম হয় না। অনেক মা-বাবার কাছে ভালোবাসার প্রকাশ মানে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, পরামর্শ দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা এবং বড়দের কথাকে গুরুত্ব দেওয়া। অপরদিকে, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েরা ভালোবাসার পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পারস্পরিক সম্মান এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাও প্রত্যাশা করেন।

পরিবারের যোগাযোগ নিয়ে গবেষক আসকান কোরনার ও মেরি অ্যান ফিটজপ্যাট্রিক ২০০২ সালে দুটি প্রবণতার কথা তুলে ধরেন। একদিকে এমন পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে মতের মিল, অভিন্ন মূল্যবোধ ও কর্তৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যদিকে এমন পরিবেশ, যেখানে খোলামেলা আলোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে।

এই দুই প্রবণতা পরিবারের কথাবার্তাতেও প্রভাব ফেলে। কোথাও পরামর্শ, প্রশ্ন ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে যত্ন প্রকাশ করা হয়; কোথাও মন দিয়ে শোনা, অনুভূতি স্বীকার করা এবং অন্যের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে।

তবে এই পার্থক্যকে প্রজন্মের সরল বিভাজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সব বয়স্ক মা-বাবা এক রকম নন, আবার সব প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের প্রত্যাশাও এক নয়। একই পরিবারের সদস্যদের কাছেও ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের অর্থ আলাদা হতে পারে।

রসিকতার আড়ালে যখন অভিযোগ

ধরুন, মেয়ে মাকে রাতের খাবারের দাওয়াত দিলেন। মা উত্তর দিলেন, ‘বাহ! আমাকে যে তোমার মনে আছে, সেটাই তো জানতাম না!’

কথার শেষে হাসি আছে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি অভিযোগ—মেয়ে যথেষ্ট খোঁজ নেন না, যথেষ্ট সময় দেন না, ভালো মেয়ের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না।

মেয়েটি হয়তো মাকে আনন্দ দেওয়ার জন্যই দাওয়াত দিয়েছিলেন। অথচ সেই মুহূর্তে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়াই তার কাছে বড় হয়ে উঠল।

সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান মানুষের সামাজিক পরিচয় ও আত্মসম্মানের ধারণা ব্যাখ্যা করতে ‘ফেস’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সহজ করে বললে, অন্যের সামনে আমরা নিজেদের যে পরিচয়ে দেখতে চাই, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভদ্রতা ও যোগাযোগ নিয়ে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, কিছু মন্তব্য অনিচ্ছাকৃতভাবেও সেই পরিচয় বা আত্মসম্মানে আঘাত করতে পারে।

একজন মেয়ে নিজেকে যত্নশীল, দায়িত্বশীল ও ভালো সন্তান হিসেবে দেখতে চান। মা যখন রসিকতার ছলে তার সেই পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে ফেলেন, তখন মেয়েকে শুধু মন্তব্যটি সহ্য করতে হয় না; নিজের অবস্থানও ব্যাখ্যা করতে হয়।

মেয়ে যদি বলেন, কথাটি তার খারাপ লেগেছে, মা হয়তো পাল্টা বলেন, ‘এখনকার মানুষ একটু কথাও সহ্য করতে পারে না! আমি তো মজা করেই বলেছি।’

এখানে মায়ের উদ্দেশ্য হয়তো সত্যিই আঘাত করা ছিল না। কিন্তু উদ্দেশ্য ভালো হলেই কথার প্রভাব যে ভালো হবে, এমন নয়। রসিকতা ঘনিষ্ঠতার প্রকাশ হতে পারে। তবে সেই রসিকতার মধ্যে বারবার সমালোচনা বা হতাশা লুকিয়ে থাকলে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়।

সম্পর্ক ঠিক রাখার অদৃশ্য দায়িত্ব

মা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে গবেষক অ্যালিসন এম. আলফোর্ড ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখেছেন, মেয়ে হিসেবে সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করা একটি চলমান কাজ। শুধু ফোন করা বা দেখা করতে যাওয়াই নয়, মা কীভাবে কোনও কথা নেবেন তা আগেভাগে ভাবা, নিজের বিরক্তি সামলানো, মায়ের মন খারাপ হলে তাকে আশ্বস্ত করা—এসবও সেই কাজের অংশ।

আলফোর্ড এই প্রক্রিয়াকে ‘ডটারিং’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কঠিন হলেও অনেক মেয়ে সম্পর্কটি সামলে রাখার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। স্বাভাবিক ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্কেও এর ছোট ছোট উদাহরণ দেখা যেতে পারে।

এই দায়িত্ব কয়েকভাবে প্রকাশ পায়। মেয়ে নিয়মিত ফোন করেন, দাওয়াত দেন, যোগাযোগের উদ্যোগ নেন। একই সঙ্গে ভাবেন, কোনও কথা বললে মা কষ্ট পাবেন কি না। নিজের হতাশা লুকিয়ে মায়ের অভিমান সামলান। আবার নিজের কাছে ভালো মেয়ে হওয়ার যে প্রত্যাশা রয়েছে, সেটিও পূরণ করার চেষ্টা করেন।

পরিবারের সবার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা ও সম্পর্কের সুতো ধরে রাখার কাজকে গবেষকেরা ‘কিনকিপিং’ বলেন। অনেক পরিবারে নারীরা এই দায়িত্ব বেশি পালন করেন। মেয়ে যখন প্রতিটি কথার পর ভুল বোঝাবুঝি মেটাতে এগিয়ে যান, তখন তিনিও সেই কাজের ভার বহন করেন।

সমস্যা হয় তখন, যখন সম্পর্ক ভালো রাখার দায়িত্বটা কার্যত একজনের ওপরই পড়ে। একসময় প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগও তখন আনন্দের বদলে কর্তব্য বলে মনে হতে পারে।

সম্পর্ক ভালো রাখতে বদল আনবেন যেভাবে

অভিমান প্রকাশ করুন, অপরাধবোধ তৈরি করে নয়: ‘তুমি কখনও আমার খোঁজ নাও না’ বলার বদলে বলা যায়, ‘তোমার সঙ্গে আরও একটু সময় কাটাতে ইচ্ছে করে।’ প্রথম কথাটি অভিযোগের মতো শোনায়; দ্বিতীয়টি নিজের চাওয়াটা সরাসরি প্রকাশ করে।

একইভাবে, মেয়ে ফোন করলে প্রথমেই তার ব্যস্ততা নিয়ে খোঁচা না দিয়ে বলা যায়, ‘তোমার ফোন পেয়ে ভালো লাগল। বলো, কী খবর?’

উদ্দেশ্যের পাশাপাশি কথার প্রভাবও বুঝুন: কেউ কষ্ট পেয়েছেন বললে ‘আমি তো মজা করেছি’ বলে আলোচনা শেষ করে দেওয়া ঠিক নয়। বরং বলা যায়, ‘তোমাকে কষ্ট দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু কথাটা খারাপ লেগেছে বুঝতে পারছি।’

এতে নিজের উদ্দেশ্য অস্বীকার করতে হয় না, আবার অন্যের অনুভূতিকেও ছোট করা হয় না।

যোগাযোগের উদ্যোগকে স্বাগত জানান: মেয়ে ফোন করলেন, দেখা করতে চাইলেন কিংবা মাকে কোথাও যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন—প্রথমে সেই উদ্যোগের আনন্দটুকু প্রকাশ করুন। পুরোনো অভিমান থাকলে তা নিয়ে অন্য সময়ও কথা বলা যায়। প্রতিটি নতুন যোগাযোগের সঙ্গে আগের অভিযোগ জুড়ে দিলে কাছে আসার চেষ্টাটাই কঠিন হয়ে ওঠে।

মা-মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে ২০২১ সালের একটি দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানেরা তাদের পরামর্শকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করার প্রবণতা বেশি দেখান। অনাকাঙ্ক্ষিত সেই পরামর্শের সঙ্গে খারাপ মেজাজের সম্পর্কও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ভালো উদ্দেশ্যে বলা কথাও সম্পর্কের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে অনুভূত হতে পারে।

সম্পর্কের দায়িত্ব দুজনেরই

মা-মেয়ের সম্পর্কে অভিমান থাকবে, প্রত্যাশার অমিলও থাকবে। মা হয়তো মেয়েকে আরও কাছে পেতে চাইবেন। মেয়ে নিজের সংসার, কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে মায়ের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করবেন। দুজনের চাওয়াই সত্যি হতে পারে।

মা-মায়ের মতো করে ভালোবাসা প্রকাশ করতে চান বলে তাকে সব রসিকতা বন্ধ করতে হবে না। মেয়েকেও নিজের ব্যস্ততা বা ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজনের জন্য অপরাধবোধে ভুগতে হবে না। প্রয়োজন শুধু এমনভাবে কথা বলা, যাতে একজনের চাওয়া অন্যজনের ওপর অভিযোগ হয়ে না চাপে।

একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই উদ্যোগ প্রয়োজন। একজন বারবার এগিয়ে আসবেন, আর অন্যজন শুধু অভিমান জানাবেন—এভাবে দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা কঠিন।

কারণ ভালোবাসা মানে শুধু কাছাকাছি থাকতে চাওয়া নয়; অন্যজন কীভাবে সেই ভালোবাসা গ্রহণ করছেন, সেটিও বোঝার চেষ্টা করা।

সম্পর্কের যত্ন যেন কারও একার দায়িত্ব না হয়। মা-মেয়ে দুজনেই যদি কথা বলার ধরনে একটু মনোযোগী হন, তাহলে অভিমান প্রকাশের জন্য খোঁচা দিতে হবে না, আর ভালোবাসার প্রমাণ দিতেও বারবার কৈফিয়ত দিতে হবে না।

/এম/
সম্পর্কিত
পুরুষের কাছে নারীরা আসলে কী চান?
মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশে প্রথম মানসিক স্বাস্থ্য অলিম্পিয়াড
সব সময় মন খারাপ থাকে? সাধারণ বিষণ্ণতা আর ডিপ্রেশনের পার্থক্য কী
সর্বশেষ খবর
 ‘আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো চিকিৎসা পায় না’
 ‘আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ ঠিকমতো চিকিৎসা পায় না’
তৌফিক ইমরোজ খালিদী গণমাধ্যমের সাহসী ও সৃজনশীল ব্যক্তি: মাহফুজ আনাম
তৌফিক ইমরোজ খালিদী গণমাধ্যমের সাহসী ও সৃজনশীল ব্যক্তি: মাহফুজ আনাম
মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লিতে বিশাল জমায়েতের ডাক ইন্ডিয়া জোটের
মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দিল্লিতে বিশাল জমায়েতের ডাক ইন্ডিয়া জোটের
‌‘সন্ত্রাসী’ বগাকে ধরতে অভিযান: এবার সেই ওসিকে খুলনায় ট্রেনিং সেন্টারে বদলি
‌‘সন্ত্রাসী’ বগাকে ধরতে অভিযান: এবার সেই ওসিকে খুলনায় ট্রেনিং সেন্টারে বদলি
সর্বাধিক পঠিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
‘বাসায় যুদ্ধ করে’ জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ করেছেন: চিফ হুইপ
‘বাসায় যুদ্ধ করে’ জুবাইদা রহমান স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দ্বিগুণ করেছেন: চিফ হুইপ
১০ হাজার কোটি টাকার ‘৩০০ ফিটের’ এ কী হাল
১০ হাজার কোটি টাকার ‘৩০০ ফিটের’ এ কী হাল
সবার আগে প্রশাসনের লোকদের ওপর ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ চালানো দরকার: এমপি মাজেদ 
সবার আগে প্রশাসনের লোকদের ওপর ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ চালানো দরকার: এমপি মাজেদ 
ধানক্ষেতে স্কুলছাত্রীকে হত্যার রহস্য খুলতে শুরু করেছে, মোবাইল ফোন উদ্ধার
ধানক্ষেতে স্কুলছাত্রীকে হত্যার রহস্য খুলতে শুরু করেছে, মোবাইল ফোন উদ্ধার