ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথ যখন হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভে উত্তাল, ঠিক তখনই দেশটির রাজনৈতিক আলোচনায় মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে ‘শাসন পরিবর্তন’ বা রিজিম চেঞ্জ। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি), বামপন্থি ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে অনড়। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কথিত ‘ভোট চুরি’র বিরুদ্ধে আলাদা প্রচারণা চালাচ্ছে। এই আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কংগ্রেসের ওপর এক তুমুল রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে। বিজেপির অভিযোগ, কংগ্রেস যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করছে এবং ভারতে অরাজকতা ছড়িয়ে অসাংবিধানিকভাবে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র করছে।
একই সঙ্গে বিজেপি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে যেভাবে রাজপথের আন্দোলন দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, ভারতেও ঠিক তেমন একটি মডেলের পুনরাবৃত্তির চেষ্টা চলছে। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা কর্তৃক বাংলাদেশের শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের প্রশংসা এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের প্রকাশ্যে ‘শাসন পরিবর্তন’-এর দাবিকে কেন্দ্র করে বিজেপির এই উদ্বেগের সূচনা। ক্ষমতাসীন দলটি এই বক্তব্যগুলোকে রাহুল গান্ধী এবং সিইসির অপসারণের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর সমর্থিত আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। এসআইআর ও সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা এখন বড় এক রাজনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বিক্ষোভকারীরা কি তাদের দাবিমতো ভারতের গণতন্ত্র রক্ষা করছে, নাকি বিজেপির অভিযোগ অনুযায়ী তারা একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করতে চায়?
শাসন পরিবর্তন নিয়ে প্রশান্ত ভূষণের বিতর্কিত বক্তব্য
গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সিজেপির ডাকা ‘তেরঙ্গা যাত্রা’র আগের দিন নয়াদিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়াতে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে, আইসা সভাপতি নেহা বোরা, রাজ্যসভার সংসদ সদস্য কপিল সিব্বল এবং অভিনেতা প্রকাশ রাজসহ অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্টরা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচন কমিশনের অনিয়ম, বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশের হামলা এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছিল।
সেখানে প্রশান্ত ভূষণ বলেন, ‘এই সরকার বারবার বলে চলেছে এটি নাকি বিরোধীদের পরিচালিত রিজিম চেঞ্জ অপারেশন। আমরা কেবল দেশের নির্বাচনি গণতন্ত্রকে রক্ষা করার আবেদন জানাচ্ছি। যদি এই ধরনের বর্বরতা চলতে থাকে, তবে নিশ্চিতভাবেই শাসন পরিবর্তন হবে। আমরা সবাই শাসন পরিবর্তন চাই। এতে কি কোনও ভুল আছে? শাসন পরিবর্তন প্রতিটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি করা কোনও অপরাধ নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই শাসন পরিবর্তন চাই। শাসন পরিবর্তন ঘটানো প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।’ তার এই মন্তব্য বিজেপিকে প্রমাণ করার সুযোগ করে দেয় যে, এসআইআর ও সিইসি বিরোধী এই আন্দোলনের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনি সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
যেভাবে বিতর্কে এলো ‘বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’
প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যের আগেই ভারতের এই বিক্ষোভের সঙ্গে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের তুলনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। গত ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় আইসা সভাপতি নেহা বোরা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। উল্লেখ্য, নেহা বোরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে অনশন ধর্মঘটেও অংশ নিয়েছিলেন।
ভিডিও বার্তায় বোরা বলেন, ‘আমরা জানি ভারতে আজ আমরা যে জেন-জি আন্দোলন দেখছি, তা প্রথমে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল। আমাদের পথ দেখানোর জন্য আপনাদের অভিনন্দন। আমরা আপনাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি। আপনাদের আন্দোলন থেকে আমরা অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা নিচ্ছি।’
একই দিন বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী এক্স-এ নেহা বোরার বক্তব্যটি শেয়ার করে লিখেছিলেন, ‘রাহুল গান্ধীর পোস্টার গার্ল নেহা বোরা বলছেন বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশ নাকি পথ দেখিয়েছে! এটি শাসন পরিবর্তনের এক খোলাখুলি স্বীকারোক্তি! রাহুল গান্ধী অ্যান্ড কোং ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি!’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন শুরু হলেও তা পরবর্তীতে এক দফায় রূপ নেয় এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। নেহা বোরা আন্দোলনটিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে উপস্থাপন করলেও, বিজেপি এটিকে একটি নির্বাচিত সরকারকে অসাংবিধানিক উপায়ে সরানোর কৌশল হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং সিআইএ-র যুক্ত থাকার অভিযোগ এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিজেপির অভিযোগ: বাংলাদেশে ধাঁচের ষড়যন্ত্র
বিজেপি মনে করে প্রশান্ত ভূষণ এবং নেহা বোরার বক্তব্য বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং তা সিজেপির আন্দোলন, বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর সংহতি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ‘ভোট চুরি’ প্রচারণারই অংশ। ১৬ অক্টোবর শুক্রবার লখনউতে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কঠোর আক্রমণ চালান। তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ও তার মিত্ররা রাজপথের আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে ধাঁচের শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
রাজনাথ সিং বলেন, ‘দেশের যুবসমাজকে অরাজকতার রাজনীতিতে দাবার ঘুঁটি বানানো হচ্ছে। আলোচনা ও রাষ্ট্র গঠনের পথই বেছে নিতে হবে, সংঘাতের পথ নয়।’
এ ছাড়া বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারী, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস এবং গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত এই আন্দোলনের কড়া সমালোচনা করেছেন। ফড়নবিস বলেন, ‘আন্দোলনের নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করাই এদের মূল উদ্দেশ্য।’ আর গোয়ার মুখ্যমন্ত্রী প্রমোদ সাওয়ান্ত বলেন, ‘ভারতে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ সরকার পরিবর্তন করে, শক্তি প্রয়োগ বা সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে নয়।’
বিজেপি সংসদ সদস্য সংবিত পাত্র বলেন, ‘প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্য প্রমাণ করে এই দেশ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি ১৪০ কোটি মানুষের দেশ। রাহুল গান্ধীর মূল উদ্দেশ্য শিশুদের ভবিষ্যৎ বা এসআইআর নিয়ে নয়।’ এ ছাড়া বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন অভিযোগ করেছেন যে, কংগ্রেস ও সিজেপি বিদেশি শক্তির নির্দেশে কাজ করছে। এমনকি ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে নিয়ে করা মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে সংবিত পাত্র তাকে ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে আখ্যা দেন।
কংগ্রেসের পাল্টা যুক্তি ও সিজেপির দূরত্ব বজায় রাখা
বিজেপির এই আক্রমণের মুখে পাল্টা জবাব দিয়েছেন কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেড়া। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে ব্যঙ্গ করে ‘জগ্গা জাসুস’ ও ‘শার্লক হোমস’ বলে অভিহিত করেন তিনি। খেড়া বলেন, নির্বাচনে লড়াই করে সরকার পরিবর্তন করার ঘোষণা বিরোধীরা কখনোই লুকিয়ে রাখেনি।
১৯৭৭ সালের জরুরি অবস্থা পরবর্তী নির্বাচনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘১৯৭৭ সালে কি শাসন পরিবর্তন হয়নি? যখনই বিরোধীরা রাজপথে নেমে আসে, তখনই আন্দোলন হয় এবং শাসন পরিবর্তন হয়। তবে একটি গণতান্ত্রিক দেশে কীভাবে শাসন পরিবর্তন হয়? অবশ্যই নির্বাচনের মাধ্যমে। বিরোধীদের কাজই তো নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করা।’
তবে এই বিতর্কের মাঝে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে পুরোপুরি দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। শুক্রবার আটক হওয়ার আগে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে সরিয়ে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে বসানোর দাবি জানাচ্ছি। আমরা শাসন পরিবর্তন বা সরকার ফেলে দেওয়ার কথা বলছি না। আমরা স্রেফ জবাবদিহিতা চাইছি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের আন্দোলন এবং বাংলাদেশের ঘটনাবলীর প্রেক্ষাপটে প্রশান্ত ভূষণ ও নেহা বোরার মন্তব্য বিজেপিকে একটি বড় সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে এসআইআর ও নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রিক যে চাপে বিজেপি এতদিন ছিল, তা থেকে মনোযোগ ঘুরে এখন আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক মতলব ও উদ্দেশ্যের ওপর এসে পড়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
জার্মান বিমানবন্দরে তল্লাশিতে বেরিয়ে এলো স্যুটকেস-ভর্তি সাপ
ইরানের নিহত নারী কমান্ডো সম্পর্কে যা জানা গেলো
ক্যানসার আক্রান্ত পোপ লিও, কী ভাবছে ভ্যাটিকান
এবার যন্তর মন্তর থেকে নেহাকে আটক করলো দিল্লি পুলিশ
দিল্লিতে তিরঙ্গা কর্মসূচির আগে ককরোচ নেতা অভিজিৎ দিপকে আটক