জিনিসটা কেনার কোনও পরিকল্পনা ছিল না। এমনকি দোকানে ঢোকার আগে জানতেনও না, পণ্যটি আপনার দরকার। কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল লাল অক্ষরে লেখা—‘৫০ শতাংশ ছাড়!’ পাশে আবার ঘোষণা, ‘অফার শেষ হচ্ছে আজই।’ মুহূর্তেই হিসাব বদলে গেল। মনে হলো, এখন না কিনলে লোকসান হবে। কয়েক মিনিট আগেও যে জিনিসটি অপ্রয়োজনীয় ছিল, সেটিই এখন হাতছাড়া করতে মন চাইছে না।
শেষ পর্যন্ত কিনেও ফেললেন। বাড়ি ফিরে অবশ্য প্রশ্ন জাগল—জিনিসটা কি সত্যিই দরকার ছিল, নাকি ছাড়ের লোভেই কেনা?
এ অভিজ্ঞতা অনেকেরই পরিচিত। প্রয়োজন না থাকলেও ছাড় দেখলে কেনাকাটার তাগিদ তৈরি হয়। এর পেছনে কাজ করে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মনস্তত্ত্ব, টাকা খরচের অনুভূতি এবং বিপণন কৌশল। গবেষণায় দেখা গেছে, মূল্যছাড়সহ বিভিন্ন প্রচারণা মানুষের হঠাৎ কেনাকাটা বা ‘ইমপালস বায়িং’-এর প্রবণতা বাড়াতে পারে।
ছাড় দেখলেই মনে হয়, লাভ হচ্ছে
ধরা যাক, একটি শার্টের দাম ২ হাজার টাকা। সেটি ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আপনি হয়তো শার্টটি কেনার কথা ভাবেননি। কিন্তু ছাড়ের হিসাব দেখেই মনে হলো, ১ হাজার টাকা বাঁচানো যাচ্ছে।
এখানেই রয়েছে মনের একটি সূক্ষ্ম কৌশল। আমরা অনেক সময় পণ্যটির প্রয়োজনীয়তা দিয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, কত টাকা ‘বাঁচাতে’ পারছি, তা দিয়ে বিচার করি। অথচ পণ্যটি না কিনলে ১ হাজার টাকা খরচই হতো না। ফলে বাস্তবে টাকা সাশ্রয় না করেও আমাদের মনে সাশ্রয়ের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
আচরণগত অর্থনীতিতে মানুষের এমন সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কোনও পণ্যের দাম কমে গেলে তার প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, কিন্তু সেই আগ্রহ সবসময় প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। ছাড়ের পরিমাণ, পণ্যের ধরন, কেনাকাটার পরিবেশ ও ব্যক্তির মানসিক অবস্থার ওপরও এ প্রবণতা নির্ভর করে।
‘আজই শেষ’—এই কথাটি এত কাজ করে কেন?
‘সীমিত সময়ের অফার’, ‘স্টক শেষ হওয়ার আগে কিনুন’ কিংবা ‘আর মাত্র কয়েকটি বাকি’—এ ধরনের বার্তা ক্রেতার মনে তাড়াহুড়ো তৈরি করে। মনে হতে পারে, এখনই সিদ্ধান্ত না নিলে সুযোগটি আর পাওয়া যাবে না।
মনোবিজ্ঞানে কোনও সুযোগ বা স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা থেকে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়াকে রিঅ্যাকট্যান্স বলা হয়। আবার কোনও কিছু দুর্লভ বা সহজে পাওয়া যাবে না বলে মনে হলে সেটির আকর্ষণও বাড়তে পারে। বিপণনে সীমিত সময় বা সীমিত মজুতের প্রচারণা এ ধরনের অনুভূতিকে কাজে লাগাতে পারে। অনলাইন কেনাকাটা নিয়ে একটি মাঠপর্যায়ের গবেষণায়ও দেখা গেছে, পণ্যের স্বল্পতা ও সময়সীমার মতো কৌশল হঠাৎ কেনার প্রবণতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে সব ছাড়ের বিজ্ঞাপনই যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তা নয়। কোনও অফার সত্যিই সীমিত হতে পারে। সমস্যা হয় তখন, যখন তাড়াহুড়োর চাপে ক্রেতা নিজের প্রয়োজন, পণ্যের মান ও মোট খরচ যাচাই করার সুযোগ হারান।
কেনার আনন্দ, নাকি টাকা বাঁচানোর আনন্দ?
কেনাকাটা শুধু প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয়; অনেকের কাছে এটি আনন্দ, উত্তেজনা কিংবা মন ভালো করার উপায়ও। পছন্দের কিছু কেনার আগে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, তা কেনাকাটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। ছাড়ের ঘোষণা সেই উত্তেজনার সঙ্গে ‘কম দামে পাওয়ার’ আনন্দও যোগ করে।
২০১৯ সালে জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, কিছু পরিস্থিতিতে ছোট সম্ভাবনাভিত্তিক ছাড়—যেমন পণ্যটি বিনা মূল্যে পাওয়ার সামান্য সুযোগ—নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়ের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে। গবেষকেরা এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে টাকা খরচের মানসিক অস্বস্তি কমে যাওয়ার কথা বলেছেন। অর্থাৎ, কোনও অফার কেনাকাটার আনন্দ বাড়ানোর পাশাপাশি টাকা খরচের অস্বস্তিও কম অনুভব করাতে পারে
অবশ্য এ ফল সব ধরনের ছাড় বা সব ক্রেতার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। গবেষণাটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রচারণা ও পরিস্থিতি নিয়ে করা হয়েছিল।
অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকি বাড়ে কেন?
দোকানে কেনাকাটার সময় পণ্য হাতে নিয়ে দেখা, অন্য পণ্যের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা কেনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে। অনলাইনে সেই বিরতি অনেক সময় থাকে না। একের পর এক পণ্যের ছবি, ছাড়ের ব্যানার, কাউন্টডাউন এবং সহজে অর্ডার দেওয়ার ব্যবস্থা ক্রয়প্রক্রিয়াকে দ্রুত করে তোলে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ২৩১টি নমুনার ৭৫ হাজারের বেশি ক্রেতার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, হঠাৎ কেনাকাটার পেছনে ব্যক্তিগত প্রবণতা, আবেগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ও অর্থের মতো সম্পদ এবং বিপণনসংক্রান্ত নানা উপাদান ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, শুধু বিজ্ঞাপন দেখেই সবাই একইভাবে কেনাকাটা করেন না; পরিস্থিতি ও ব্যক্তিভেদেও পার্থক্য হয়।
তাই ছাড়ের প্রলোভনে কেনা প্রতিটি পণ্যকে ভুল সিদ্ধান্ত বলা যায় না। প্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে কেনা অবশ্যই লাভজনক হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পণ্য শুধু ছাড় আছে বলে কিনলে, শেষ পর্যন্ত খরচই বাড়ে।
ছাড়ের ফাঁদ এড়াবেন কীভাবে?
কেনার আগে কয়েকটি সহজ প্রশ্ন নিজেকে করতে পারেন।
ছাড় না থাকলেও কি পণ্যটি কিনতাম? উত্তর ‘না’ হলে প্রয়োজনটি আরেকবার ভেবে দেখুন।
পণ্যটির দাম সত্যিই কমেছে কি? সম্ভব হলে অন্য দোকানে দাম যাচাই করুন।
এখনই কি কিনতে হবে? জরুরি প্রয়োজন না থাকলে কিছু সময় অপেক্ষা করুন।
মোট কত টাকা খরচ হচ্ছে? ছাড়ের অঙ্ক নয়, শেষ পর্যন্ত আপনার পকেট থেকে কত টাকা যাচ্ছে, সেটিই হিসাব করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছাড়কে সুযোগ হিসেবে দেখুন—কেনার নির্দেশ হিসেবে নয়। কারণ কোনও পণ্য কম দামে পাওয়া আর সেই পণ্য কেনার প্রয়োজন থাকা এক কথা নয়।
শেষ পর্যন্ত কেনাকাটার সবচেয়ে ভালো হিসাব হলো, কত টাকা ছাড় পেলেন তা নয়; বরং যে টাকা খরচ করলেন, তার বিনিময়ে সত্যিই প্রয়োজনীয় কিছু পেলেন কিনা।
গুগল ম্যাপের যুগেও সাইনবোর্ড জরুরি কেন?
ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, তবু খরচ করছেন বেশি? কেন এমন হয়
পকেটে টান, তবু থামে না ছোট ছোট বিলাসিতা! কী এই ‘লিপস্টিক ইফেক্ট’?