প্রতি ঈদেই এক অন্য রূপ ধারণ করে ঢাকা শহর। বিশেষ করে শেষ কয়েকটি ঈদের ছুটি তুলনামূলক দীর্ঘ হওয়ায় আমাদের রাজধানী যেন এক অন্যরকম প্রশান্তির স্বাদ পেয়েছে। চিরচেনা সেই যানজট, কান ফাটানো ভেঁপু আওয়াজ, ব্যস্ত জনস্রোত— সব ভুলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে দেশের এই ব্যস্ততম মহানগরী। কারণ, এবারের ঈদে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ শেকড়ের টানে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন।
ঢাকাকে প্রায়ই বিশ্বের অন্যতম জনবহুল, ধীরগতির ও যানজটের নগরী বলা হয়। ঢাকার মানুষের জীবনের অর্ধেকটাই নষ্ট হয় রাস্তার জ্যামে বসে। সত্যি বলতে, এসবই এক রূঢ় বাস্তবতার প্রতিফলন। একটি শহরে যখন ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষ, প্রতিষ্ঠান আর কোটি কোটি স্বপ্নের সমাগম ঘটে, তখন এর মূল্য তো দিতেই হবে!
খুব স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব গিয়ে পড়ে নাগরিক সুবিধায়। আবাসন ব্যয় হয় আকাশছোঁয়া, তীব্র যানজট কেড়ে নেয় মূল্যবান কর্মঘণ্টা। পাশাপাশি ঢাকার বায়ুদূষণ আর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। সড়ক ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সুউচ্চ অট্টালিকা, বাণিজ্যিক ভবন ও নাগরিক সেবা– এই সবকিছুই ঢাকার ধারণক্ষমতার অনেক বাইরে চলে গিয়েছে।
তারপরও এই ঢাকাই বাংলাদেশের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য। সন্তানের শিক্ষা থেকে শুরু করে একটি ভালো ক্যারিয়ার। আমাদের সব স্বপ্নই দিনশেষে ঢাকাকেন্দ্রিক। যে কেন্দ্রীভবন ঢাকাকে এত প্রাণবন্ত করে তুলেছে, তাইই আবার এই শহরের অনেক সমস্যার মূল কারণ। সবকিছু এক জেলায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চল যেমন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার দিকে থেকে পিছিয়ে পড়ছে, ঢাকার ওপরও চাপটা ক্রমাগত বাড়ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে আগে বুঝতে হবে কেন আমাদের সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক।
আমাদের অতিরিক্ত ঢাকামুখিতা এখন শুধু উদ্বেগের বিষয় নয়— এটি জাতীয় অগ্রগতির পথে এক বড় বাধা। সমস্যা এই নয় যে, মানুষ ঢাকায় আসছে। সমস্যা হলো, বাংলাদেশ এমন একটি উন্নয়ন মডেলে অভ্যস্ত, যেখানে জাতীয় দায়িত্বের একটি অস্বাভাবিক বড় অংশ ঢাকার ওপর ন্যস্ত। আর শহরের এই দ্রুত বর্ধমান জনসংখ্যা এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে শহরের অবকাঠামো ও সেবাব্যবস্থা। দেশের উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে প্রবৃদ্ধি ও সুযোগ-সুবিধা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের অনেক দেশ বেশ আগেভাগেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছে। মালয়েশিয়ার রাজধানী ও রাজকীয় কেন্দ্র কুয়ালালামপুর হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক কেন্দ্র হলো পুত্রজায়া।
১৯৯৯ সালে কুয়ালালামপুরের ওপর থেকে যানজট ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে পুত্রজায়াকে একটি পরিকল্পিত ‘বাগান শহর’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনিক, আইনসভা ও বিচার বিভাগীয় রাজধানী তিনটি ভিন্ন শহরে, যথাক্রমে প্রিটোরিয়া, কেপ টাউন এবং ব্লুমফন্টেইনে অবস্থিত। এমনকি পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই রাজনৈতিক, সামরিক ও শিল্প কার্যক্রমকে ভিন্ন ভিন্ন শহরে ভাগ করে নিয়েছে— ইসলামাবাদ রাজনৈতিক রাজধানী, রাওয়ালপিন্ডি সামরিক সদরদপ্তর এবং করাচি প্রধান শিল্প ও আর্থিক কেন্দ্র।
অথচ বাংলাদেশে সবকিছুর অবস্থান ঢাকায়। মন্ত্রণালয়, করপোরেট সদর দফতর, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান— বেশিরভাগ ঢাকা থেকে পরিচালিত হয়। আর এর ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অন্যান্য অঞ্চলের সঠিক বিকাশ। আমাদের সরকারি ব্যবস্থার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন মানুষকে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ঢাকামুখী হতে বাধ্য করে, যা বিপর্যস্ত এই নগরীর ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এমন নয় যে, ঢাকা ছাড়া আমাদের আর কোনও গতি নেই। রাজধানীমুখী এই ক্রমবর্ধমান চাপ বরং আমাদের অভ্যস্ততার ফল। বিষয়টা অনেকটা এমন যে, আমরা বীজ রোপণ করেছি গোটা দেশজুড়ে, তবে পানি দিয়ে যাচ্ছি শুধুমাত্র ‘ঢাকা’ লেখা গাছগুলোয়। এর ফলে একে তো ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, তার ওপর নাগরিক সমস্যাগুলো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। শুধু ঢাকাকে ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনা করলে— তা শেষ পর্যন্ত জাতীয় অগ্রগতির পথকে সংকুচিতই করবে।
আশার খবর হলো, আমাদের সরকার এরই মধ্যে বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়, তবে এতে ঢাকার মূল সমস্যার আদতে তেমন সমাধান হবে বলে মনে হয় না।
ঢাকার সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা। ছোট থেকে ছোট সিদ্ধান্তের জন্য যখন মানুষকে ঢাকা থেকে অনুমোদন নিতে হয়, তখন লালফিতার দৌরাত্ম্যও বেড়ে যায়। সময়ের অপচয় হয়, উন্নয়ন বিলম্বিত হয়, আর স্থানীয় শাসনব্যবস্থার সক্ষমতা কমে যায়। সুযোগের বৈষম্য দূর না করে শুধু জনসংখ্যার স্থানান্তর ঠেকানোর চেষ্টা করা, অনেকটা নদীর গতিপথ না বদলে তার স্রোত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার মতো। আমাদের অবকাঠামোও কিন্তু একই গল্প বলে। সড়ক, রেলপথ, ডিজিটাল সংযোগ এবং মৌলিক সেবার মান— এগুলো ঢাকায় যত উন্নত, ঢাকার বাইরে ততটা নয়। ফলে মানুষ আর ব্যবসা– এই দুইই ছোটে ঢাকার দিকে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের জন্য সুষম উন্নয়ন ও উন্নত জীবনযাত্রার লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।
আমাদের সবারই ধারণা, দেশে সফলতার ঠিকানা একমাত্র ঢাকা। অন্যান্য শহরগুলোতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস বা শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলেও, আমাদের চোখ পড়ে থাকে ঢাকার দিকে। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। এর জন্য বিকেন্দ্রীকরণকে সমস্যা নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। আমরা এমন একটি “বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চল” গঠনের কথা ভাবতে পারি, যেখানে ঢাকার আশেপাশের ভৌগোলিক পরিসরে ক্ষমতা, সুযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এতে ঢাকার বর্তমান সমস্যার মূল কারণগুলোর সমাধান সম্ভব। ঢাকাকে ঘিরে থাকা গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জ– এই জেলাগুলোকে প্রবৃদ্ধির নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
বিশ্বের অনেক সফল দেশই কিন্তু এককভাবে বৃহৎ শহরের ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি এড়াতে আঞ্চলিক শহরগুলোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী ও প্রধান আর্থিক কেন্দ্র আমস্টারডাম হলেও, দ্য হেগ– এদের রাজনৈতিক কেন্দ্র, ইউট্রেখট বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক সেবার অন্যতম মূল কেন্দ্র, রটারডাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের প্রাণকেন্দ্র। চারটি প্রধান শহর ও তাদের আশেপাশের এলাকা নিয়ে গড়া এই অঞ্চলটি ‘র্যান্ডস্টাড’ নামে পরিচিত এবং ডাচ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। মালয়েশিয়াতে কুয়ালালামপুরের পাশাপাশি পেনাং ও জোহর বাহরুতেও প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র তৈরি হয়েছে।
সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ঢাকার আশপাশের শহরগুলোকে নিয়ে ‘গ্রেটার লন্ডন’ বা ‘গ্রেটার টোকিও’র মতো একটি সমন্বিত নগর অঞ্চলে রূপ দেওয়া সম্ভব। এটি কেবল স্থানান্তরের বিষয় নয়— এখানে জড়িয়ে আছে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রশ্ন। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ।
ঢাকার ওপর চাপ কমাতে রেল, বাস ও নৌপথ-ভিত্তিক যাতায়াত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সরকারি পরিকল্পনা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন আরও সম্মিলিত উদ্যোগ আর দৃঢ় সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয়, আদালত কিংবা বিশেষায়িত সরকারি সংস্থাগুলোর কিছু অংশ নিকটবর্তী জেলাগুলোতে স্থানান্তর করা হলে নতুন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র তৈরি হবে। যেমন, গাজীপুরে হতে পারে আমাদের সচিবালয় বা মন্ত্রণালয়গুলোর প্রধান কার্যালয়, অথবা বিচারিক কার্যক্রমের একটি অংশ স্থানান্তর করা যেতে পারে নরসিংদী জেলায়।
একইসঙ্গে ঢাকার আশেপাশের অঞ্চল নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্রকে বিস্তৃত করা যেতে পারে। গাজীপুরে ইতোমধ্যেই তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানার অবস্থান বেশি। টাঙ্গাইল জেলাকে টেক্সটাইল উদ্ভাবনের কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ জেলাকে আধুনিক বন্দর ও পণ্য স্থানান্তর কেন্দ্র এবং সাভারকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে সুযোগ-সুবিধা আরও সমানভাবে বণ্টিত হবে।
এই দ্বিতীয় সারির কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করতে ঢাকার বাইরে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, শিল্পাঞ্চলের বিস্তৃতি এবং দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য আন্তঃনগর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকেও আরও ক্ষমতায়িত করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা আর বাজেট বরাদ্দ স্থানীয় নেতৃত্বের হাতে থাকলে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়েই নেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদানের একটি একীভূত নগর শাসনব্যবস্থা চালু করা গেলে ঢাকার বর্তমান অব্যবস্থাপনা অনেকটাই কমানো সম্ভব। এতে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন প্রাণ সঞ্চার হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য হলেও ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা ও সুযোগের বিস্তার ঘটিয়েই কেবল দেশব্যাপী টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব। আজ বাংলাদেশের সামনে যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে, তা শুধু নগর পরিকল্পনার প্রশ্ন নয়। আমরা কি অতিরিক্ত চাপে নুয়ে হয়ে পড়া এক শহরকে ঘিরেই দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করবো, নাকি এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নগর কাঠামো নির্মাণ করবো যেখানে একাধিক শহরে সমানভাবে সুযোগের বিকাশ ঘটবে?
কারণ, দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করলে, ঢাকার একার পক্ষে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কখনোই সম্ভব হবে না। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও ঢাকার একার ওপর বর্তানো উচিৎ হবে না।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত