সার্চ ইঞ্জিন গুগল জানাচ্ছে, ‘‘১৯৭৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাকশালে যোগদান করেছিলেন।’’ আসলে এটা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যোগদান করে থাকতেই পারেন। সেটা সমগ্র শিক্ষকদের ওপর চাপানো মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। ওই সময় সমগ্র দেশে বাকশালে যোগদান করা, বা না করা নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন উঠেছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তার বাইরে থাকতে পারেননি। সেদিনের বিতর্কের আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সেদিনের সেই ইতিহাসটাই আজ তুলে ধরবো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ বছরপূর্তি উপলক্ষে শিক্ষক সমিতির কিছু গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরেছিলাম। সেই উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় সেটি ছাপা আছে। বাকশালে যোগদান করা নিয়ে শিক্ষক সমিতি আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিল।
বিতর্কিত বাকশাল ঘোষিত হবার পর তার প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মনোভাব কী ছিল, ওই সময়ের দৈনিক কাগজপত্র ঘাটলে অবশ্যই জানা যাবে। প্রতিদিন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ কর্মচারী-কর্মকর্তারা দলে দলে বাকশালে যোগদান করছেন, এমন খবর ঘটা করে ছাপা হচ্ছে। সেসব খবর পড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক কর্মচারী-কর্মকর্তারা নিজেরা কী করবেন— সেটা চিন্তা করা মোটেই অস্বাভাবিক ছিল না। সবার মধ্যে সেই আলোচনাটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। সেটাই ছিল স্বাভাবিক।
আমাকে একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (রুটা) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে ইসলামের ইতিহাসের অধ্যাপক সফিউদ্দিন জোয়ারদার এবং সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক বজলুল মোবিন চৌধুরী। বছর শেষে যখন ১৯৭৪ সালের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয় এবং দু’টি প্যানেলও ঘোষিত হয়, তখন জনৈক শিক্ষক রাজশাহী জজ কোর্ট থেকে নির্বাচনের বিরুদ্ধে এক স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। ফলে সে বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। শিক্ষকদের অনুরোধেও তিনি তা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন। এমনকি ১৯৭৫ সালের নির্বাচনও যথা সময়ে করা সম্ভব হয়নি। ফলে জোয়ারদার সাহেব ও বজলুল মোবিন চৌধুরীকে বাধ্য হয়ে সমিতির কাজকর্ম চালাতে হয়েছিল। তাঁরা সে দায়িত্ব থেকে মুক্তি চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকশাল গঠিত হয়েছিল। যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে বিতর্কে মুখ্য ভূমিকা তাঁদের ওপর এসে পড়েছিল।
১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে উপাচার্যের পদ থেকে খাঁন সারওয়ার মুর্শিদ পদত্যাগ করেন। ওই পদে যোগদান করেন অধ্যাপক মযহারুল ইসলাম। বাকশাল প্রতিষ্ঠার সময় তিনিই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় উপাচার্য। তিনি আওয়ামী লীগের একজন প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী। সম্ভবত লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও ছিলেন।
বাকশাল গঠিত হবার পর তিনি জোয়ারদার সাহেব ও বজলুল মোবিন চৌধুরীকে তাঁর অফিসে ডেকে পাঠান এবং শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভার মাধ্যমে শিক্ষকদের বাকশালে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অনুরোধ করেন। তাঁরা আপত্তি করে বলেন যে, এটা শিক্ষক সমিতির আওতায় পড়ে না। বাকশালে যোগ দেওয়া না দেওয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। উপাচার্য বলেন যে, বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিস আদালতের সবাই দলে দলে বাকশালে যোগদান করছেন। এমতাবস্থায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়েরই ক্ষতি হবে। তিনি বার বার তাঁদের অনুরোধ করতে থাকেন। তাঁরা তখন সবার সঙ্গে আলাপ করে দেখার কথা বলে চলে আসেন। এসেই তাঁরা তাঁদের বন্ধুবান্ধবদের অবহিত করেন। পরিসংখ্যান বিভাগের সভাপতি প্রফেসর খন্দকার মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে আমরা উপাচার্যের সেই অনুরোধ অস্বীকার করি এবং এ বিষয়ে সমিতির সাধারণ সভা ডাকার কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
তাঁরা উপাচার্যের অফিসে তাঁকে শিক্ষকদের মনোভাব জানিয়ে আসেন। তারপরেও উপাচার্য অনুরোধ করতেই থাকেন।
এদিকে শিক্ষকদের মধ্যে আওয়ামী লীগপন্থীরা শিক্ষক সমিতির কর্মকর্তাদের ওপর চাপ দিতে থাকেন এবং নিজেরাই বাকশালে যোগদানের ফরম তৈরি করে শিক্ষকদের কাছে যেতে থাকেন। তাঁদের এই উদ্যোগে সাধারণ শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়। এ বিষয়ে আমি শিক্ষকদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করি।
এক. দৃঢ়চেতা। তাঁরা মনোয়ার স্যারকে সামনে রেখে বিরোধিতা করতে থাকেন। দুই. দুর্বলচেতা। তাঁরা ভীত সন্ত্রস্ত। তিন. একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যাঁরা পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। এদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের ডেকে নিজেরাই বাকশালের যোগদানপত্রে সই করেন। ফলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ক্রমেই অস্বাভাবিক হতে থাকে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে মনোয়ার স্যার জোয়ারদার ও বজলুকে বলেন, ‘আপনারা কার্যকরী সংসদে সিদ্ধান্ত নিন।’ তাঁরা বলেন যে, এটা তো তাদের জুরিসডিকশনের বাইরে। যা হোক, বন্ধুবান্ধবদের অনুরোধে তাঁরা শিক্ষক সমিতির কার্যকরী পর্ষদের সভা আহ্বান করেন। কিন্তু কোরামের অভাবে সভা বাতিল করেন। পরে সবাইকে বিশেষ অনুরোধ করে সভায় আনেন। দুর্বল সদস্যরা সভায় চুপচাপ ছিলেন। সভায় একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল, সেটা উপাচার্যকে লিখিতভাবে জানান। তারপর বাকশালে যোগদানপন্থীরা সমিতির সাধারণ সভা আহ্বানের জন্য চাপ দিতে থাকেন। তাঁরা যোগদান-বিরোধীদের সঙ্গে আলাপ করেন। শেষে সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়। সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা বিষয়টা নিয়ে আলাপ করি। লক্ষ্য করি, অধিকাংশ শিক্ষক বাকশালে যোগদান করতে চান না। তারা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন। কিন্তু সাধারণ সভায় উপস্থিত হয়ে কিছু বলা বা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন দিতে দ্বিধান্বিত এবং ভীত ছিলেন।
একইরকমভাবে সাধারণ সভায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষকরা অনুপস্থিত থাকেন। সভাটি কোরাম সংকটে ভোগে। জুবেরী ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে উপস্থিত শিক্ষকরা, যাদের সাধারণ সভার প্রতি কোনও আগ্রহ ছিল না— বজলুল মোবিন চৌধুরীর সঙ্গে আমরা তাদের স্বাক্ষর আদায় করে কোনোভাবে কোরাম পূর্ণ করা হয়েছিল। সাধারণ সভাতেও একই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বাকশালে যোগদান করার বিষয়ে শিক্ষক সমিতির কোনও ভূমিকা নেই। কারণ এটা ব্যক্তিগত বিষয়। তবে প্রফেসর খন্দকার মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বিশ-বাইশ জন শিক্ষক বাকশালে যোগদান না করার পক্ষে খোলাখুলিভাবে প্রচারে নেমেছিলেন।
তাঁরা আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। সবার নাম মনে না থাকলেও বেশ কয়েকজনের নাম মনে আছে। তাঁদের অধিকাংশই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। হাসান আজিজুল হক ও আলী আনোয়ার তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
তাই বলছিলাম, গুগলের ওই বক্তব্য সঠিক নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঢালাওভাবে বাকশালে যোগদান করেননি। গুগলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সম্পর্কেও একইরকম মন্তব্য করা হয়েছে। আমার মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবাই ঢালাওভাবে বাকশালে যোগদান করেননি। উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে যোগদান করে থাকতেই পারেন। সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। তার সঙ্গে শিক্ষক সমিতির কোনও সম্পর্ক ছিল না।