বিশ্ব প্রবীণ দিবস

প্রবীণদের প্রতি দায় ও ভালোবাসার সংস্কৃতি গড়ে তুলি

প্রবীণ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় একটি প্রশ্ন প্রায়ই চাপা পড়ে যায়, যাঁরা আমাদের আজকের সমাজ গড়ে দিয়ে গেছেন, তাঁরা কেমন আছেন?

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ষাট বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ, যার প্রায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশের বয়স ষাটের বেশি। অর্থাৎ, প্রতি দশজনে একজন প্রবীণ।

ভবিষ্যৎ চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ইউএনএফপিএর হিসাবে, ২০৫০ সালে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা হবে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। তখন প্রতি পাঁচজনে একজন হবেন প্রবীণ। ফলে প্রবীণ জনগোষ্ঠী কোনো প্রান্তিক প্রসঙ্গ নয়, এটি জাতীয় ভবিষ্যতের একটি কেন্দ্রীয় বাস্তবতা। অথচ এই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি আমাদের নেই বললেই চলে।

প্রথম সমস্যাটি স্বাস্থ্যসেবার। প্রবীণদের প্রয়োজন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, আর্থ্রাইটিস, ছানি ও স্মৃতিভ্রংশের মতো রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রবীণবান্ধব সেবা প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান সুবিধা এই বাড়তে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়। গ্রাম-মফস্বলের একজন বৃদ্ধকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, যা শারীরিক ও আর্থিক, দুই দিক থেকেই কষ্টকর।

দ্বিতীয় সমস্যা আর্থিক নিরাপত্তার। বেশিরভাগ প্রবীণ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেছেন বলে তাঁদের পেনশন নেই। বয়স্ক ভাতা চালু হয়েছে ১৯৯৮ সালে এবং একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ মাসে ৬০০ টাকা করে পান, যা বাজারদরের তুলনায় খুবই সামান্য। ১ কোটি ৫৩ লাখ ষাটোর্ধ্ব মানুষের তুলনায় সুবিধাভোগীর সংখ্যাও সীমিত। ফলে লাখো প্রবীণকে এখনো নিজের জীবিকার জন্য কাজ করতে হয়। ২০২৩ সালে চালু হওয়া সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা আশার আলো হলেও বিপুলসংখ্যক প্রবীণ এখনো কোনো সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে।

তৃতীয় সমস্যা একাকিত্বের। যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, সন্তান শহরে বা বিদেশে আর বাবা-মা গ্রামের বাড়িতে বা ফ্ল্যাটে একা। বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করছেন, আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়ায় পরিবার ও সমাজভিত্তিক যত্নব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অথচ দীর্ঘস্থায়ী নিঃসঙ্গতা বিষণ্নতা ও স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ায়।

চতুর্থ সমস্যা অবহেলা ও নির্যাতন, যা আমাদের সমাজে একটি অস্বীকৃত সত্য। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি কটু কথা, সম্পত্তি থেকে বঞ্চনা আর উপেক্ষাও নির্যাতনেরই রূপ। তবু লজ্জা ও সামাজিক ভয়ে অনেকেই মুখ খোলেন না। আমরা বৃদ্ধাশ্রমকে সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক ভাবি, কিন্তু ঘরের ভেতরেই যে অনেকে অদৃশ্য নির্বাসনে আছেন, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাই।

২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন এবং জাতীয় প্রবীণ নীতি আমাদের একটি কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু প্রয়োগ ও সচেতনতাই আসল। সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্টার ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা, ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও আওতা বাড়িয়ে প্রকৃত অসহায় প্রবীণের কাছে তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা, ফুটপাত, গণপরিবহন ও পার্কসহ নগর পরিকল্পনাকে প্রবীণবান্ধব করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র ও সামাজিক ক্লাব গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

তবে শুধু রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপালে চলবে না। পরিবারই প্রবীণদের প্রথম আশ্রয়। প্রতিদিন কয়েক মিনিট পাশে বসা, খোঁজ নেওয়া, মতামত জিজ্ঞেস করার মতো ছোট বিষয়গুলোই একজন প্রবীণের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

প্রবীণদের আমরা প্রায়ই কেবল সহায়তার পাত্র হিসেবে দেখি, যা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁদের কাছে আছে জীবনের অভিজ্ঞতা, ইতিহাসের সাক্ষ্য ও সংকট মোকাবিলার প্রজ্ঞা। সুস্থ ও সক্ষম প্রবীণেরা শিক্ষা, সমাজসেবা ও পরামর্শদানে অবদান রাখতে পারেন। সেই সুযোগ পেলে সমাজ উপকৃত হয়, তাঁরাও নিজেদের প্রয়োজনীয় ভাবতে পারেন।

আজ যিনি প্রবীণ, একদিন তিনি তরুণ ছিলেন। আজকের তরুণও একদিন প্রবীণ হবেন। প্রবীণদের সঙ্গে আমরা আজ যে আচরণ করছি, ভবিষ্যতে সমাজ আমাদের সঙ্গেও তা-ই করবে। তাই প্রবীণের যত্ন নৈতিক দায়িত্ব যেমন, তেমনি সম্মিলিত ভবিষ্যতের প্রতি বিনিয়োগও।

প্রবীণ দিবস যেন বছরে একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার, তিন স্তরেই এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠুক, যেখানে বার্ধক্য হবে সম্মান ও নিরাপত্তার একটি পর্যায়, একাকিত্ব ও অবহেলার নয়।

লেখক: বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, উপ-পরিচালক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমস