সন্তান বড় হচ্ছে, নাকি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

রাত সাড়ে ১০টা। পড়ার টেবিলে বই খোলা, কিন্তু ১৩ ছুঁইছুঁই অরুর মন পড়ে আছে ফোনের স্ক্রিনে। মেয়েকে দেখে মা তাহেরার মনে হয়, কয়েক দিন ধরে অরু কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। আগে স্কুল থেকে ফিরেই সারাদিনের গল্প করতো। এখন কিছু জানতে চাইলেই ছোট ছোট উত্তর দেয়।

তাহেরা: ‘অরু, কী হয়েছে মা? কয়েক দিন ধরে এত চুপচাপ কেন?’
অরু: ‘কিছু হয়নি।’
তাহেরা: ‘স্কুলে কেউ কিছু বলেছে?’
অরু: ‘মা, প্লিজ! সবকিছু নিয়ে এত প্রশ্ন করো না!’
মেয়ের কথায় কষ্ট পান তাহেরা। তবু বলেন, ‘আমি তো তোমার ভালোর জন্যই জিজ্ঞেস করছি।’

অরু এবার মুখ তুলে বলে, ‘তুমি কিছুই বুঝবে না! তোমাকে বললেও হয়তো বলবে, এত ছোট ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ করার কী আছে!’

কথাটা শুনে চুপ করে যান মা। সত্যিই তো, মেয়ের কান্নাকে কখনো ‘নাটক’ বলেছেন, বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্যকে বলেছেন ‘বাচ্চামি’। কিন্তু অরুর কাছে যে ঘটনাটি পুরো পৃথিবীর মতো বড় মনে হতে পারে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন?

রাতে মেয়ের ঘরে গিয়ে পাশে বসেন তাহেরা। কিন্তু অরু আপত্তি জানায়, ‘মা, আমাকে একটু একা থাকতে দাও।’
তাহেরা জবাব দেন, ‘একা থাকতে চাও, থাকো। শুধু একটা কথা বলো—তুমি কষ্ট পেলে কি আমাকে বলতে ভয় পাও?’

অরু উত্তর দেয় না। শুধু চোখের কোণের জল মুছে নেয়। মা বুঝতে পারেন, মেয়েটি হয়তো তাঁর কাছ থেকে দূরে যেতে চাইছে না। বরং এমন একটি জায়গা খুঁজছে, যেখানে নিজের কষ্টের কথা বললেও তাকে বকা খেতে হবে না, ছোট করে দেখা হবে না।

গল্পটা কি আপনার পরিবারের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে?

হয়তো আপনার সন্তানের নাম অরু নয়। সেও হয়তো ১২, ১৩ কিংবা ১৪ বছরের। আগের মতো সব কথা বলে না, নিজের ঘরে সময় কাটাতে চায়, অল্পতেই রেগে যায় কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ করে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চ্যাট করে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে।

আমরা অনেক সময় ভাবি, সন্তান অবাধ্য হচ্ছে কিংবা ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কিন্তু তার শরীর, মন, বন্ধুত্ব ও নিজের পরিচয় নিয়ে বোঝাপড়ার মধ্যে যে একই সঙ্গে অনেক পরিবর্তন ঘটছে, তা কি খেয়াল করি?

কৈশোর: শরীরের পাশাপাশি মনেরও পরিবর্তন

বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আবেগের ওঠানামা, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজন বাড়তে পারে। কোনো বন্ধুর মন্তব্য, নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে তুলনা কিংবা বন্ধুত্বে ভাঙন—এসব বিষয় কিশোর-কিশোরীদের গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আনুমানিক প্রতি সাতজনের একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি মন খারাপই মানসিক রোগ। বরং দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট ও আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে জেসিপিপি অ্যাডভানসেস সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় (সিস্টেমেটিক রিভিউ) ৩৭টি গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বাবা-মা ও কিশোর-কিশোরীদের যোগাযোগের মানের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যার চিন্তাসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সূচকের সম্পর্ক পাওয়া যায়। এটি সরাসরি কারণ ও ফলের সম্পর্ক প্রমাণ করে না। তবে সন্তানের কথা শোনা এবং তার সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে।

তাহলে আমরা কী করবো?

উপদেশ দেওয়ার আগে শুনি: সন্তান কথা বলতে না চাইলে জোর না করে বলুন, ‘তুমি যখন কথা বলতে চাইবে, আমি আছি।’ তার কষ্টকে ‘ছোট ব্যাপার’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন।

ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করি: ঘরে ঢোকার আগে নক করা, ব্যক্তিগত ডায়েরি বা বার্তা গোপনে না পড়া এবং বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতা দেওয়া—এসব আচরণ সন্তানের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে শান্তভাবে আলোচনা করুন।

পরিবর্তনগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলি: শরীরের বৃদ্ধি, বন্ধুত্ব, চেহারা নিয়ে অস্বস্তি ও অনলাইন নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে সন্তান প্রশ্ন করতে লজ্জা বা ভয় না পায়।

প্রতিদিন একটু সময় দিই: একসঙ্গে খাওয়া, হাঁটা কিংবা ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট গল্প করা—কোনও জেরা বা বিচার ছাড়া কাটানো এই সময়গুলোই বিশ্বাসের সেতু গড়ে তোলে। ইউনিসেফের অভিভাবকত্ববিষয়ক নির্দেশিকাতেও কৈশোরের পরিবর্তিত চাহিদা অনুযায়ী যোগাযোগ ও সহায়তার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

সন্তান যদি দীর্ঘদিন মন খারাপ করে থাকে, নিজেকে গুটিয়ে নেয়, নিজেকে মূল্যহীন মনে করার কথা বলে কিংবা নিজের ক্ষতি করার ইঙ্গিত দেয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। শান্তভাবে তার কথা শুনুন এবং প্রয়োজনে শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

কৈশোরে সন্তানের সব সমস্যার সমাধান বাবা-মা দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁরা এমন একটি নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠতে পারেন, যেখানে কষ্টের কথা বলতে সন্তানকে ভয় পেতে হয় না।

তাহেরার মতো আমাদেরও হয়তো নতুন করে শুরু করতে হবে। সন্তানকে বলতে হবে, ‘তোমার সব সমস্যার সমাধান আমার জানা নেই। কিন্তু তুমি কষ্ট পেলে আমি তোমার কথা শুনব। বিচার করার আগে বোঝার চেষ্টা করব।’

কারণ সন্তান সব সময় সমস্যার সমাধান চায় না। কখনো কখনো সে শুধু চায়, কেউ তার কথাটা মন দিয়ে শুনুক। তাই নিজেকে প্রশ্ন করি—আমার সন্তান যখন খুব কষ্টে থাকে, তখন কি সে নির্ভয়ে আমার কাছে এসে বলতে পারে, ‘মা, আমার খুব খারাপ লাগছে’?

লেখক: শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রশিক্ষক এবং শিশু বিকাশবিষয়ক গবেষক ও লেখক