১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে জগন্নাথ হলের পুরোনো অ্যাসেম্বলি ভবনের টেলিভিশন কক্ষে শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অতিথিরা বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ দেখছিলেন। দিনভর বৃষ্টির পর রাত ৯টার দিকে ছাদ ধসে পড়ে। নির্মমভাবে প্রাণ হারান ৩৯ জন; আহত হন প্রায় ৩০০ জন। একটি সাধারণ আনন্দময় সন্ধ্যা-রাত মুহূর্তে পরিণত হয় অসহনীয় শোকের রাতে।
সেই প্রাণহানির স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর শোক দিবস পালন করে। কিন্তু আমার কাছে দিনটি শুধু স্মরণের নয়; অবহেলার দায় সম্পর্কে উত্তর চাওয়ারও দিন। আমি জগন্নাথ হলের ছাত্র ছিলাম, এই ট্র্যাজেডির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম। তৎকালীন ছাত্রসংগঠনের কর্মী হিসেবে অন্যায় ও অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি জোরালো কণ্ঠে, সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করেছি, দাবি তুলতে উৎসাহ দিয়েছি।
আমাদের প্রতিবাদের কেন্দ্রে ছিল শিক্ষার্থীর জীবনকে এমন অবহেলা করার কর্তৃপক্ষীয় উদাসীন মানসিকতা। একচল্লিশ বছর পরও সেই প্রতিবাদের চেতনা থেকে একটুও সরে আসিনি। কারণ যে নিষ্ঠুর বেদনায় সতীর্থের লাশ বহন করেছি, সে কষ্ট আজও আমার বুকের গহিনে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। অক্টোবর এলেই তাই বেদনায় কেমন যেন সেই মৃত্যুর হাহাকারকেই শুধু দেখি। পরবর্তীকালে ভবন নির্মাণ, আর্থিক সহায়তা কিংবা পুনর্বাসনের বিবরণ শুনলে অনেকের মতো আমিও কিছুটা স্বস্তির অবকাশ খুঁজে পাই। কিন্তু এখনও জানতে চাই—যে অবহেলা আমাদের সতীর্থ-স্বজনদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তার দায়ের কী যথার্থ কোনও নিষ্পত্তি আজ অবধি হয়েছে?
অক্টোবর এলেই হলের ভবনগুলোর সামনে ও অভ্যন্তরীণ সড়কে রবীন্দ্রনাথের ‘মরণসাগরপারে তোমরা অমর, তোমাদের স্মরি’—এই চরণসংবলিত ব্যানার দেখা যায়। আমাদের শোক, শ্রদ্ধা ও সান্ত্বনা খোঁজার আকাঙ্ক্ষা সেখানে মিশে থাকে। আমিও সেই শ্রদ্ধার অংশীদার। তবু প্রশ্ন জাগে— যাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষা পেলো না, তাঁদের ‘অমর’ ঘোষণা করেই কি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সম্পন্ন হতে পারে? একই গানে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন:
‘‘বন্দীরে দিয়ে গেছ মুক্তির সুধা,
তোমাদের স্মরি।
সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা,
তোমাদের স্মরি।’’
এই পঙ্ক্তিগুলোর আলোয় স্মরণের অর্থ আরও গভীর হয়। নিহতদের মৃত্যু অন্যদের মুক্ত করেছে—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। মৃত্যু নিজে মুক্তির অর্জন নয়। এখানে মুক্তির বাস্তব অনুষঙ্গ হতে পারে তথ্য উন্মুক্ত করা, প্রশ্নের সুযোগ দেওয়া, দায় নির্ণয় এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। ছাত্রদের মৃত্যু এসব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করেনি; জীবিতদেরই সেই দায়িত্ব নিতে হবে। ‘সত্যের বরমালে সাজালে বসুধা’ চরণে একটি সম্পন্ন কাজের স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ এই মৃত্যুগুলোকে ঘিরে সত্য কি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বিপর্যয় অবহেলার বাস্তবতা সামনে আনতে পারে; কিন্তু প্রমাণ, প্রকাশ ও জবাবদিহির মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠা করা পৃথক দায়িত্ব। সেই কাজ অসম্পূর্ণ রেখে পঙ্ক্তিটিকে ঘটনার নিষ্পন্ন বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করতে আমার সংশয় হয়।
আমি ব্যানার কিংবা স্মরণ অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করছি না। নিহতদের স্মৃতি দৃশ্যমান রাখা প্রয়োজনীয় মানবিক কাজ। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান স্মরণ করছে, তার দায়িত্ব শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি মৃত্যুর পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া। দীর্ঘদিনের বিপজ্জনক অবস্থা ও মেরামতের আবেদন সত্ত্বেও ভবনটি কেন ব্যবহৃত হচ্ছিল—এই প্রশ্ন এড়িয়ে স্মরণ পূর্ণতা পায় না।
জগন্নাথ হলের একসময়ের প্রাধ্যক্ষ প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. রংলাল সেন তাঁর ‘জগন্নাথ হলের অক্টোবর দুর্ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়া’ প্রবন্ধে সংস্কারের প্রয়োজন এবং বারবার চিঠি দেওয়ার কথা লিখেছেন। তিনি ১৯৭৩-১৯৮৩ সময়ে বিভিন্ন প্রাধ্যক্ষের মেরামতের আবেদন এবং তাঁর পরবর্তী প্রাধ্যক্ষের ১৯৮০ সালের এপ্রিলের চিঠির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগেই বিপর্যয় ঘটে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির এই সাক্ষ্যকে নিছক আবেগ বলে সরিয়ে দেওয়া যায় না। অধ্যাপক জগদীশ চন্দ্র শুক্লদাসের স্মৃতিবয়ানেও মেরামতের আবেদন, বিপজ্জনক অবস্থার সতর্কতা এবং মেরামতের সঙ্গে ভবন ব্যবহারের উদ্বেগজনক সম্পর্ক উঠে এসেছে। এসব বিবরণ ঘটনার ব্যাখ্যায় শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করার সীমাবদ্ধতা দেখায়। বৃষ্টি পরিস্থিতির অংশ ছিল; কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত মানুষের হাতে ছিল এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
তবে স্মৃতিকথা ও প্রশাসনিক নথির পার্থক্য বজায় রেখেই দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। কোন দফতর কখন আবেদন পেয়েছিল, কী পরীক্ষা হয়েছিল, কী সুপারিশ এসেছিল এবং ব্যবহার সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—সংশ্লিষ্ট চিঠি, প্রকৌশল মতামত ও কার্যাদেশে তার উত্তর খুঁজতে হবে।
আমাদের দাবি প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী ঘোষণা করা নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিভিত্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া। এই দাবি শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক থেকেই আসে। সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে পরিবার শিক্ষা ও নিরাপত্তার ওপর আস্থা রাখে। শিক্ষার্থী ভবনের কাঠামো পরীক্ষা, মেরামতের বরাদ্দ অনুমোদন কিংবা ঠিকাদারের কাজ তদারক করতে পারে না। এসব ক্ষমতা যাদের হাতে, তাদের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীর জীবনকে প্রভাবিত করে। তাই প্রাণহানির ইতিহাসে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ইতিহাসও থাকতে হবে।
ঘটনার পর উদ্ধার, চিকিৎসা ও রক্তদানে যে অসাধারণ মানবিক সংহতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হকের ‘স্মৃতিচারণ’ লেখায় হাসপাতালের পরিস্থিতি ও মানুষের সহযোগিতার বিবরণ রয়েছে। সেই অবদানের স্বীকৃতি অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু পরবর্তী উদ্ধারকাজে নিষ্ঠা পূর্ববর্তী দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন মুছে দেয় না। নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ড. সৌমিত্র শেখরের প্রবন্ধে সহায়তা, ভর্তি-সুবিধা ও ট্রাস্টের পাশাপাশি কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগের উপকার অস্বীকার করি না। কিন্তু সহায়তা ক্ষতি কিছুটা লাঘব করে; প্রশাসনিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেয় না। নতুন ভবন প্রয়োজন পূরণ করতে পারে; অবহেলার দায় নিজে থেকে বিষয়টিকে কখনও নিষ্পন্ন করে না।
বর্তমান প্রশাসনকে ১৯৮৫ সালের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায়ের সঙ্গে এক করে দেখা সমীচীন নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় একটি ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান। প্রশাসক বদলালেও নথি সংরক্ষণ, সত্যপ্রকাশ ও শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার দায়িত্ব বহাল থাকে। ভুল স্বীকার করলে বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদা হারায় না; মর্যাদার সংকট হয় যখন আনুষ্ঠানিকতা বাড়ে, অথচ উত্তর অনুপস্থিত থাকে।
আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ‘জগন্নাথ হলের ট্র্যাজেডি’ প্রবন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাহীনতা ও শিক্ষার প্রতি সামাজিক উপেক্ষার বৃহত্তর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয়, জীবনরক্ষার জরুরি ব্যয় দৃশ্যমানতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। নতুন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের রক্ষণাবেক্ষণও উন্নয়নের অপরিহার্য দায়িত্ব। তাই বিশ্ববিদ্যালয় মেরামতের চিঠি, তদন্তের উপকরণ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নথি-সংগ্রহ প্রকাশ করুক। পরিবার ও আহতদের সম্মতিতে তাদের সংরক্ষিত নথি যুক্ত করা যায়; প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য আলাদাভাবে চিহ্নিত থাকুক। উদ্দেশ্য পূর্বনির্ধারিত রায় নয়, সত্য যাচাইয়ের বিশ্বাসযোগ্য ক্ষেত্র তৈরি করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবসে তাই আমাদের দাবি— দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া এমন ক্ষমাহীন অবহেলায় মৃত্যুর জবাবদিহির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জনসমক্ষে উন্মুক্ত করা হোক।
সেইসঙ্গে বর্তমান নিরাপত্তার অগ্রগতিও জানানো হোক। এটি শুধু জগন্নাথ হলকেন্দ্রিক কোনও দাবি নয়; প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হল, শিক্ষক/কর্মকর্তা- কর্মচারীদের আবাসন কাঠামোর কোন ভবন প্রকৌশলগতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে, কোথায় মেরামত জরুরি, দায়িত্ব কার—শিক্ষার্থীরাসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই তা জানুক। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে নিরাপদ বিকল্প আবাসন এবং অভিযোগের পর নির্দিষ্ট সময়ে পরিদর্শন ও উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থাপনাকে জোরদার করা হোক। শুধু ভবিষ্যতের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বর্তমান ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। একচল্লিশ বছর পর আমার অবস্থান প্রতিহিংসার নয়; নিহতদের স্মৃতির প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে দায়িত্ব পালনের তাগিদবোধের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেকোনও অবহেলার, যেকোনও অভিযোগের যথাযথ উত্তর দিক, গৃহীত ব্যবস্থার নথি দেখাক এবং অনিষ্পন্ন বিষয় অকাতরে স্বীকার করুক। ‘তোমাদের স্মরি’ তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন স্মরণের সঙ্গে সত্য জানার অধিকার ও একই ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধের দায়িত্ব উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বীকৃত হবে। তাঁদের ‘অমর’ ঘোষণার পাশাপাশি এ প্রশ্নটিও দৃশ্যমান থাকুক: তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার কেন রক্ষা পেলো না?
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, জগন্নাথ হলের ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র