ছবির রাজনীতি ও ক্ষমতা

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম যখন থেকে কাজ করা শুরু করলো, তখন থেকে তা হয়ে উঠলো রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। গণতন্ত্র মজবুত করার কাজ গণমাধ্যম সচেতন ও নির্দিষ্টভাবে করতে পারে না, তা করা তার কাজও না। রাজনীতির বিশ্লেষণ, সমালোচনা,পাঠক-দর্শকের প্রতিক্রিয়া, সরকারের ত্রুটিবিচ্যুতি তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যমের কাজটি করা হয়ে যায়।

মিডিয়া আরও কী করে? মানুষকে বিনোদন দেয়, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহ করে এবং তাদেরকে এমন কিছু মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আচরণবিধির সঙ্গে যুক্ত করে যাতে সমাজের সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আর এখানেই চিত্রসাংবাদিকতা ব্যাপকভাবে কাজে আসে। কেননা, স্থিরচিত্র ভীষণ সরাসরি, নিখুঁত, সত্য ও যোগাযোগমূলক বা কমিউনিকেটিভ। এ জন্যই তাত্ত্বিক সুজান সনটাগ বলেছেন, ‘আলোকচিত্র সাক্ষ্য দেয়। এমন কিছু যার সম্পর্কে আমরা শুনি কিন্তু সন্দিহান থাকি, তার একটি আলোকচিত্র বিষয়টিকে প্রমাণ করে দেয়।’

কিন্তু মিডিয়া কি সব সময় তার কাজটি করতে পারছে? করতে যে পারছে না তার নিদর্শন আমরা প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। পারে না কেন? ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট: দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব দ্য ম্যাস মিডিয়া ইজ অ্যা নাইনটিন এইটি-এইট’ গ্রন্থে এডওয়ার্ড এস. হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি বলছেন, গণমাধ্যমগুলো বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের স্বাধীন বা গণমুখী হওয়া খুবই কঠিন। যেখানে সম্পদ কেন্দ্রীভূত এবং শ্রেণীস্বার্থের সংঘাত প্রকট, সেখানে মিডিয়ার স্বাধীন হওয়া তো দূরের কথা— বরং বিজ্ঞাপনদাতাদের হয়ে কাজ করে।

যে মিডিয়ার মালিকানা কোনো বড় অভিজাত করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে, সেই মিডিয়া তার মালিকের স্বার্থ দেখবে না জনগণের চাহিদা? উত্তরটা আমাদের জানা। শুধুমাত্র পাঠকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার ঝুঁকি ও ধৈর্য বেশিরভাগ গণমাধ্যমের থাকে না। গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন, এখন ‘‘পেশাদার গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু তথ্য সরবরাহ করা নয়; বরং যে অর্থনৈতিক ইকো-সিস্টেম সংবাদমাধ্যম ও সেগুলোর মালিকদের টিকিয়ে রাখে, তাকেও সমর্থন যুগিয়ে যাওয়া। যদিও এমন এক যুগে গণমাধ্যমকে (নতুন করে) বোঝার কথা বলা হচ্ছে, যখন তথ্যের উৎস নাটকীয়ভাবে বহুমুখী। এখন আর প্রচলিত গণমাধ্যম তথ্যের প্রধান উৎসও নয়, অন্যতম উৎস। তারপরও গণমাধ্যম ও তার মালিকানা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।’’ (দ্য মিডিয়া ইন বাংলাদেশ: ক্রাইসিস চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড ট্রানজিশন)।

গণমাধ্যমের মালিক অথবা বিজ্ঞাপনদাতারা ব্যবসায়িক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বলয়ের কেন্দ্রে বা কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকে। আর এ জন্যই গণমাধ্যমকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের তাঁবেদারি করতে হয়। ফলে আমরা সংবাদমাধ্যমকে সরকারি প্রচারপত্রে পরিণত হতে দেখি। তখন গণমাধ্যম শুধু সরকারকে সমর্থনই করে যায় তা নয়, সে নিজেকে সরকারের হাতে সঁপে দেয়— যাতে সরকার তাকে পুতুলের মতো ব্যবহার করতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের ইতিহাসে যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারাই এসেছে, তারাই এমনটি করছে, কম বা বেশি ধরনের ওপর ভিত্তি করে মার্শাল ম্যাকলুহান তার আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া দ্য এক্সটেনশনস অব ম্যান গ্রন্থে এই গণমাধ্যমকে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন, হট (উষ্ণ) মিডিয়া ও কুল (শীতল) মিডিয়া। তিনি এই হট মিডিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফটোগ্রাফিকে। কেননা, ছবি অনুধাবন করতে একক ইন্দ্রিয়ের (চোখ) ওপর নির্ভর করতে হয় এবং ছবি হাই-ডেফিনেশন। অর্থাৎ ছবি নিজেই অনেক তথ্য বা ডাটা সরবরাহ করে, ফলে দর্শককে খুব বেশি কল্পনা বা চিন্তার আশ্রয় নিতে হয় না। হ্যাঁ, এ জন্যই ছবির ভাষা প্রায় সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সহজ ও গ্রহণযোগ্য। একজন কম জানাশোনা মানুষও একটি ছবির সঙ্গে সহজেই একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে।

একই কারণে ছবির প্রভাব ব্যাপক। এর ছড়িয়ে পড়ার গতিও বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সেই গতি বিদ্যুৎ-গতিতে রূপ নিয়েছে। তবে আলোকচিত্রের শক্তি ও দুর্বলতা পুরোপুরি নির্ভর করতে পারে তার উপস্থাপনের ওপর। অনেক সময় ছবিতে কী দেখাচ্ছি— তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে কীভাবে দেখাচ্ছি বা কতটুকু দেখাতে চাইছি। সুজান সনটাগ বলেছেন, ‘একটি কুৎসিত বা কিম্ভূত বিষয় আলোকচিত্রীর মনোযোগ পেয়ে একটি নাড়া দেওয়ার মতো ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে। একটি সুন্দর বিষয় হতে পারে বেদনার উৎস।’ (অন ফটোগ্রাফি) রেহনুমা আহমেদ তার পরিবেশনের রাজনীতি প্রবন্ধে বলেছেন, মিডিয়া কী পরিবেশন করে, কীভাবে পরিবেশন করে তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শুধু তাই নয়, আমরা দেখি মিডিয়ার সঙ্গে ওই রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণেই অনেক কিছু পরিবেশনই করা হয় না।

আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, রাজধানীর মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার যখন হচ্ছিল— তখন সহনীয় বিড়ম্বনা ভোগ করেছে ওই এলাকার সড়ক ব্যবহারকারীরা। ফ্লাইওভার নির্মাণ শেষে নতুন করে শুরু হয় দীর্ঘ মেয়াদী ভোগান্তি। উড়াল সড়ক হলেও এর নিচের সড়কগুলো ছিল খানাখন্দ ও কাদায় ভরপুর।

চলতে গিয়ে যানবাহন উল্টে যাওয়া ছিল নিয়মিত ঘটনা। আর অসীম যানজট তো লেগে থাকতই। আমি তখন একটি দৈনিক পত্রিকার ফটোসাংবাদিক। এই নানামুখী ভোগান্তির ছবি আমরা তুলতাম। কিন্তু একটি ছবিও ওই পত্রিকায় ছাপা হতো না। আমরা আবারও  তুলতাম। একদিন বিরক্ত হয়ে প্রধান বার্তা সম্পাদক আমাদের জানিয়ে দিলেন, এই ছবি তুলে লাভ নেই। ছাপা হবে না। কেন ছাপা হবে না? কারণ, এই ছবি একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে যায়! যারা মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর সেই কোম্পানিটি হলো পত্রিকাটির অন্যতম সুহৃদ এবং বিজ্ঞাপনদাতা।

আর যে ছবি ছাপা হয়, যতটা ছাপা হয় তার সঙ্গেও নানা হিসাব-নিকাশ থাকে। মিডিয়া মালিক-সংশ্লিষ্ট ‘সফলতার ঘটনা’র ছবি ফলাও করে ছাপা হবে, অনেক সময় প্রথম পাতার প্রধান ছবি, এ ধরনের ঘটনার ছবি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট না হলে তা ছাপা হবে ভেতরের কোনো পাতায় গুরুত্বহীনভাবে অথবা বাদ যাবে। এমনও হয় ঘটনার গুরুত্ব কমে যাওয়ার পর সেই ঘটনার ছবি ছাপা হয়। গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ ছবি ছাপানোর ক্ষেত্রেও বেশিরভাগ পশ্চিমা গণমাধ্যম একইভাবে হিসাব-নিকাশ করেছে, করে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্ট ২০২৪ সালের গোড়ার দিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য লস এঞ্জেলেস টাইমস-এর ছয় সপ্তাহের গাজা-সংক্রান্ত সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এই সংবাদপত্রগুলো ইসরায়েলি নিহতদের ছবি এবং তাদের পরিবার ও বেদনার ছবি অনেক বেশি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনে ব্যাপক প্রাণহানি সত্ত্বেও সেখানকার ছবিগুলোতে মানবিক দিকের চেয়ে ধ্বংস্তূপ, দূরবর্তী দৃশ্য বা শুধু পরিসংখ্যান উপস্থাপনের প্রবণতা বেশি ছিল। যুক্তরাজ্যের ‘সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং’ (সিএফএমএম) বিবিসি ও স্কাই নিউজ-এর বেশ কিছু বড় গণমাধ্যমের আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, ৭০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে এই সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলিদের ক্ষেত্রে পারিবারিক ও ব্যক্তিভিত্তিক দৃশ্যগল্প দেখিয়েছে। অপর দিকে ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে শুধু গণকবর, ধ্বংসস্তূপের ছবি বা বিচ্ছিন্ন সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে, যা পাঠক ও দর্শককের মনকে সরাসরি নাড়া দিতে কাজ করে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ যা জানিয়েছে, তা আরও ভয়াবহ। তারা ৬০টিরও বেশি দেশ থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ১ হাজার ৫০টিরও বেশি পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখেছে, গাজার মানবিক বিপর্যয়ের ছবি সংবলিত পোস্টগুলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফিল্টারের মাধ্যমে চেপে রাখে ‘মেটা’। ছবি উপস্থাপনের এমন স্বার্থকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ ভুরিভুরি।

এ জন্যই গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও গঠনমূলক আলোচনা সামনে আনার দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখেন গণমাধ্যম পরিবীক্ষণের সহজ পুস্তক গ্রন্থের লেখক সেলিম রেজা নিউটন। তিনি বলছেন, ‘যদি শুধু বলা হয়, মিডিয়া বাস্তবের বিবরণ পেশ করে, তাহলে পুরোটা বলা হয় না। কারণ, বিবরণ দিতে গেলেও কিছু প্রসঙ্গ বাছাই করতে হয়, কিছু প্রসঙ্গ বাদ দিতে হয়, সেগুলোকে কম-বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। আর এই সব সিদ্ধান্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের ওপর বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। তাছাড়া মিডিয়া নিজেও সমাজে সবচাইতে শক্তিধর প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হিসেবে হিসেবে যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি-ক্ষমতা অর্জন করে ও সমাজদেহে প্রয়োগ করে। এসবের নিরিখে বাস্তবের বিবরণ কথাটি নেহায়েতই জোলো শোনায়।’

গণমাধ্যমের এই গণবিচ্ছিন্ন প্রবণতা থেকেই নব্বইয়ের দশকে জন্ম নিয়েছিল ‘সিএনএন ইফেক্ট’ তত্ত্ব। যেখানে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির এজেন্ডাকে প্রভাবিত করতে গণমাধ্যম অব্যাহতভাবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে গুরুত্ব দিতে থাকে। যাতে জনমত ও নীতিনির্ধারণ প্রভাবিত হয়। যেমন, সাদ্দাম যখন কুয়েত দখল করলেন, তখন দেশটি থেকে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থীদের দৃশ্যগুলো বারবার প্রচার করা হয়।

নাটকীয় ছবিগুলো বারবার সম্প্রচার করার মাধ্যমে জনমতকে উসকে দেওয়া হচ্ছিল, যার ফলে নীতিনির্ধারকরা সামরিক হস্তক্ষেপ করতে প্ররোচিত হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছিল ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর। এ প্রসঙ্গে জনপ্রিয় সুইস লেখক রল্ফ ডোবেলির মন্তব্য চিন্তার খোরাক যোগায়। তিনি বলেছেন, ‘সন্ত্রাসবাদ কার্যকর হয় কেবল সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে। সন্ত্রাসীদের আসল অস্ত্র বোমা নয়, বোমার আতঙ্ক। প্রকৃত হুমকি তত বড় নয়, কিন্তু তার হুমকি বিশাল। এই ভারসাম্যের খেলা সম্ভব হয় সংবাদমাধ্যমের কারণেই।’ (স্টপ রিডিং দ্য নিউজ) শুনতে আতঙ্কের মনে হলেও সত্যি, অনেক ক্ষেত্রে গণমাধ্যমেই ঠিক করে আমরা কী নিয়ে ব্যস্ত থাকব, কী সমর্থন বা বর্জন করব—এমনকি কী খাব, কী খাব না। মিডিয়ার অন্যতম কাজ পাঠক-দর্শককে ধরে রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এর মাত্রা তীব্রতর হয়েছে। সবাই সবচেয়ে বেশি ভোক্তাকে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যস্ত রাখার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আর এই কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ছবি। সুজান সনটাগও বলছেন, ‘সাংবাদিকতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ছবির কাজটাই হলো মনোযোগ ধরে রাখা, চমকে দেওয়া, শিউরে তোলা।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘জনগণের মনোযোগ চালিত হয় গণমাধ্যমের মনোযোগ দ্বারা—অর্থাৎ নিঃসন্দেহে ছবির মাধ্যমে।’ (রিগার্ডিং দ্য পেইন অব আদার্স) ‘কম্পোজিশন’ ফটোগ্রাফির নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ফটোসাংবাদিকতায় কম্পোজিশন রাজনীতির অংশও হতে পারে। এককথায় বললে, সৃজনশীল যোজন ও বিয়োজনই কম্পোজিশন। বহু ক্ষেত্রে এই যোজন ও বিয়োজনম রাজনৈতিক হয়ে থাকে। কম্পোজিশনের মাধ্যমেই আংশিক সত্যকে পুরো সত্য বলে হাজির করা হয়ে থাকে। আবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো কিছু যোজনের মাধ্যেমও সত্যকে ‘ম্যানুপুলেট’ করা সম্ভব। তা ছাড়াও রয়েছে ছবি কাটাছেঁড়ার মাধ্যমে কৃত্রিম তথ্য উপস্থাপনের প্রবণতা। যেমন- ২০০৮ সালে ইরান নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করতে একটি ছবি প্রকাশ করেছিল। ছবিতে দেখা যায় চারটি মিসাইল উৎক্ষেপন করা হচ্ছে। আরও বলা হয়, এই মিসাইল ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম। সেই ছবি প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রকাশও করে। পরে প্রমাণ হয়, চার নম্বর মিসাইলটি ছবিতে ছিল না, তা ফটোশপের মাধ্যমে যোগ করা হয়েছিল! ইরানি মিসাইলের ছবিটি থেকেও বোঝা যায়, ক্ষমতা জানান দিতে ছবি কীভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ক্ষমতাকে কেন্দ্রিভূত করতে ফটোগ্রাফ হাতিয়ার। কারও চরিত্র হরণ করতে বা কাউকে খারিজ করতে কিংবা কাউকে মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ছবির নানা ধরনের ব্যবহার প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এমন ব্যবহার শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে হয় তা নয়, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও হয়। কৃত্রিম ছবিকে আরও বেশি সত্যের মতো দেখাতে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। গণমাধ্যম জনবান্ধব হয় না বলেই মানুষ তাদের প্রশ্নের উত্তরগুলোর উত্তর খুঁজতে অন্যান্য মাধ্যমের শরণাপন্ন হয়। তখন তারা ভুয়া খবর ও ছবিতেও বিশ্বাস করা শুরু করে। গণমাধ্যম যদি গণমানুষের চাহিদা পূরণ করত, তাদের আলোকিত করত, তাহলে মিথ্যা খবরের সুনামি অনেকটাই আটকানো যেতো।