বিশ্বকাপ ফুটবল কি শুধুই একটি মহাযজ্ঞ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা? না, আসলে এটি আবেগ, ইতিহাস, পরিসংখ্যান, কৌশল, অর্থনীতি এবং জাতীয় পরিচয়ের এক অনন্য সমন্বয়। প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ঘিরে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়, তা অন্য কোনও ক্রীড়া আসরের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উন্মাদনা যেন আরও বিশেষ মাত্রা পায়। বিশ্বকাপ এলেই দেশের গ্রাম থেকে শহর, চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, অফিস-আদালত, রেল-সড়ক-নৌ পরিবহন, বাজার-ঘাট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পারিবারিক আড্ডা-সবখানেই শুরু হয় ফুটবল বিতর্কের উৎসব।
বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থনের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে মানুষের আবেগ। কয়েক দশক ধরে দেশের বেশিরভাগ ফুটবলপ্রেমী এই দুই শিবিরে বিভক্ত। অনেক গবেষক ও ক্রীড়া বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সেভেন আপ; যেমন একটি সংখ্যা নয়, তেমনই ২০১৪ সালের আর্জেন্টিনার ফাইনাল হারও কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়। এগুলো কোটি সমর্থকের হাসি, কান্না, তর্ক-বিতর্ক ও স্মৃতির অংশ। বিশ্বকাপ এলেই সেই পুরোনো ক্ষত, পুরোনো গৌরব এবং নতুন স্বপ্ন আবারও ফিরে আসে। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়, ১৯৯৪ ও ২০০২ সালে ব্রাজিলের সাফল্য এবং ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জয় এই সমর্থনকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বিশ্বকাপের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিশাল পতাকা টানানো, বাড়ির ছাদ রঙ করা কিংবা সমর্থকদের মিছিল এখন এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সিআর সেভেন রোনালদোর কারণে বেশ ভালো সংখ্যক সমর্থক রয়েছে পর্তুগালের। তাছাড়াও স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ও নেদারল্যান্ডসেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সমর্থক রয়েছে, তবুও জনপ্রিয়তার বিচারে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল এখনও বাংলাদেশের ফুটবল আবেগের প্রধান দুই কেন্দ্রবিন্দু।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ তাই বাংলাদেশের কোটি দর্শকের কাছেও কেবল একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নয়, এটি হবে আবেগ, প্রত্যাশা এবং দীর্ঘদিনের সমর্থনের নতুন পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করবে। ফলে প্রতিযোগিতার কাঠামো যেমন বদলেছে, তেমনি বেড়েছে অনিশ্চয়তাও।
বিশ্বকাপ শুরুর আগেই প্রশ্নটি এখন বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে—কে হবে ২০২৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন?
একজন পরিসংখ্যানবিদ হিসেবে আমি জানি, ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে সর্বোচ্চ সম্ভাবনাসম্পন্ন দলও বহুবার ব্যর্থ হয়েছে। আবার অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তাই ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় আবেগ নয়, বরং তথ্য, পরিসংখ্যান, দলীয় ভারসাম্য, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, খেলোয়াড়দের নানা বিষয় যেমন মনোসংযোগ, মানসিকতা, আত্মবিশ্বাস; এছাড়াও ড্র, ইনজুরি পরিস্থিতি, স্থান, আবহাওয়া, মাঠের সমর্থক গোষ্ঠী, খেলার নতুন নতুন নিয়ম এবং টুর্নামেন্ট কাঠামো- সব কিছু বিবেচনায় নিতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে কোটি মানুষের আবেগ শুধু আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়—সেখানে পরিসংখ্যানের নিরপেক্ষ আলোয় বিষয়টিকে মূল্যায়ন করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে অধিকাংশ সুপার কম্পিউটার মডেল, বুকমেকার এবং বিশ্লেষণাত্মক পূর্বাভাসে স্পেনকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউরো ২০২৪ জয়ের পর তারা ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ ফুটবল খেলছে। এই মুহূর্তে সেরাদের একজন লামিন ইয়ামাল, এছাড়াও পেদ্রি, গাভি, রদ্রি, নিকো উইলিয়ামসদের নিয়ে গড়ে ওঠা দলটি তরুণ শক্তি ও অভিজ্ঞতার এক বিরল সমন্বয়।
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ। আধুনিক ফুটবলে ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারা দলগুলোই বেশি সফল হয়। স্পেন বর্তমানে সেই দিক থেকে বিশ্বের সেরা দলগুলোর একটি। তবে তাদের দুর্বলতাও আছে। রক্ষণভাগে আগের প্রজন্মের মতো বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা নেই। নকআউট পর্বে একটি ভুলই বিদায়ের কারণ হতে পারে। তবু বর্তমান তথ্য-উপাত্ত বলছে, স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা অন্য যেকোনও দলের তুলনায় সামান্য বেশি।
২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ২০২২ সালের রানার্স-আপ ফ্রান্স গত এক দশকে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল। ২০২২ সালে একাই প্রায় চ্যাম্পিয়ন করে দিয়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এছাড়াও ডুইয়ে, মাইকেল অলিসে, ডেম্বেলে, সালিবা, রায়ান চারকি, কোনাতে-প্রায় প্রতিটি পজিশনেই তাদের বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে।
ফ্রান্সের বিশেষত্ব হলো স্কোয়াড ডেপথ, তুখোড় ছন্দ, আত্মবিশ্বাস। বিশ্বকাপে যারা খেলছে এমন অনেক দেশের প্রথম একাদশ যেমন শক্তিশালী, ফ্রান্সের দ্বিতীয় একাদশও তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইনজুরি মোকাবিলা করার ক্ষমতা। দীর্ঘ টুর্নামেন্টে ইনজুরি অবশ্যম্ভাবী। এদিক থেকে ফ্রান্স সবচেয়ে প্রস্তুত দলগুলোর একটি। যদি এমবাপ্পে তাঁর সর্বোচ্চ ছন্দে থাকেন, অন্যরাও যদি তাদের চলমান ফর্মটাকে ধরে রাখেন তবে ফ্রান্সকে থামানো কোনও দলের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কখনোই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বলাই চলে, ২০২২ বিশ্বকাপ হাতে পাওয়া আর চলতি বিশ্বকাপটি লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় পুরো আর্জেন্টিনা টিম নির্ভার ফুটবল খেলবে। সেটাই তাদের আবারও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে| যদিও মেসির বয়স বেড়েছে, তবু মাঠে তাঁর উপস্থিতি পুরো দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি এখন আর শুধু মেসি নন। জুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, নিকোপাজ, রোমেরো, মার্টিনেজ, ডি পল সহ সবাইকে নিয়ে একটি পরিপূর্ণ দল গড়ে উঠেছে। বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা এবং চাপের মুহূর্তে স্থির থাকার মানসিকতা আর্জেন্টিনাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখে। তবে বয়স এবং ধারাবাহিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এখন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে।
বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি প্রতিবারই অন্যতম দাবিদার হিসেবে আসে। এমন কোনও বিশ্বকাপ নেই যেখানে বাংলাদেশের ফ্যানরা ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ভাবিনি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনা, এন্ড্রিক, থিয়াগো, নেইমার, ক্যাসিমরো, মারকুইনহোসদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দলটি প্রতিভায় ভরপুর।
নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটি নতুন পরিচয় খুঁজছে। যদি তিনি ইউরোপীয় শৃঙ্খলা ও ব্রাজিলীয় সৃজনশীলতার মিশ্রণ ঘটাতে পারেন, তবে ব্রাজিল আবারও বিশ্বকাপ জিততে পারে। এমন মিশ্রণ ঘটাতে পারছেন বলে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে মনে হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিলের সমস্যা ছিল নকআউট ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তার অভাব। প্রতিভা যথেষ্ট ছিল, কিন্তু ফল আসেনি।
ইংল্যান্ডের বর্তমান স্কোয়াড সম্ভবত গত বেশ কয়েক দশক এর মধ্যে সেরা। হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা, ডেকলান রাইস, ফিল ফোডেন, রাসফোর্ড, এজি, পালমার- প্রতিটি নামই অন্যতম বিশ্বমানের। তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলবো ব্যর্থতার ইতিহাস। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার দীর্ঘ রেকর্ড ইংল্যান্ডের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে প্রায় সব বিশ্বকাপেই। যদি তারা সেমিফাইনাল বা ফাইনালে পৌঁছাতে পারে এবং চাপ সামলাতে পারে, তবে ইংল্যান্ডও বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম বড় দাবিদার।
পর্তুগালের ক্ষেত্রে প্রশ্ন একটাই–ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ কি রূপকথার সমাপ্তি এনে দেবে? ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্ভবত তাঁর ষষ্ঠ এবং শেষ বিশ্বকাপ। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এত দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের ধরে রাখতে পেরেছেন। বর্তমান পর্তুগাল দল আর শুধু রোনালদোনির্ভর নয়। বরং সাম্প্রতিক সময়ের পর্তুগাল সম্ভবত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াডগুলোর একটি। ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বের্নার্দো সিলভা, রাফায়েল লিয়াও, ভিটিনিয়া, জোয়াও নেভেস, রুবেন দিয়াস, নুনো মেন্দেস, ডিয়োগো কস্তার মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নিয়মিত তারকা।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, খেলোয়াড়ের সামগ্রিক মানের বিচারে পর্তুগাল বর্তমানে স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের পরেই অবস্থান করছে। তবে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ী দলগুলোর অধিকাংশেরই বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক সাফল্যের ইতিহাস থাকে। পর্তুগাল ২০১৬ সালে ইউরো জিতলেও বিশ্বকাপে তাদের সেরা সাফল্য এখনও ১৯৬৬ সালের তৃতীয় স্থান। ২০২২ সালে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল, কিন্তু এখনও বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল বা ফাইনালে নিজেদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারেনি।
আমার মূল্যায়নে, স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে একই স্তরে না হলেও পর্তুগাল একেবারে পরের সারির দল নয়। বরং সঠিক ড্র, ইনজুরি-সংকটমুক্ত স্কোয়াড এবং নকআউট পর্বে কিছু অনুকূল পরিস্থিতি পেলে তারা সহজেই সেমিফাইনাল কিংবা ফাইনালে পৌঁছাতে পারে।
নেদারল্যান্ডস বিশ্ব ফুটবলের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। এমন খুব কম দেশ আছে যারা বিশ্বকাপ না জিতেও ফুটবল ইতিহাসে মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। টোটাল ফুটবলের জন্মদাতা এই দেশটি তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও (১৯৭৪, ১৯৭৮ এবং ২০১০) বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। ফলে অনেক ফুটবলপ্রেমী নেদারল্যান্ডসকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল ব্যর্থ দল বলেও অভিহিত করেন।
বর্তমান নেদারল্যান্ডস দলটিও যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ। অধিনায়ক ভির্জিল ভ্যান ডাইক এখনও বিশ্বের অন্যতম সেরা সেন্টার-ব্যাক। তার সঙ্গে রয়েছেন নাথান আকে, জুরিয়েন টিম্বার, ফ্রিমপং, ডামফ্রিস, ডি ইয়ং, সিমন্স, গাকপো এবং ডেপাইয়ের মতো অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা। রক্ষণভাগ, মিডফিল্ড এবং উইং আক্রমণ, প্রায় প্রতিটি বিভাগেই তাদের মানসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। তবে নেদারল্যান্ডসের প্রধান সমস্যা বড় ম্যাচে গোল করার ধারাবাহিকতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা অনেক ম্যাচে প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার পর অনেকেই জার্মানিকে আর আগের মতো ভয়ংকর শক্তি হিসেবে দেখেন না। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি বিশ্বকাপের মঞ্চে বরাবরই নিজেদের সেরাটা তুলে ধরতে অভ্যস্ত। বর্তমান জার্মানির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের তরুণ প্রজন্ম। যে দলটি বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল, ফাইনাল এবং শিরোপা জয়ের সবচেয়ে দীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে, সেই জার্মানিকে কখনোই হিসাবের বাইরে রাখা যায় না।
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ৪৮ দলের অংশগ্রহণ। অতিরিক্ত ম্যাচ, দীর্ঘ ভ্রমণ, বিভিন্ন আবহাওয়া, উচ্চতা এবং বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি-সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। মেক্সিকো সিটির উচ্চতা, যুক্তরাষ্ট্রের গরম আবহাওয়া এবং কানাডার তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ একই টুর্নামেন্টে দেখা যাবে।
ফলে শুধু ভালো দল হলেই হবে না— ফিটনেস, স্কোয়াড গভীরতা এবং অভিযোজন ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি আমাকে বর্তমান তথ্য, দলীয় শক্তি, সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, খেলোয়াড়দের মান, ড্র এবং টুর্নামেন্ট কাঠামো বিবেচনায় একটি সম্ভাব্যতা-ভিত্তিক তালিকা তৈরি করতে বলা হয়, তবে আমি এই সাতটি দলের কথাই বলবো। ফ্রান্স (সম্ভাবনা ১৮ শতাংশ), স্পেন (সম্ভাবনা ১৬ শতাংশ), আর্জেন্টিনা (সম্ভাবনা ১৩ শতাংশ), ব্রাজিল (সম্ভাবনা ১১ শতাংশ), ইংল্যান্ড (সম্ভাবনা ১১ শতাংশ), পর্তুগাল (সম্ভাবনা ৮ শতাংশ, নেদারল্যান্ডস (সম্ভাবনা ৬ শতাংশ)— এদের মধ্য থেকে যেকোনও একটি দল এবারের বিশ্বকাপের মুকুট পরবে, এটা বলাই যায়।
একটি বিষয় নিয়ে কাউকেও কখনও আলোচনা করতে দেখিনি। যেকোনও বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেই, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর বিদ্যমান ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে দেশগুলোর বিশ্বকাপ জয়ের ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব বিস্তার করে অর্থাৎ কতটা সহ-সম্পর্কিত বা সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা সম্ভাবনার বণ্টনটা কেমন? কাউকেও আলোচনা করতে দেখিনি র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে থাকলেই বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা কতটুকু?
এ নিয়ে আমার স্টাডি বলছে, প্রথম দুটি বাদে সর্বশেষ ১৮টি বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর বিশ্বকাপ শুরুর আগের ফিফা র্যাঙ্কিং বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট— বিশ্বকাপে সফলতার মুকুট সাধারণত ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচ দলের মাথাতেই ওঠে। বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচ দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মোট সম্ভাবনা ৮৩.৩৩ শতাংশ (সর্বশেষ ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৫টিতে এমন ঘটেছে)।
র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৭ দলের মোট সম্ভাবনা ৮৮.৮৮ শতাংশ (সর্বশেষ ১৮টি বিশ্বকাপের মধ্যে ১৬টিতে এমন ঘটেছে)। ভেঙে ভেঙে বললে, র্যাঙ্কিং প্রথম হলে দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ১১.১১ শতাংশ। র্যাঙ্কিং দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম হলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা যথাক্রমে ২৭.৮ শতাংশ, ৩৩.৩ শতাংশ—যা সর্বোচ্চ, ৫.৫ শতাংশ এবং ৫.৫ শতাংশ।
সুতরাং, ইতিহাসের শিক্ষা হলো, বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন খুঁজতে হলে প্রথমেই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচ থেকে সাতটি দেশের দিকে নজর দিতে হবে। এবারের বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন কে হতে পারে এটা খুঁজতে তাহলে নিজেরাই এবার একটু স্টাডি করুন, বের করুন এবার ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচটি অথবা সাতটি দল কারা?
খুঁজে দেখুন, আপনার প্রিয় দলটি শীর্ষ পাঁচটি দলের মধ্যে রয়েছে কিনা? শীর্ষ পাঁচটি দলের বাইরে থাকলে সব দল মিলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১৭ শতাংশ। আর র্যাঙ্কিং ১৮-এর বেশি হলে সম্ভাবনা একেবারেই নেই বললেই চলে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। ২০০৬ সালে ইতালি বিশ্বকাপ জিতেছিল ১৩ নম্বর র্যাঙ্কে থেকে এবং ১৯৯৮ সালে স্বাগতিক ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ১৮ নম্বর র্যাঙ্কে থেকে। তবে এমন ঘটনা খুবই বিরল। এমন বিরল সম্ভাবনা বের করাও খুব কঠিন। ২০২২ সালে খুব কম মানুষ মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠার কথা ভেবেছিল।
২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়া ফাইনাল খেলেছিল। ২০১৪ সালে কোস্টারিকা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। এটাই ফুটবলের সৌন্দর্য। বিশ্বকাপ কখনও শুধু সেরা দলের গল্প কিংবা ম্যাজিক নয়। এটি প্রস্তুতি, ভাগ্য, সাহস, নেতৃত্ব, কৌশল এবং সঠিক সময়ে সেরা পারফরম্যান্স দেওয়ার গল্প। আজকের দিনে ফ্রান্সকে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার মনে হলেও স্পেন, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগাল, যেকোনও একটি দলও বিশ্বকাপের মুকুট জিততে পারে।
ফুটবল ইতিহাস আমাদের এটাও শিখিয়েছে যে কখনও কখনও সবচেয়ে বড় গল্পটি লেখে সেই দল, যাদের কেউ হিসাবের মধ্যে রাখেনি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক এবং অনিশ্চিত বিশ্বকাপগুলোর একটি। এর মাধ্যমেই আবারও প্রমাণিত হবে “ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।’’
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়