ঠিক পাঁচ মাস আগে, ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারের সকালে বাংলাদেশ থেকে আসা নির্বাচনি ফলাফলের খবর ভারতকে যেমন মোটের ওপর স্বস্তি দিয়েছিল, তেমনই তার সঙ্গে মিশে ছিল কিছুটা অস্বস্তির কাঁটাও।
স্বস্তির কারণ, দীর্ঘ দেড় বছরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সেদিন বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি—যা সে দেশে স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরাবে বলে ভারত আশা করেছিল। ফলে ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে টুইটারে ও ফোন করে অভিনন্দন জানাতেও এতটুকু দেরি করেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
কিন্তু ভারতের ইনটেলিজেন্স অ্যাপারেটাস রীতিমতো উদ্বেগের সঙ্গে এটাও লক্ষ করেছিল যে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অসম্ভব ভালো ফল করেছে জামায়াতে ইসলামী। বস্তুত তাদের জেতা ৬৮টি আসনের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছিল ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে।
খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ময়মনসিংহ প্রভৃতি এলাকায় জামায়াতের ভালো প্রভাব রয়েছে—এটা জানা থাকলেও তারা যে সেখানে এত আসন জিততে পারে, সত্যি কথা বলতে ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তা ধারণা করতে পারেননি। বাংলাদেশে জামায়াতকে যেহেতু ভারত এখনও অঘোষিত ‘রেড লাইন’ হিসেবে গণ্য করে—তাই এই ডেভেলপমেন্ট তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল অবধারিতভাবেই।
বাংলাদেশের নির্বাচনি ফলাফলের মানচিত্র দেখলেও বোঝা যাবে যে বিশেষত দেশের পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত এলাকাজুড়ে শুধু জামায়াতেরই রমরমা– প্রায় পুরো এলাকাটা সেখানে সবুজে সবুজ।
যেমন- আসাম ও মেঘালয় লাগোয়া কুড়িগ্রাম জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিই জিতেছিল জামায়াত– বাকি আসনটি গিয়েছিল তাদেরই জোটসঙ্গী এনসিপির ঝুলিতে। গাইবান্ধায় ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিই জেতে জামায়াত, একটিতে বিএনপি জয় পায় খুব কম ব্যবধানে। সাতক্ষীরায় তারা চারটি আসনের সবগুলোতেই জিতেছে, কুষ্টিয়ায় পেয়েছে চারটির মধ্যে তিনটি।
বস্তুত, খুলনা বিভাগের মোট ৩৬টি আসনের ২৫টিই গেছে জামায়াতের দখলে, তাদের ভোট শেয়ার সেখানে ছিল ৪৮.২৬ শতাংশ। রংপুর বিভাগে ৩৩টির মধ্যে ১৬টি, আর রাজশাহীতে ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসন জিতেছে তারা—দুটি ডিভিশনেই তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যভাবে বললে, ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এখন জামায়াতের ৫০ জনেরও বেশি এমপি আছেন–স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে যা এর আগে কখনও ছিল না।
এখন প্রশ্ন হলো, জামায়াতের এই চমকপ্রদ নির্বাচনি ফলাফলের বেশ কয়েক মাস পরে এসে ভারত কীভাবে সেই পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করছে? এবং তা ‘অ্যাড্রেস’ করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি উচ্চপদস্থ সূত্রের কথায়, “সীমান্তের অন্য পারে জামায়াতের জনা-পঞ্চাশেক এমপি এলেন বলেই রাতারাতি সব কিছু পাল্টে গেল, ব্যাপারটা অবশ্যই সেরকম নয়। কিন্তু আমাদের সীমান্তের দিকে যে এখন অনেক বেশি সতর্ক নজর রাখতে হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।”
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ওই কর্মকর্তা বলছিলেন, ভারতের আশঙ্কাটা যে ঠিক সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে, তা নয়। কিন্তু জামায়াতের পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতার কথা সুবিদিত– আর আইএসআই যে বাংলাদেশে তাদের হারানো জমি ফিরে পেতে মরিয়া, তাতেও কোনও সন্দেহ নেই।
‘এখন ধরুন, সীমান্ত অঞ্চলে আইএসআই কোনও ঘাঁটি তৈরি করে ভারতে নাশকতার ছক করতে চাইছে বা কোনও এজেন্টকে সেখানে পাঠিয়ে তাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে তুলতে চাইছে। এখন সেই এলাকার এমপি যদি জামায়াতের হন, তাহলে এমনটা মনে করার কারণ থাকতে পারে— স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসন হয়তো সেই তৎপরতার ব্যাপারে চোখ বুজে থাকবে। ভারতের উদ্বেগের জায়গাটা ঠিক সেখানেই’, বলছিলেন তিনি।
ঠিক সে কারণেই গত কয়েক মাসে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত নজরদারি অনেক কঠোর করেছে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য নেটওয়ার্ক আরও অনেক মজবুত করেছে। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পাশাপাশি বিএসএফের গোয়েন্দা বিভাগের সক্রিয়তাও অনেক বেড়েছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ১৩ ফেব্রুয়ারি (যে দিন বাংলাদেশ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়) বিকালেই ভারতের শাসক দল বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখা তাদের এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের সাফল্যকে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের জন্য এক সতর্কবার্তা (‘ওয়েক আপ কল’) বলে বর্ণনা করেছিল।
তাদের যুক্তি ছিল, ‘পশ্চিমবঙ্গ এই ঘটনাকে উপেক্ষা করতে পারে না, করা উচিতও নয়। প্রতিবেশী দেশের নির্বাচনি ফলাফল অনেক সময়ই সীমান্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে – বিশেষত যদি ওই অঞ্চলের আদর্শগত কনসলিডেশন ও র্যাডিকালাইজেশনের সম্ভাবনা যদি মাথায় রাখা হয়।’ তারা ওই পরিস্থিতির জন্য রাজ্যে তদানীন্তন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকেও দায়ী করে বলেছিল, তারাই বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশে মদত দিচ্ছে।
এরপর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার যে সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখছে, সেটাও বলার অপেক্ষা রাখে না। বিজেপি সরকার তাদের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই বিএসএফের হাতে সীমান্ত এলাকার জমি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর ক্ষেত্রে যেখানে যত ফাঁকফোকর আছে, সেগুলো ভরাট করা যায়। অবৈধ বাংলাদেশি সন্দেহে ডিপোর্ট করাও শুরু হয়েছে।
এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাংলাদেশের দিকে সীমান্ত অঞ্চলে জামায়াতের শক্তিবৃদ্ধির যে ‘সরাসরি সম্পর্ক’ আছে, তা রাজ্যের বিজেপি নেতারা একান্ত আলোচনায় মেনেও নিচ্ছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক জিওসি-ইন-সি লে. জেনারেল রানা প্রতাপ কলিতা আবার বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন। তার যুক্তি হলো, জামায়াত যে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভালো ফল করেছে, তার একটা বড় কারণ হলো—তারা সেখানে ‘স্থানীয় মানুষের মধ্যে ভারত-বিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দিতে পেরেছে’। ভারত যেভাবে সেখানে ‘বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’ করে থাকে– কাঁটাতারের বেড়া বসানো, সীমান্তে গুলি চালানো, গরু পাচারকারী বা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় ইত্যাদি– এগুলো নিয়ে বাংলাদেশের দিকে স্থানীয় মানুষের মনে একটা ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরেই আছে। জামায়াত সেটা সফলভাবে ভোটের বাক্সে কাজে লাগিয়েছে বলে লে. জেনারেল কলিতা মনে করেন।
তার ধারণা, ‘পরিস্থিতি হয়তো এত তাড়াতাড়ি অস্থিতিশীল হবে না, কিন্তু সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে যদি উগ্র ধর্মীয় মতবাদের কোনও ফুটপ্রিন্ট দেখা যায়– তাহলে মৌলবাদী শক্তিগুলো তার ফায়দা নেবেই। হয়তো সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ভারতের দিকে আসার প্রবণতাও বাড়বে।’
ফলে ভারতকে আসলে এই দিকগুলোতেই বেশি নজর রাখতে হবে বলে এদেশে বহু নিরাপত্তা বিশ্লেষকের অভিমত। বাংলাদেশের হিন্দুরা তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে এখনও ভারতের দিকে আসুক, এটা দিল্লি এখন আর মোটেই চায় না– ফলে জামায়াতের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ার কারণে সীমান্তবর্তী জেলার হিন্দুদের ‘এক্সোডাস’ যাতে না শুরু হয়, ভারতকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে বলেও তারা মনে করছেন।
ভারতে স্পেশাল সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের (এসএসবি) সাবেক বিশেষ অধিকর্তা জ্যোতির্ময় চক্রবর্তী আবার বিশ্বাস করেন, আগামী ১০ থেকে ২০ বছর অন্তত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই মন দেবে– তাদের ভারতের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার কোনও অবকাশ থাকবে না। ‘মনে রাখতে হবে, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদের রাজনীতি একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে। এখন রেকর্ড সংখ্যক এমপি নিয়ে তারা পায়ের তলার জমি এতটাই শক্ত করতে চাইবে, যাতে ভবিষ্যতেও কেউ তাদের নিষিদ্ধ করার কথা কল্পনাও না করতে পারে’, বলছিলেন মি. চক্রবর্তী।
তিনি আরও বলছেন, ‘কিন্তু ভারতের জন্য মুশকিলটা অন্য জায়গায়– জামায়াত নিজেরা কিছু না করলেও তাদের প্রচ্ছন্ন সমর্থনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সীমান্তে শেকড় ছড়াতে পারে। আর এই আইএসআই বা তার সহযোগীদের মাধ্যমে ভারতে জাল নোটের ব্যবসা ছড়াতে পারে, মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়ায় ওয়াহাবি ভাবধারার মসজিদ গড়ার জন্য টাকা বিলানো হতে পারে, জিহাদি ও মৌলবাদী ভাবধারার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা হতে পারে– সত্যিকারের দুশ্চিন্তার কারণ বলতে ভারতের জন্য এগুলোই।









