বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি, প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের সম্পর্ক কেবল দুটি ভিন্ন দেশের নাগরিকের আইনি সম্পর্ক নয়; এটি মূলত রক্ত, আত্মীয়তা, সংস্কৃতি এবং অভিন্ন ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের রূপরেখা তৈরি হয়েছে। রেডক্লিফ লাইনের খামখেয়ালি টানে রাতারাতি একই পরিবারের এক অংশ ভারতে এবং অন্য অংশ বাংলাদেশে পড়ে যায়।
সীমান্তের দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে আজও বৈবাহিক এবং পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। দেখা যায়, একজনের ফুফু বা খালা থাকেন ওপারে, তো অন্যজনের মামাবাড়ি এপারে। বহু জায়গায় দেখা গেছে, জিরো লাইনের একদম কাছাকাছি থাকা মসজিদ, মন্দির বা গির্জাগুলো দুই দেশের নাগরিকরাই মিলেমিশে ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে জুমার নামাজ, বার্ষিক ওরস বা কোনও ধর্মীয় উৎসবে কাঁটাতারের কড়াকড়ি না থাকায় মানুষ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারতো। একে বলা হতো একটি ‘তুচ্ছ সীমান্ত’, যেখানে আইনি কড়াকড়ির চেয়ে মানবিক সম্পর্ক ও যৌথ সংস্কৃতি বড় ছিল।
দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, ও মেঘালয়ের সংলগ্ন এলাকা) মানুষের ভাষা এক (বাংলা বা আদিবাসী ভাষা), উৎসব এক (পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, ঈদ) এবং জীবনযাত্রার ধরনও এক। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া রাজনৈতিকভাবে দুটি দেশকে আলাদা করলেও, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের দিনে এই সীমানা যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। প্রতি বছর বিশেষ কিছু উৎসবে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে অনন্য যোগাযোগ ও ভাবের আদান-প্রদান ঘটে, তা পৃথিবীর অন্য কোনও সীমান্তে খুব একটা দেখা যায় না। উৎসবের দিনগুলোতে সীমান্তের সবচেয়ে বড় লেনদেনটি হয় আবেগের। বিশেষ করে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমী, ইছামতি নদীর বুকে প্রতিমা বিসর্জন, চৈত্র সংক্রান্তি, কিংবা কোনও কোনও অঞ্চলের সীমান্ত মেলার দিনে দুই পাড়ের মানুষ কাঁটাতারের কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। দেশভাগের পর যেসব পরিবার দুই টুকরো হয়ে গেছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম বা বৃদ্ধ সদস্যরা বছরের এই একটি দিনকে বেছে নেন ওপারে থাকা ভাই, বোন বা আত্মীয়কে একনজর দেখার জন্য। বিজিবি এবং বিএসএফ-এর কড়া নজরদারির মধ্যেই উচ্চকণ্ঠে একে অপরের কুশল বিনিময় করেন তারা। বেড়ার ওপার থেকে আসা ‘কেমন আছিস?’ আর এপার থেকে ‘ভালো আছি’— এই শব্দগুলোর লেনদেনেই লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর জমে থাকা বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস। উৎসবের এই দিনগুলোতে সীমান্তের মানুষের মধ্যকার লেনদেনটি কেবল বস্তুগত পণ্যের নয়, এটি মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক পুনর্মিলন।
যাকে আমরা মনস্তাত্ত্বিক পুনর্মিলন বলছি— সেই একই সীমান্তের দিকে তাকালে যেকোনও সাধারণ নাগরিকের বুক কেঁপে উঠবে। এটি সত্যিই একটি চরম দুঃস্বপ্ন। বিগত দেড় দশকে (বিশেষ করে ২০০৫-২০১০ সালের পর থেকে) ভারতের পক্ষ থেকে সীমান্তজুড়ে ব্যাপক হারে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, ফ্লাডলাইট স্থাপন এবং বিএসএফের কঠোর নজরদারি এই চিত্রটিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
যেখানে মানুষ কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে একটু ছোঁয়া বা কথা বলার জন্য ব্যাকুল থাকে, সেখানে সাম্প্রতিক সময়ে (বিশেষ করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে) পুশইনের নিষ্ঠুর প্রচেষ্টা, কাঁটাতারের শূন্যরেখায় শিশু ও নারীদের খোলা আকাশের নিচে দিনভর আটকে থাকা এবং বিএসএফ-এর গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা— সেই মানবিক আবেগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। দুই পারের মানুষই যখন বুঝতে পারে যে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং নাড়ির টান এক, ঠিক তখনই রাষ্ট্রীয় নীতি ও ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’-এর মতো রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো তাদের মনে করিয়ে দেয় যে— আইনি মারপ্যাঁচে তারা কতটা অসহায়। উৎসবের সেই মিলনমেলা তখন কেবলই একটি ক্ষণস্থায়ী মরীচিকা মনে হয়, আর স্থায়ী রূপ নেয় সীমান্তের আতঙ্ক। যে সীমান্ত হওয়ার কথা ছিল দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংস্কৃতির সেতু, সাম্প্রতিক সংঘাত ও জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার ঘটনার কারণে তা রূপ নিয়েছে এক আতঙ্কের জনপদে। সাধারণ নাগরিকরা যখন দেখেন যে, উৎসবের আনন্দ নিমেষেই বর্ডার গার্ডদের কঠোর অবস্থান এবং রাজনৈতিক উত্তেজনায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, তখন গভীর মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধনের বিপরীতে এক ধরনের স্থায়ী ট্রমা বা দুঃস্বপ্নই তাদের গ্রাস করে।
কোনও প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই রাতের আঁধারে গোপনে সম্পন্ন হওয়ায় পুশইনের নিখুঁত বা স্থায়ী তালিকা তৈরি করা বেশ দুরূহ। তবে ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই প্রবণতা কিছুটা ধীরগতির ছিল। পরবর্তীকালে, ২০১৭ সালের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে এই প্রক্রিয়া তীব্র আকার ধারণ করে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিএসএফ সদর দফতরের দাফতরিক তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সীমান্ত পারাপারকালে ৯,৬১২ জনকে আটক করা হয়। যদিও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, এই সরকারি হিসাবের বাইরেও বিপুল সংখ্যক মানুষকে গোপনে সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে। দেশীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগৃহীত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওই চার বছরে প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১২ হাজারেরও বেশি মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
কিন্ত গবেষক হিসেবে আমরা যারা সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ঘটনাগুলো নজর রাখছি, তারা দেখতে পাচ্ছি, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন (মানুষ ঠেলে পাঠানো) চেষ্টার ঘটনায় কিছু কাঠামোগত, রাজনৈতিক এবং মাত্রাগত তফাৎ দেখা গেছে। প্রথমত, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে পুশইনের ঘটনাগুলো ব্যাপকভাবে সামনে আসে। বিজিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রায় ২,৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছিল। ওই সময়ে মূলত বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ছোট-বড় দলে ভাগ করে পুশইন করা হতো।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে এসে এই পুশইনের প্রচেষ্টা নতুন করে অত্যন্ত তীব্র আকার ধারণ করে। জুন মাসের প্রথমার্ধেই বিজিবি অন্তত ২১টি বড় ধরনের পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করে। এই দফায় শিশু, নারী ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ শত শত মানুষকে একযোগে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৫ সালের এই সময়ে পুশইনের ঘটনাগুলোর পেছনে রাজনৈতিক কোনও প্রকাশ্য এজেন্ডার চেয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ আইনি কড়াকড়ি এবং স্থানীয় স্তরের বিএসএফ-এর অতি-তৎপরতা বেশি দায়ী ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের পুশইনগুলোর পেছনে স্পষ্ট রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় রাজ্য সরকারের তথাকথিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির কঠোর প্রয়োগ শুরু হয়। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক হাজার ‘অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর প্রকাশ্য দাবি— এই বছরের পুশইন প্রক্রিয়াকে তীব্র রাজনৈতিক রূপ দেয়। তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের মে মাসের পুশইনগুলোতে দেখা গেছে, ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ ছিল রোহিঙ্গা (যার মধ্যে ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনে নিবন্ধিত ব্যক্তিও ছিল)।
এ ছাড়া আধার কার্ড থাকা কিছু ব্যক্তিকেও বিএসএফ তাদের কার্ড রেখে পুশইন করেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের জুন মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ -এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার বিএসএফ যাদের জোরপূর্বক পুশইন করার চেষ্টা করছে, তাদের প্রায় সবাই পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিম। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই তাদের সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চতুর্থ, ২০২৫ সালে ভারতের সুন্দরবন সংলগ্ন সমুদ্রসীমা বা দুর্গম সীমান্ত দিয়ে কিংবা রাতের অন্ধকারে সাধারণ মানুষকে পুশইন করার ঘটনা বেশি ঘটেছিল। অনেককে কোস্ট গার্ড বা বিজিবি পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করে, অবাক করা বিষয় হল, ২০২৬ সালের মে-জুন মাসে পুশইনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তে নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়। বিএসএফ জোর করে পুশইন করার চেষ্টা করলে বিজিবি কঠোর অবস্থান নিয়ে তা প্রতিহত করে। ফলে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় বা ঝিনাইদহ সীমান্তের শূন্যরেখায় শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ বহু মানুষ খোলা আকাশের নিচে টানা ৪৮ থেকে ৭৫ ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকেন। প্রতিবাদের দিকে নজর দিলে, সর্বশেষে আমরা দেখতে পাবো, বাংলাদেশ মূলত কূটনৈতিকভাবে বিএসএফ-এর কাছে কড়া প্রতিবাদ লিপি পাঠিয়ে এবং পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে এই সংকটের সুরাহা করার চেষ্টা করেছিল এবং ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষায় আরও কঠোর ও কৌশলগত অবস্থান নেয়। বিজিবি সীমান্তে তাদের টহল জোরদার করার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো স্থানীয় গ্রামবাসীদের নিয়ে পাহারাদার দল গঠন করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের মতো সংবেদনশীল সীমান্তগুলোতে বিজিবির সহায়তায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা স্বেচ্ছাসেবকরা পাহারা দেওয়া শুরু করে, যা ২০২৫ সালে দেখা যায়নি।
সংবেদনশীল সীমান্তগুলোতে বিজিবির সহায়তায় গ্রামবাসীর পাহারাদারী প্রেক্ষাপটে প্রথাগত সামরিক বিশেষজ্ঞরা, সামরিকমনন নাগরিকরা ও বুদ্ধিজীবী সমাজ প্রস্তাবনা করছেন— এই জটিল ও বহুমাত্রিক সংকট মোকাবিলায় কেবল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর প্রথাগত নজরদারির ওপর নির্ভর করা আর বাস্তবসম্মত নয়। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সীমান্ত সুরক্ষায় নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে একটি বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবনাটি হলো—ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী সক্ষম যুবক-যুবতীদের জন্য বাধ্যতামূলক ৬ মাসের একটি ‘জাতীয় সেবা’ কর্মসূচি চালু করা, যা প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হতে পারে। ১৯৬৭ সালে সিঙ্গাপুরের প্রবর্তিত সফল ন্যাশনাল সার্ভিসের মডেলে এই জনশক্তি গড়ে তোলা হবে। তবে এই সামরিক চিন্তাবিদদের সাফ কথা— এটি সীমান্তের কোনও ‘সামরিকীকরণ’ নয়! স্থানীয় মানুষ নাকি নিজ এলাকার অলিগলি আর ভূখণ্ড সবচেয়ে ভালো চেনে, তাই তাদের এই ভৌগোলিক ও মনস্তাত্ত্বিক সুবিধাকে ব্যবহার করাই নাকি আসল উদ্দেশ্য। কী হাস্যকর যুক্তি!
সামরিকমনন নাগরিকরা ও বুদ্ধিজীবী এবং সামরিক বিশেষজ্ঞরা যখন সীমান্তে কাঁটাতার, ড্রোন, থার্মাল ক্যামেরা আর অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনকে ‘সামরিকীকরণ’ না বলে ‘স্থানীয় মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগানো’ বা ‘কমিউনিটি-বেসড সিকিউরিটি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করেন, তখন আসলে তারা বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেন। সামরিক বিশেষজ্ঞরা ও বুদ্ধিজীবীরা যেটিকে ‘স্থানীয় মানুষের সুবিধাকে কাজে লাগানো’ বলছেন, বাস্তব ক্ষেত্রে তা প্রায়শই স্থানীয় জনগণকে নিরাপত্তা বাহিনীর তথ্যের উৎস বা নজরদারির পুতুলে পরিণত করার একটি কৌশল। স্থানীয় মানুষের ভূখণ্ডের জ্ঞানকে তাদের নিজেদের কল্যাণে বা সীমান্ত অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যবহার করা হয় না; বরং ব্যবহার করা হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জালকে আরও শক্ত করতে। অন্যদিকে, যে সীমান্তে মানুষ ১৫ বছর আগেও এক উপাসনালয়ে নামাজ বা প্রার্থনা করতো, সেখানে এখন স্থানীয় মানুষকে বোঝানো হয় যে, ওপারের মানুষটি তাদের আত্মীয় বা প্রতিবেশী নয়, বরং এক ধরনের ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’। স্থানীয় মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগানোর অর্থ হলো— তাদের মনের ভেতর রাষ্ট্রীয় ভীতি ও জাতীয়তাবাদের এমন এক দেয়াল তুলে দেওয়া, যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের সীমান্তকে পাহারা দিতে শুরু করে এবং কাঁটাতারকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়।
সীমান্তে যখন নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিক বা কিশোরীকে গুলি করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়, তখন এই
সামরিক বিশেষজ্ঞরা, সামরিকমনন নাগরিকরা ও বুদ্ধিজীবীরাই আইনি ও কৌশলগত তত্ত্ব হাজির করে প্রমাণ করতে চান যে— এটি কোনও আগ্রাসন নয়, বরং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ‘অনিবার্য কৌশল’। ভাষা যখন বাস্তবতার বীভৎসতাকে আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়, তখন তা আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে স্মৃতি বিলোপের এবং নিপীড়নের প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। সবচেয়ে বড় কৌতুক হলো, যে স্থানীয় মানুষের ‘সুবিধার’ কথা বলা হচ্ছে, সেই মানুষের কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই কিংবা এজেন্সি নেই। তাদের ফসলি জমি কাঁটাতারের ওপারে পড়ে থাকে, সন্ধ্যা হলে তারা নিজেদের এলাকায় বন্দি হয়ে যায়, অথচ কাগজের প্রতিবেদনে দেখানো হয় যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন কত ‘স্মার্ট’ এবং ‘জনবান্ধব’! রাষ্ট্র যখন তার কঠোর ও সহিংস পদক্ষেপগুলোকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়, তখন এই ধরনের ‘সামরিকমনন বুদ্ধিজীবীদের’ই প্রয়োজন হয়— যারা বন্দুকের নল আর কাঁটাতারের বেড়াকে ‘উন্নয়ন ও সুরক্ষার রোমান্টিক মোড়কে’ সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করেন।
সামরিকমনন নাগরিকরা ও বুদ্ধিজীবীকূল ভুলে যান, বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতের মতো বিশাল প্রতিবেশী রয়েছে, যেখানে প্রায়ই সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বেসামরিক যুবকদের আধা-সামরিক বা নজরদারি প্রশিক্ষণের আওতায় আনলে, প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (যেমন- বিএসএফ) এই সাধারণ নাগরিকদের ‘সশস্ত্র বা ছদ্ম-যোদ্ধা’ হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে, যা সীমান্ত হত্যা বা উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে বহু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। রাষ্ট্রের মূলধারার জাতীয়তাবাদী নিরাপত্তা এজেন্ডা যখন তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে, তখন তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন এবং আন্তঃসীমান্ত পারিবারিক/সাংস্কৃতিক যোগাযোগ (যা জাতিগতভাবে সীমান্তের দুই পারেই বিস্তৃত) মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এটি তাদের রাষ্ট্রের মূল সমাজ থেকে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে, শুধু তাই নয়; মিয়ানমার সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মি কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই সুসংহত গণহত্যার পরোক্ষ অংশীদার বা ভাগীদার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও তার নাগরিক সমাজ— যা ১৯৭১ সালের নিজস্ব গণহত্যার ঐতিহাসিক যাতনার মধ্য দিয়ে গঠিত একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম এক নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট।
সামরিকমনন বুদ্ধিজীবীকূল ও নাগরিকদের সন্তুষ্ট করতে এবং বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে নতুন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নিয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তের পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নতুন অবকাঠামোগত ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ হয়তো টেবিলের নকশায় বা সামরিক মনস্তত্ত্বের ফাইলপত্রে খুব নিখুঁত ও ‘সম্পূর্ণ সুরক্ষিত’ মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার জমিনে এর মানবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য অপরিসীম।
বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন অবকাঠামোগত ও কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের এই উদ্যোগ প্রথাগত নিরাপত্তা ও সামরিকমননসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীকূলকে সাময়িকভাবে সন্তুষ্ট করলেও, এর গভীরে বেশ কিছু মারাত্মক মানবিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপদ লুকিয়ে রয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষায় কাঁটাতারের বেড়া এবং নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার সাময়িক স্বস্তি দিলেও এর সামাজিক ও মানবিক পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই সার্বক্ষণিক নজরদারি ও কাঁটাতারের ভৌত দেয়াল সীমান্ত অঞ্চলকে একটি উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত করবে, যা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব ধ্বংস করে পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেবে। তাছাড়া, শত বছরের পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ায় সীমান্তে এক চরম মানবিক সংকট তৈরি হবে। এই কঠোর পরিকাঠামোকে প্রতিবেশী দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সামরিক উস্কানি হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে, যা সীমান্ত হত্যা ও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সীমান্ত সংলগ্ন আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা; কৃত্রিম সীমানা তাদের সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন ও আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগকে ব্যাহত করে রাষ্ট্রের মূল সমাজ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। পরিবেশগতভাবে, এই বিশাল নির্মাণকাজের জন্য পাহাড় কাটা ও বন উজাড় করায় বাস্তুতন্ত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হবে এবং এশীয় হাতির মতো বন্যপ্রাণীর চিরাচরিত পরিভ্রমণ পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। সর্বোপরি, এই প্রকল্পটির পেছনে বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় একটি বড় অপচয়। সীমান্তবাসীকে টেকসই অর্থনৈতিক সুযোগ ও শিক্ষার মাধ্যমে ‘অধিকার সচেতন নাগরিক’ হিসেবে গড়ে না তুলে, কেবল ‘রাষ্ট্রের হাতিয়ার’ বানিয়ে লোহার দেয়াল তুললে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। সীমান্তকে নিরাপদ করার টেকসই উপায় হলো— সীমান্ত অঞ্চলের মানুষকে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ কিংবা কাঁটাতারের ভৌত দেয়াল দেওয়া নয়; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনি সুরক্ষা এবং বৈধ অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করা।
সীমান্তবাসীকে ‘রাষ্ট্রের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার না করে যতক্ষণ না পর্যন্ত ‘অধিকার সচেতন নাগরিক’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে, ততক্ষণ সীমান্ত অঞ্চলের স্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। একইসাথে নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্মরণ রাখা ভালো, ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলো যেভাবে কাঁটাতারের বেড়া, ওয়াচ টাওয়ার এবং বিএসএফের ক্যাম্পের মাধ্যমে ‘বারাক বা সামরিক দুর্গে’ পরিণত হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকরা সীমান্তকে সেভাবে দেখতে অভ্যস্ত নয়। বাংলাদেশিরা সীমান্তকে দেখে একটি সচল অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঞ্চল হিসেবে। কিন্তু ভারতের তরফ থেকে বারবার পুশইনের ধাক্কা আসার কারণে বাংলাদেশের সীমানাকেও দিন দিন কড়া সামরিক নজরদারির আওতায় নিয়ে আসতে হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতিকেও কিছুটা প্রভাবিত করছে।
সর্বশেষ, বাংলাদেশের মূল কৌশল হওয়া উচিত সীমান্ত সংকটকে কেবল দ্বিপাক্ষিক আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা হিসেবে না দেখে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় একে একটি ‘বৈশ্বিক মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আন্তর্জাতিকীকরণ করা। তথ্য-প্রমাণসহ বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারলে প্রতিবেশীদের জন্য একতরফা পুশ-ইন করা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। যেহেতু বাংলাদেশ নিজে রিফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন নাই, কিন্তু প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী
‘নন-রিফোলমেন্ট’ (নিপীড়িত মানুষকে জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর নীতি) একটি সর্বজনীন প্রথাগত আইন। প্রথম কাজ বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিশ্বমঞ্চে জোরালো যুক্তি দিতে পারে যে, প্রতিবেশী দেশগুলো একতরফা পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাক করে মূলত বৈশ্বিক নিয়মই লঙ্ঘন করছে। দ্বিতীয়ত,
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা এবং জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা— এর কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তায় সীমান্তে একটি সাময়িক মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। সেখানে আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে পুশ-ইনের শিকার ব্যক্তিদের সঠিক পরিচয়, অধিকার ও নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হবে, যেন কোনো প্রতিবেশী দেশ একতরফাভাবে বাংলাদেশের ওপর অবৈধ দায় চাপাতে না পারে। সবচেয়ে কার্যকর হবেজাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ মিশন আহ্বান; সীমান্তে পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাকের সময় প্রায়শই নির্যাতন ও পরিবার বিচ্ছিন্নকরণের মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে বিশেষ তদন্ত দল পাঠানোর আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে পারে। এই নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন দোষী রাষ্ট্রের ওপর তীব্র নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী