গণঅভ্যুত্থান, ক্ষমতার রূপান্তর এবং বন্ধুত্বের রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ

একটি সুদীর্ঘ স্বৈরাচারী, নিশ্ছিদ্র কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন যখন রাজপথের তীব্র ও স্বতঃস্ফূর্ত গণজোয়ারের মুখে ঘটে, তখন ইতিহাসের এক অনন্য, সন্ধিক্ষণমূলক এবং অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়ের সূচনা হয়। এটি এমন এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক পরিস্থিতি, যেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের—অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সামাজিক বৈপরীত্য ও পুঞ্জীভূত দ্বন্দ্বগুলো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে পরস্পরকে ছেদ করে। এই ছেদবিন্দুর তীব্রতায় স্থবির হয়ে থাকা ইতিহাস হঠাৎ করেই যেন এক দীর্ঘ উল্লম্ফন দেয় এবং সামাজিক রূপান্তরের চাকা অত্যন্ত দ্রুত ঘুরতে শুরু করে।

এই রাজপথের ঘনাকৃতির মুহূর্তে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায় বৈচিত্র্যময়, সাধারণ সময়ে বিবদমান ও বিপরীতমুখী সব রাজনৈতিক শক্তি, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিল্পী এবং আপামর জনতা। শ্রেণিগত অবস্থান, আদর্শিক ভিন্নতা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস ভুলে ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষেরা একে অপরের ‘কমরেড’ বা ‘সাথী ভাই’ অনন্য সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, বুলেটের শব্দ আর টিয়ারগ্যাসের ধোঁয়ার ভেতর যে প্রগাঢ় আত্মিক বন্ধন, পারস্পরিক নির্ভরতা ও স্বতঃস্ফূর্ত সংহতি গড়ে ওঠে, তা এক প্রকার মহিমান্বিত নাগরিক রোমান্টিকতাবোধের জন্ম দেয়। এই সাময়িক বন্ধনে মনে হয়, একটি বৈষম্যহীন, অধিকার ও ইনসাফভিত্তিক নতুন সমাজ বুঝি হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

কিন্তু ইতিহাস এক অত্যন্ত নির্মম ও অমোঘ সত্যের সাক্ষ্য দেয়—রাজপথের এই রোমান্টিক সংহতি যখনই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, আমলাতান্ত্রিক আইনি সংস্কার এবং ক্ষমতার নির্মম বাস্তববাদের মুখোমুখি হয়, তখনই সেই অভেদ্য সংহতিতে ফাটল ধরতে শুরু করে। রাজপথের পবিত্র কিংবা অপরের চোখে অপবিত্র রক্তে ভেজা কমরেডশিপ এক মরীচিকায় পরিণত হয়, যখন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাত্যহিক স্বার্থ ও নীতি নির্ধারণের প্রশ্নগুলো এসে জড়ো হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯০ সালের এরশাদ-বিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান—এই দুটি ঘটনাই ক্ষমতা, ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব, মতাদর্শিক রূপান্তর এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জটিল মনস্তত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বকে বোঝার জন্য অত্যন্ত চমৎকার তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করে। সমসাময়িক রাজনৈতিক আলাপে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিংবা বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের মহলে যখন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শক্তির ফেরা না-ফেরার প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার অথবা ক্ষমার পরিধি, কিংবা বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের গতিপথ ও নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে তীব্র মেরুকৃত তর্ক উঠেছিল, তখন অবধারিতভাবেই সামনে আসে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী সংকট—আন্দোলনের সময়কার সেই নিখাদ, অকৃত্রিম বন্ধুত্বগুলো এখন কোথায়? কেন সাবেক কিংবা বর্তমান সহযোদ্ধারা আজ পরস্পরের কড়া পর্যালোচক ও সমালোচক, প্রতিদ্বন্দ্বী বা চরম শত্রুতে রূপান্তরিত হচ্ছেন?

এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো, তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বাংলাদেশের ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও তার পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরকে একটি গভীর রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ করা। রাজপথের প্রতিরোধ কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র পরিচালনার জাঁতাকলে পড়ে তার নিজস্ব বৈপ্লবিক চরিত্র হারায়, কীভাবে নতুন ক্ষমতার বিন্যাস পুরোনো আনুগত্যের সমীকরণকে ধূলিসাৎ করে দেয় এবং কীভাবে বন্ধুত্ব নিজেই একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ক্ষমতার বলির পাঁঠা হয়ে ওঠে—তা বিস্তারিত ঘটনাপ্রবাহ ও তাত্ত্বিক সংশ্লেষের মাধ্যমে এখানে বিশ্লেষণ করা হবে।

বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে প্রবেশের আগে এই আলোচনার মূল তাত্ত্বিক ভিত্তিগুলোকে ঝালিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষমতা এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক কেবল আবেগীয় নয়, তা অত্যন্ত কাঠামোগত। ফরাসি উত্তর-কাঠামোবাদী দার্শনিক জ্যাক দেরিদা তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘পলিটিক্স অব ফ্রেন্ডশিপ’-এ দেখিয়েছেন, পশ্চিমা রাষ্ট্রচিন্তা এবং গণতন্ত্রের ধ্রুপদী মডেলটি আসলে এক প্রকার ভ্রাতৃত্বমূলক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা স্বভাবগতভাবেই বর্জনমূলক। দেরিদা কার্ল শমিটের ‘বন্ধু বনাম শত্রু’ ধারণার বিনির্মাণ করে দেখান যে যেকোনও রাজনৈতিক সার্বভৌম ক্ষমতা নিজেকে সংজ্ঞায়িত ও টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময় একজন বহিরাগত শত্রুকে তৈরি করে। যখন একটি দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে, তখন বিদ্যমান স্বৈরাচারী শাসকই থাকে সেই সাধারণ ও পরম শত্রু, যার উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের ভেতরের বৈপ্লবিক ভ্রাতৃত্ববোধকে তীব্র ও আবেগময় করে তোলে। কিন্তু অভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর, যখন সেই অভিন্ন শত্রু অপসারিত হয়, তখন ক্ষমতার নতুন বিন্যাসে নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিপ্লবী গোষ্ঠী নিজেদের ভেতরেরই কোনও অংশকে ‘শত্রু’, ‘সুবিধাবাদী’ বা ‘কাউন্টার-রেভল্যুশনারি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা বারবার দেখেছি, অভ্যুত্থানের পর সেই বিপ্লবী ভ্রাতৃত্ববোধ কীভাবে দ্রুত একটি অনমনীয় ও বর্জনমূলক রাষ্ট্রীয় যন্ত্রে রূপ নেয় এবং পুরোনো বন্ধুদের ছাঁটাই করতে থাকে।

জার্মান-আমেরিকান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হানাহ আরেন্ট তাঁর ‘অন রেভল্যুশন’ গ্রন্থে যেকোনও সফল বিপ্লবের দুটি পরস্পরবিরোধী পর্যায়ের কথা বলেছেন। প্রথম পর্যায় হলো সামাজিক অভ্যুত্থান, যেখানে মানুষ গৃহকোণ থেকে বের হয়ে গণপরিসর দখল করে এবং যৌথ নাগরিক স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পায়। এখানে মানুষের সম্পর্ক কোনও আইনি চুক্তির দ্বারা নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্ত ও আত্মিকভাবে চালিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায় হলো স্থায়ী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা বা বিপ্লবকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পর্যায়। এই পর্যায়ে যখনই নতুন সংবিধান রচনা, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাত্যহিক বাস্তব প্রশ্নগুলো সামনে আসে, তখনই রাজপথের সেই অপবিত্র আবার পবিত্র সংহতি ভেঙে পড়ে, যাকে আরেন্ট বলেছেন ‘বিপ্লবের ট্র্যাজেডি’। আদর্শিক উপদলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার নির্মম হিসাব-নিকাশ সেই যৌথ স্বপ্নকে পিষে ফেলে, যেখানে রাজপথের মুক্ত নাগরিক আমলাতান্ত্রিক ফাইলের বিষয়ে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যালকম উইভারের ‘পলিটিক্যাল ফ্রেন্ডশিপ’ গ্রন্থের তাত্ত্বিক আলোকেও দেখা যায়, তীব্র আন্দোলনের সময় গড়ে ওঠা নিবিড় ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব পরবর্তীতে ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার সময় অভ্যন্তরীণ নানা সমঝোতায় লিপ্ত হয়। বিপ্লবীরা যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন, তখন তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো ক্ষমতার নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত হয়। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অনেক পুরোনো বন্ধুকে ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে ফেলতে হয়, যা এক গভীর ক্ষমতার অসমতা তৈরি করে। সমকালীন সমাজতাত্ত্বিক আন্তোনি তাতারিন ইউক্রেনের উত্তর-বিপ্লবী পরিস্থিতির আলোকে দেখিয়েছেন যে ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো মানুষের ভেতরের জৈব সামাজিক সম্পর্কগুলোকে সমতল করে দেয়। রাষ্ট্র যখন আইন ও বিধিমালার ছাঁচে আন্দোলনকে বাঁধতে চায়, তখন রাজপথের ‘বিপ্লবী ন্যায়বিচার’ আদালতের ‘আইনি সমীকরণে’ রূপান্তরিত হয়ে গতি হারায়, যা সহযোদ্ধাদের মধ্যে বিভাজন বাড়ায়। একই সাথে, নেটওয়ার্ক তাত্ত্বিক ইয়ান আলগান দেখিয়েছেন কীভাবে আঁটসাঁট সমমনা গোষ্ঠী বা ইকো-চেম্বারগুলো নিজেদের আদর্শিক পবিত্রতা কিংবা অপবিত্রতাকে রক্ষা করতে গিয়ে বাইরের যেকোনও ভিন্নমত, এমনকি আন্দোলনের সময়কার সামান্য ভিন্নমতাবলম্বী সহযোদ্ধাকেও শত্রু বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে গণ্য করে। মনে রাখা দরকার, সহযোদ্ধাদের এই শত্রুতায় রূপান্তর কোনও ব্যক্তি-মানুষের হঠাৎ চরিত্রহীন হয়ে যাওয়া বা নিছক ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা নয়—এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমোঘ ও কঠোর বাস্তবতা। রাজপথের পবিত্র আবেগ যখনই শীতল ও হিসাবভিত্তিক রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্পর্শে আসে, তখনই বন্ধুত্বের রোমান্টিক সংহতি ভেঙে গিয়ে ক্ষমতার নির্মম দ্বান্দ্বিকতা বা প্রতিযোগিতার জন্ম নেয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরের সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের ঘটনাটি ছিল এক যুগান্তকারী ও ক্লাসিক্যাল গণ-অভ্যুত্থান। দীর্ঘ নয় বছরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতিতে ১৯৮০-এর দশকজুড়ে আওয়ামী লীগের ৮-দলীয় জোট, বিএনপির ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থিদের ৫-দলীয় জোট ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বরে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ নামক এক ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করে। এটি একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল। রাজপথে তখন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রদল, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’-এর ব্যানারে এক অভিন্ন বৈপ্লবিক পরিবারে পরিণত হয়েছিল। ডা. শামসুল আলম মিলন কিংবা নূর হোসেনের রক্ত সেই ভ্রাতৃত্বকে এক পবিত্র রূপ দিয়েছিল, যা আরেন্টের ভাষায় ছিল স্বতঃস্ফূর্ত যৌথ স্বাধীনতার পরম ক্ষণ।

কিন্তু ৭ ডিসেম্বর এরশাদের পদত্যাগের পরদিন থেকেই দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হতেই আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ এসে পড়ে। একমঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচার পতনের স্লোগান দেওয়া দলগুলো রাতারাতি একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে এবং কাদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতি শুরু হয়। রাজপথের মুক্ত গণপরিসরকে গ্রাস করে নেয় প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচনি দলীয় কাঠামো। সাহাবুদ্দীন আহমদের সরকারের আমলাতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়ার কারণে রাজপথের ছাত্রদের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা প্রথম ধাক্কাটি খায়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করার পর এবং আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধী দল হলে সেই আন্দোলনের বিপ্লবী ভ্রাতৃত্ববোধ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। এরশাদ নামক অভিন্ন শত্রু বিদায় নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একে অপরকে প্রধান অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায় যে বন্ধুরা কদিন আগে এক কাপ চা ভাগ করে খেতেন, এরশাদের পুলিশের লাঠির হাত থেকে একে অপরকে বাঁচাতেন, ক্ষমতার নতুন সমীকরণে তাঁরা একে অপরের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরতে বা একে অপরকে ক্যাম্পাস থেকে সশস্ত্রভাবে বিতাড়িত করতে দ্বিধা করলেন না। তিন জোটের রূপরেখায় যে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল (যেমন- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন), তা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ধামাচাপা পড়ে যায়। ১৯৯০-এর অভ্যুত্থান পরবর্তী রূপান্তরটি তাই ছিল অত্যন্ত নির্মম; এটি রাজপথের রোমান্টিক সংহতিকে সম্পূর্ণভাবে গিলে খেয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংসদীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানটি ছিল ১৯৯০ সালের অভ্যুত্থানের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র, রক্তক্ষয়ী, গতিশীল এবং নেটওয়ার্ক-চালিত। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা নিশ্ছিদ্র শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটে এক নজিরবিহীন গণজোয়ারের মাধ্যমে, যা প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে গিয়ে এক নতুন জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের উত্থান ঘটায়।

এই আন্দোলনের প্রধান বিশেষত্ব ছিল এর অসংগঠিত, অনুভূমিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ডান-বাম-ইসলামপন্থি ও সাধারণ শিক্ষার্থী নির্বিশেষে সকলেই এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজপথের তীব্র দমনপীড়নের মুখে তরুণদের মধ্যে এক আঁটসাঁট সমমনা নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যা আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ কিংবা ওয়াসিমের মতো সহযোদ্ধাদের ত্যাগ এই তরুণদের মধ্যকার ব্যক্তিগত বন্ধনকে এক পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে রূপ দিয়েছিল। ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনার পতন ঘটে, তখন ঢাকার রাস্তায় যে আবেগময় দৃশ্য দেখা গিয়েছিল—যেখানে অপরিচিত মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল—তা ছিল আরেন্ট-বর্ণিত সেই ‘বিশুদ্ধ নাগরিক স্বাধীনতার’ কিংবা  আলথুসার-বর্ণিত ‘ঘনাকৃতির মুহূর্তের’ পরম প্রকাশ।

তবে এর পরদিনই বিপ্লবীদের মুখোমুখি হতে হয় রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও আমলাতান্ত্রিক বাস্তবতার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত হন। ঠিক এখানেই ‘সোশ্যাল আপরাইজিং টু লিগ্যাল ফর্ম’-এর সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তা ‘সংস্কার বনাম বিপ্লবের গতি’র দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। রাজপথের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ছিল আমূল ও বৈপ্লবিক, কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে বিদ্যমান সংবিধান, আইনি অধ্যাদেশ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শুরু হওয়া কিংবা বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠনের মাধ্যমে রাজপথের কাঁচা তেজ আমলাতান্ত্রিক ফাইলের নিচে ধিমে হতে শুরু করে, যা আন্দোলনের কমরেডদের শান্তিকালীন প্রতিদ্বন্দ্বীতে রূপান্তর করার প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সমসাময়িক রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এই রূপান্তরের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কয়েকটি প্রধান ডোমেইনে। প্রথমত, আন্দোলনকালে বিপরীতমুখী আদর্শের তরুণরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করলেও পতন-পরবর্তী সময়ে ‘ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কেমন হবে’, সেক্যুলার নাকি ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক—সেই প্রশ্নে গভীর ফাটল ধরেছে। ইয়ান আলগানের ইকো-চেম্বার তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি পক্ষ এখন নিজের সোশ্যাল মিডিয়া বাবলে বন্দি হয়ে অপর পক্ষকে ‘বিপ্লববিরোধী’ বা ‘সুবিধাবাদী’ আখ্যা দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের কিছু শীর্ষ নেতা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশ হওয়ায় তাঁদের সাথে রাজপথের সাধারণ বন্ধুদের গভীর ক্ষমতার অসমতা তৈরি হয়েছে। কালকের সহযোদ্ধার সাথে দেখা করতেও এখন রাষ্ট্রীয় প্রটোকল বা নিরাপত্তা বলয়ের প্রয়োজন হয়েছিল এবং এখনও হচ্ছে, যা পুরোনো বন্ধুদের রাতারাতি ক্ষুব্ধ সমালোচক বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে রূপান্তর করেছে এবং আগামীতে আরও ভয়াবহভাবে করবে।

তৃতীয়ত, ক্ষমতাচ্যুত শক্তির রাজনীতিতে ফেরা, নিষিদ্ধকরণের আইনি বিতর্ক কিংবা ফ্যাসিবাদের সহযোগীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নগুলো সার্বভৌম ক্ষমতার মূল দ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে—কারা ক্ষমতা ভোগ করবে আর কারা বর্জিত হবে। নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা চাওয়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকামী ছাত্রদের দূরত্ব বেড়েছিল, ফলে যৌথ নাগরিক ফ্রন্টটি ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছিল এবং যাচ্ছে।

চতুর্থত, রাজপথের প্রগাঢ় কমরেডশিপ যখন ক্ষমতার শীতল হিসেব-নিকেশের কাছে হেরে যায়, তখন ব্যক্তির ভেতর গভীর মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা ও অস্তিত্ববাদী হতাশার জন্ম হয়। ম্যাক্স ভেবারের ভাষায়, রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হলো আইনি-আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকতা। রাষ্ট্র রাজপথের আবেগে চলে না, সে চলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের নির্মোহ নিয়মে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার নেওয়া বন্ধুদের রাষ্ট্রযন্ত্র টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বাকি বন্ধুদের ‘উগ্র’ তবে বেশিভাগ ক্ষেত্রে বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষাকে দমন বা ত্যাগ করতে হয়, যেখানে বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় বলিদান ঘটে।

১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের তুলনা করলে দেখা যায়, উভয় আন্দোলনের মূল মনস্তাত্ত্বিক সংকট একই রকম হলেও ২০২৪ সালের সংকটটি অনেক বেশি বহুমুখী। ১৯৯০-এর পর ক্ষমতার রূপান্তরটি ছিল দ্বিদলীয় বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ, ফলে বিভাজনটি ঘটেছিল দলীয় লাইনে—ছাত্রদল আর ছাত্রলীগের বন্ধুরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে ক্ষমতার কোনও একক বা সুনির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী না থাকায় ঐতিহ্যবাহী দলসমূহ, নতুন ছাত্র নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ ক্ষমতার শূন্যতা পূরণে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ফলে এখানে বন্ধুত্ব কেবল দুটি দলের লাইনে ভাঙছে না, তা ভাঙছে একই আন্দোলনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন উপদলের মধ্যে, যা শত্রুর সংজ্ঞাকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও জটিল করে তুলছে।

জুলাই-পরবর্তী সময়ে যে বৃহৎ রাজনৈতিক ঐক্যের প্রত্যাশা ছিল, তা না টেকার পেছনে গভীর তাত্ত্বিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। সামাজিক আন্দোলন তত্ত্ব অনুযায়ী, এই আন্দোলনটি ছিল একটি কৌশলগত মোর্চা বা নেতিবাচক সংহতি, যেখানে অভিন্ন শত্রুর পতন ঘটানোর জন্য সবাই এক হয়েছিল। কিন্তু শত্রু অপসারিত হতেই পতন-পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে তিনটি ধারণার সংঘাত স্পষ্ট হয়—উদারনৈতিক সাংবিধানিকতাবাদ, তরুণদের আমূল বা ডিকলোনিয়াল রূপান্তর এবং সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। এই তিন স্রোতের মধ্যে সমন্বয়ের সাধারণ কিন্তু প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্ক না থাকায় সন্দেহ বাড়ে। একইসঙ্গে তরুণ নেতৃত্বের কারিশমেটিক ও বৈপ্লবিক কর্তৃত্বের সাথে পুরোনো দলগুলোর ঐতিহ্যগত ও আইনি-যৌক্তিক কর্তৃত্বের সংঘাত তৈরি হয়। আন্দোলনের স্মৃতির রাজনীতি বা মূল কৃতিত্ব কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—সেই মাস্টারমাইন্ড বিতর্ক কিংবা কে একদফার ঘোষক ও হেজেমনি প্রতিষ্ঠার ভয়ও রাজনৈতিক ঐক্যকে চুরমার করে দেয়।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান এবং আন্দোলন তত্ত্বের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান অতীতের যেকোনও আন্দোলনকে ছাড়িয়ে গেছে। সর্বব্যাপী সামাজিক সমবায়ের দিক থেকে ৫২-র ভাষা আন্দোলন ছিল প্রধানত সাংস্কৃতিক ও ছাত্র-কেন্দ্রিক, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল শহর ও ছাত্র-শ্রমিক কেন্দ্রিক, এবং ৯০-এর আন্দোলন ছিল মূলত দলীয় ও মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক। কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলন ছাত্রদের দিয়ে শুরু হয়ে রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক, গৃহিণী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণিকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি ‘টোটাল সোশ্যাল মোবিলিজেশন’। টানা ১৫ বছরের এক সুসংহত কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতন মাত্র কয়েক সপ্তাহে ঘটিয়ে এটি নেটওয়ার্কড সোশ্যাল মুভমেন্টের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং ১,৪০০-এর বেশি শহীদের রক্তের বিনিময়ে অপরাজেয় বৈপ্লবিক রূপ নিয়েছিল। তবে তত্ত্বগতভাবে অভ্যুত্থানের সফলতা দুটি ধাপে মাপা হয়—পুরোনো ব্যবস্থার পতন ঘটানোয় এটি শতভাগ সফল হলেও একটি নতুন, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক সফলতার মূল্যায়নে ইতিহাসবিদদের আরও সময় লাগবে।

বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানগুলোর ইতিহাস শেখায় যে স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর চেয়ে রাজপথের সংহতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের মধ্যে টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। ক্ষমতার গতিশীলতা সবসময়ই পুরোনো জোটকে ভাঙবে এবং সহযোদ্ধাদের শান্তিকালীন প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করবে। তবে দেরিদা যেভাবে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমাদের এমন এক রাজনৈতিক সমাজ গঠন করতে হবে যা কোনও বর্জনমূলক একচেটিয়া ভাই-ভাই সুলভ কাঠামোর ওপর না দাঁড়িয়ে ভিন্নমতকে ধারণ করার মতো উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক সংহতির ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকবে। বাংলাদেশ আজ যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সন্ধানে আছে, তার আসল পরীক্ষা এখানেই। রাজপথের বহুত্ববাদী সংহতিকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারলে তবেই ক্ষমতার নির্মম বাস্তববাদকে পরাস্ত করা সম্ভব।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই ছিল না, তা ছিল রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও মানুষের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কের এক জটিল রূপান্তর। রাজপথের ঘনাকৃতির মুহূর্ত যে কমরেডশিপের জন্ম দেয়, রাষ্ট্রযন্ত্রের শীতল আমলাতান্ত্রিক যৌক্তিকতার কাছে তা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৯০ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে অভিন্ন শত্রু বিদায় নিলে দ্বিদলীয় ক্ষমতার বৃত্তে পুরোনো বন্ধুরা অস্তিত্বগত শত্রুতে পরিণত হয়, আর ২০২৪ সালে দেখা যাচ্ছে কীভাবে অনুভূমিক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক থেকে উঠে আসা একটি প্রজন্ম প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জাঁতাকলে পড়ে মনস্তাত্ত্বিক সংকটে নিমজ্জিত হচ্ছে।

তবে এই বিভাজন কোনও চূড়ান্ত পরাজয় নয়, বরং এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতার এক সর্পিল ক্রান্তিকাল। হানাহ আরেন্টের ‘বিপ্লবের ট্র্যাজেডি’কে পরাস্ত করতে হলে বুঝতে হবে যে রাজপথের প্রতিরোধ আর শান্তিকালীন রাষ্ট্র পরিচালনা এক নয়। রাজপথের আবেগ যখন রাষ্ট্র সংস্কারের টেবিলে বসে, তখন তা কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে রূপান্তরিত হয়—একে ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে না দেখে ক্ষমতার কাঠামোগত বিন্যাস হিসেবে মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে কোনও একক গোষ্ঠীর একচেটিয়া সম্পত্তি না বানিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে ভিন্নমতের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও কার্যকর ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ তৈরি করতে হবে, যাতে নীতিগত সমালোচনার জন্য কাউকে ছাঁটাই না করা হয়। একই সাথে, ভার্চুয়াল জগতের ইকো-চেম্বার ছেড়ে সরাসরি মুখোমুখি বহুত্ববাদী আলাপের গণপরিসরে ফিরে আসতে হবে এবং ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের ঊর্ধ্বে উঠে এক বৈষম্যহীন সাংবিধানিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করতে হবে। রাজপথ থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের এই রূপান্তর এক নির্মম ল্যাবরেটরি, যেখানে গতকালের সহযোদ্ধারা আজ শান্তিকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন, কিন্তু মূল লক্ষ্য যদি একটি বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠন হয়, তবে এই দ্বন্দ্বই দ্বান্দ্বিক নিয়মে রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ক্ষমতার বাস্তববাদকে নাগরিক রোমান্টিকতাবোধ ও বহুত্ববাদী চেতনা দিয়ে পরিশীলিত করতে পারলে রাজপথের রক্তে ভেজা কমরেডশিপ ক্ষমতার অলিন্দে বলি না হয়ে এক টেকসই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মজবুত ভিত্তি হয়ে টিকে থাকবে।

লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী