আমাদের দেশে একটা প্রচলিত প্রবাদ আছে—‘বসন্তের কোকিল’। তবে প্রবাদটি প্রাণীবিজ্ঞানের দিক দিয়ে পুরোপুরি ঠিক হলেও, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে এতে কিঞ্চিৎ সংশোধন প্রয়োজন। বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে কোকিল নয়, আগমন ঘটে একঝাঁক ‘সব-মৌসুমের ময়না’র। এই ময়নাদের গায়ের পালক যেকোনো আবহাওয়া ও পতাকার রঙের সাথে মিল রেখে রাতারাতি গিরগিটির মতো বদলে যেতে পারে। ২০২৪ সালে স্বৈরাচার কিংবা দীর্ঘদিনের জাঁকিয়ে বসা হাসিনা সরকারের যখন পতন ঘটে, সাধারণ মানুষ যখন রাজপথে বিজয়ের স্লোগান দিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে এক কাপ গরম চায়ে চুমুক দেয়, তখন আমাদের জাতীয় বুদ্ধিজীবীদের ড্রয়িংরুমে শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুদ্ধ—‘অ্যালবামের ছবি ফিল্টারিং ও ফেসবুক স্ট্যাটাস ডিলিট অভিযান’। স্বৈরাচারের পতনের ঠিক পর মুহূর্তে মুদ্রার অপর পিঠে—অর্থাৎ যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে ছিলেন এবং তাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ বলয়ে—শুরু হয়েছিল এক আদিম ও অস্তিত্ব রক্ষার নাটক: ‘প্যাঁকিং, ব্যাকডোর এক্সিট ও ডিজিটাল ছাইচাপা অভিযান’।
তৎকালীন ‘গতকাল রাত’ পর্যন্ত যিনি টকশোতে টেবিলে চাপড় মেরে বলছিলেন, ‘‘উন্নয়ন দেখতে হলে চোখ মেলে তাকাতে হবে, গণতন্ত্র পেটে যায় না’’— পরদিন সকালে সেই একই ব্যক্তি কিউরিয়াস ব্র্যান্ডের সিল্কের পাঞ্জাবি আলমারির গোপন কুঠুরিতে চালান করে কুমিল্লার আদি খদ্দরের ফতুয়া গায়ে চড়ালেন, নাকে ঝুলিয়ে নিলেন মোটা কালো ফ্রেমের ‘বিপ্লবী চশমা’। তারপর সোশ্যাল মিডিয়ায় এক দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে জানালেন— ‘‘‘দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে আমি ভেতরে ভেতরে যে অবর্ণনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই চালিয়ে গিয়েছি, তা কেবল আমার অন্তর্যামী জানেন। আমি কখনো ওদের দেওয়া সংবর্ধনার মিষ্টির প্যাকেট ছুঁয়েও দেখেছি বলে এমন কেউ নাই যিনি বলতে পারবেন’’—যদিও তিনি ড্রাইভারকে দিয়ে আনিয়ে খেয়েছেন, সে তো নিতান্তই শর্করা নিয়ন্ত্রণের অভাবে! অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায় বুদ্ধিজীবীদের এই ভোলবদল দেখতে কোনো থিয়েটারে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; টিভির টকশোতে চোখ রাখলেই সেই সার্কাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উপদেষ্টারা শপথ গ্রহণের পরদিনই কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিকদের কিবোর্ড থেকে আগের আমলের ‘উন্নয়নের মহাসড়ক’ কিংবা ‘ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত’ স্থায়ীভাবে ডিলিট হয়ে জায়গা করে নেয় ‘প্যারাডাইম শিফট’, ‘ইনক্লুসিভ রিফর্ম’ ও ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’। সকালের নাস্তায় ডিমের অমলেটে গোলমরিচ ছিটানোর মধ্যেও ওনারা এখন গম্ভীর মুখে খুঁজে পান গভীর কোনো উত্তর-আধুনিক কাঠামোগত রূপান্তর। এতদিন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমে বসে সরকারি প্লটের কিস্তি দেওয়া স্যারেরা এখন টকশোতে উদাস মুখে দাবি করতে থাকেন যে, রাজপথে তরুণদের এই রক্তক্ষয়ী কালেক্টিভ কনশাসনেস নাকি ওনারা সেই নব্বইয়ের দশকেই পিএইচডি থিসিসে হুবহু ভবিষ্যদ্বাণী করে রেখেছিলেন।
শাহবাগ আর ধানমন্ডির অডিটোরিয়ামগুলো তখন সিভিল সোসাইটির সেমিনার-বাণিজ্যে জমজমাট। ‘পোস্ট-অথরিটারিয়ান রেজাইমে জেন-জি’র মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা’ শীর্ষক গালভরা ব্যানারের নিচে বসে স্যারেরা মাইকে হাঁক ছাড়েন, ‘আমাদের এখনই তৃণমূল কৃষকের না-বলা কথা শুনতে হবে!’ আর সে কথা বলেই উদ্বিগ্ন চোখে ঘড়ি দেখেন— কারণ দুপুর একটার মধ্যে ফাইভ-স্টার হোটেলের বুফে লাঞ্চে পৌঁছাতে না পারলে গ্রিলড স্যামন মাছটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কুয়াশা আঁচ করতে গিয়ে ওনাদের কথার ভঙ্গিমা হয়ে ওঠে নিখুঁত অ্যাক্রোবেটিক কসরতের মতো। এক মুখে তরুণদের বন্দনা গেয়েই পরের লাইনে রাজনৈতিক দলগুলোর ত্যাগ স্মরণ করিয়ে দেন; এক নিশ্বাসে ‘সংস্কার ছাড়া নির্বাচন অসম্ভব’ বলে পরের নিশ্বাসেই দাবি করেন, ‘জনপ্রতিনিধি ছাড়া সংস্কারের কোনো গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই’। এমন এক পিচ্ছিল বয়ান তৈরি রাখা, যাতে আগামী দিনে বাতাস যেদিকেই ঘুরুক না কেন, স্যারেরা ঠিক সেই মসনদের পালকিতেই আলতো করে ল্যান্ড করতে পারেন। সাধারণ মানুষ যখন বাজারে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তখন এই হাইব্রিড বুদ্ধিজীবী ক্যামেরার সামনে চশমার ফ্রেম ঠিক করে মুচকি হেসে বোঝান—এই দীর্ঘশ্বাসটাই নাকি গণতন্ত্রের প্রারম্ভিক নস্টালজিয়া!
ক্ষমতার পালাবদল ঘটে রাজপথের লড়াই আর সাধারণ মানুষের ঘামে, কিন্তু তার ফসল কাটার মৌসুমে দৃশ্যপটে হঠাৎ হাজির হন একঝাঁক বিশেষজ্ঞ ‘সব-মৌসুমের ময়না’। পতাকার রঙ বদলানোর সাথে সাথে যাদের গায়ের পালক রাতারাতি গিরগিটির চেয়েও দ্রুত রূপ বদলায়। গণঅভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচনের ধুলোবালি মেখে জনতা যখন ঘরে ফেরে, তখন ক্ষমতার ড্রয়িংরুমে চলে স্তাবকতার নতুন ব্যাকরণ রচনার মহোৎসব। এই আবহাওয়ায় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা মূলত ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় জায়গা করে নেওয়ার এক নিখুঁত সার্কাস। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকার মসনদে বসতেই এই ময়নাদের সার্কাস প্রধানত তিনটি স্বতন্ত্র স্কোয়াডে বিভক্ত হয়ে ময়দানে নামে— এদেরকে গ্রামশির চশমায় আবিষ্কারের দল, বা মানসম্মান রক্ষা কমিটি; ওয়েবারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী জাতীয় স্বার্থ দল, বা প্যাটার্নালিস্টিক টেকনোক্র্যাট এবং সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ সিন্ডিকেট সংক্ষেপে আমরা ‘প্যাভিলিয়ন বদলানো ওপেনার’ বলতে পারি!
আবিষ্কারের দল বা মানসম্মান রক্ষা কমিটি (গ্রামশির চশমায়) এরা সাধারণত প্রখ্যাত কলামিস্ট, সমাজতাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক স্কচটেপ বিশেষজ্ঞ। ক্ষমতার পালাবদলের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এরা আবিষ্কার করে ফেলেন যে, নতুন যে নেতা বা সরকার এসেছে, তাদের প্রপিতামহের সাথে এদের বংশের একটা গোপন আত্মিক কিংবা আদর্শিক যোগাযোগ ছিল। এরা হঠাৎ টিভি চ্যানেলে বসে গম্ভীর গলায় বলবেন, ‘আসলে নবনির্বাচিত নেতার চিন্তার গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের থিওরি রি-ভিজিট করতে হবে। আমি গত সপ্তাহেই ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লব নিয়ে একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করছিলাম, হুবহু এই প্রেসক্রিপশনটাই সেখানে দিয়েছিলাম!’’ অর্থাৎ, দেশ যে স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে, তার পেছনে লাখো জনতার রক্ত বা ঘাম যতটা না দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি অবদান ছিল স্যারের ড্রয়ারে বন্দি থাকা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির। আগের জমানায় কথা বললে ডিজিটাল আইনে মামলা হতো, আর এখন নাগরিক মুখ খুললে এরাই তাত্ত্বিক মোড়কে বোঝান—আপনার কথা বলার অধিকার তো আছে, কিন্তু তা ‘জাতি গঠনের প্রক্রিয়ার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ’। গ্রামশিকে ধার করে তারা পাবলিকের মুখে স্কচটেপ এঁটে দেন— ‘‘চুপ করে থাকাটাও এক প্রকার বিপ্লব, ভাই!’ আমজনতা তখন নিজের অধিকার চাইতে গিয়েও হীনম্মন্যতায় ভোগে—উচ্চমার্গীয় সংস্কারের চেয়ে তাদের বাকস্বাধীনতা বুঝি নিতান্তই তুচ্ছ বিষয়!
‘জাতীয় স্বার্থ দল’ বা প্যাটার্নালিস্টিক টেকনোক্র্যাট (ওয়েবারের প্রেসক্রিপশন) এদের ত্যাগ দেখলে পাষাণ হৃদয়ও গলে যাবে। এদের কেউ যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ বা কোনো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হতে পারেন, তবে তাদের প্রথম বয়ানটি হবে— ‘‘বিশ্বাস করুন ভাই, আমি তো রাজনীতি থেকে শত হাত দূরে থাকা একজন নিরীহ একাডেমিক মানুষ। বই-খাতা নিয়েই আমার জগৎ ছিল। কিন্তু নতুন সরকার আমাকে একরকম জোর করে হাত ধরে টেনে এনে বসিয়ে দিলো। বললো, ‘স্যার, আপনি হাল না ধরলে এই পোড়া দেশ বাঁচবে না।’ জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমি কীভাবে ‘না’ বলি বলুন? তাই নিজের ব্যক্তিগত গবেষণার প্রভূত ক্ষতি স্বীকার করেও এই কাঁটার মুকুট মাথায় পরলাম।’’ আহা! কাঁটার মুকুট বটে, তবে সেই মুকুটের সাথে পাজেরো গাড়ি, গানম্যান আর তদবিরকারী আত্মীয়-স্বজন অধিকার রক্ষাকারী ব্যক্তিবর্গ ফ্রি পাওয়া যায় বিধায় কাঁটার খোঁচাটা একটু কমই লাগে। এদের ভাবখানা এমন যেন দেশের সব নাগরিক আস্ত এক অবুঝ শিশু, আর স্যারেরাই হলেন তাদের একমাত্র বৈধ অভিভাবক! জনগণ যখন ভাবল ভোট দিয়ে নিজের প্রতিনিধি বানাবে, ওমনি টেকনোক্র্যাটরা ফাইল উঁচিয়ে তেড়ে আসেন—‘‘আরে থামো তো বাপু! গণতন্ত্র কি এতই সোজা? ট্যাক্স বোঝো? আইএমএফের শর্ত বোঝো? জিডিপির কার্ভ বোঝো? রাষ্ট্র আমরা ফাইল ঘেঁটে চালাচ্ছি, তোমরা গিয়ে ঘুমাও।’’ ফলে ভোটাধিকার আর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সোজা হিসাবটা আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে আটকে যায়।
‘প্যাভিলিয়ন বদলানো ওপেনার’ (সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ সিন্ডিকেট) এরা সবচেয়ে ভয়ংকর। আগের সরকারের আমলে এরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, প্লট বাগিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় খরচে বিদেশ ঘুরে এসেছেন। ক্ষমতার পালাবদল হওয়া মাত্রই এরা এমন একটা ভাব ধরছেন যেন তারা ছিলেন ফ্যাসিবাদের গর্ভে লুকিয়ে থাকা ট্রোজান হর্স! এরা চায়ের দোকানে ফিসফিস করে বলবেন, ‘‘আমি যে গত দশ বছর ওদের সাথে ছিলাম, সেটা তো আসলে সিস্টেমটাকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলার জন্য! ইট ওয়াজ আ ট্যাকটিকাল মুভ!’’ এদের পিঠের চামড়া এতই স্থিতিস্থাপক যে, এরা একই গলায় সকালে স্বৈরাচারের প্রেতাত্মাদের ফাঁসি চাইতে পারেন, আবার বিকেলে নতুন সরকারের কর্তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ফাইল বগলদাবা করে সেলফি তুলতে পারেন। নাগরিকের পক্ষে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে কথা বলার যে ওয়াচডগ থাকার কথা ছিল, এরা সেই পদের সুবিধার লোভে নির্বিঘ্নে ক্ষমতার বারান্দায় জায়গা করে নেয়। নাগরিক যখন দাবি আদায়ের মিছিলে নামে, তখন এই সাবেক ‘জনতার কণ্ঠস্বর’রা উল্টো ধমক দেন, ‘‘সরকারকে একটু সময় দিন, কাজ করতে দিন!’’
ইতালীয় মার্কসবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশি হয়তো তাঁর বইয়ে লিখেছিলেন ‘অর্গানিক বুদ্ধিজীবী’র কথা, কিন্তু বাংলাদেশে এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই অর্গানিক হয়ে গেছে ‘হাইব্রিড’। এরা মাটিতে শিকড় গাড়েন না, ক্ষমতার টবে সুন্দর করে রাসায়নিক সারের ওপর ফুটে থাকেন। আর জুলিয়ান বেন্দা যে বলেছিলেন ‘বুদ্ধিজীবীদের বিশ্বাসঘাতকতা’—বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের দল তা শুনলে নির্ঘাত মিটিমিটি হাসবেন। বিশ্বাসঘাতকতা আবার কী? একে তো বলে ‘টাইমিং সেন্স’! ট্রেনের বগি বদলে যদি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় যাওয়া যায়, তবে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বিপ্লবের ধুলোবালি মেখে লাভ কী? ফলে ক্ষমতার পালাবদলের পরও বাজারে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠলে টিভির পর্দায় চোখ রাখলে দেখতে পান— নতুন সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে সদ্য ফুল দিয়ে আসা আমাদের বুদ্ধিজীবী মহোদয় মুচকি হেসে বলছেন, ‘‘আসলে জাতি গঠনের এই ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে সামান্য মূল্যস্ফীতি তো গণতন্ত্রের প্রসূতিবেদনা মাত্র! চলুন, আমরা সবাই মিলে ধৈর্য ধরি।’’ স্বৈরাচার বিদায় নেয় ঠিকই, কিন্তু তাদের চাটুকারিতার ব্যাকরণ বইটা অক্ষত অবস্থায় নতুন সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; ডালপালা মেলে মধুবন, ফোটে বুদ্ধির ফুলফুল।
তবে এই তত্ত্বকথা কেবল ক্ষমতার অলিন্দেই সীমাবদ্ধ থাকে না; হালে দেশের বাস্তব সংকটে এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ময়দানে এই ময়নাদের কসরত দেখলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়!
ধরা যাক, নতুন সরকারের আইন প্রণয়ন ও কমিশনগুলোর নিয়োগের মহোৎসবের কথা। জনগণ ভেবেছিল এবার বুঝি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশনগুলোতে এমন মানুষ আসবেন যারা ক্ষমতার দিকে সোজাসুজি আঙুল তুলে কথা বলবেন। কিন্তু গেজেট বের হতেই দেখা গেল—সেই একই চেনা মুখের মিউজিক্যাল চেয়ার! যেসব বিশেষজ্ঞ গত আমলে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’-এর খসড়া সাজিয়ে নাগরিকের বাকস্বাধীনতায় ডিজিটাল তালা মেরেছিলেন, তারাই এখন নব্য সংস্কারকের পোশাকে মানবাধিকার কমিশনের করিডোরে ঢুকছেন ‘নাগরিক অধিকারের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে! নতুন সরকার যখন সেই পুরনো দমনমূলক ধারাগুলোর নাম বদলে কেবল দাঁড়ি-কমার রূপান্তর ঘটিয়ে নতুন মোড়কে ‘আইন’ পাস করছে, তখন এই বুদ্ধিজীবীরা টকশোতে এসে ডিশুম-ডিশুম তাত্ত্বিক বয়ান দেন—‘‘আইনের ভাষা বুঝতে হলে আপনাকে মিশেল ফুকোর প্যানোপটিকন থিওরি বুঝতে হবে। এটি দমন নয়, এটি তো রাষ্ট্রের প্রটেক্টিভ নিউরোসিস!’’ কমিশনগুলোতে বসে স্যারেরা একে অপরের পিঠ চুলকে দিয়ে কোরাম পূর্ণ করেন, আর নতুন আইন প্রণয়নের নামে আসলে পুরনো ড্রাকুলাকেই নতুন জ্যাকেট পরিয়ে জনতার সামনে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর আসা যাক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের চরমতম ট্র্যাজেডি—মিরাজের গুম আর নদীতে নৌপুলিশের গুলিতে নিরীহ জেলের বুক ঝাঁঝরা হওয়ার বাস্তবতায়। আগের সরকারের আমলে বিরোধী কণ্ঠ বা অধিকারকর্মী গুম হলে কিংবা আয়নাঘরের কথা উঠলে এই বুদ্ধিজীবীরা মুখ টিপে বলতেন, ‘আরে ভাই, ও তো ‘পরকীয়া’ করতে গিয়ে লুকিয়ে আছে, পুলিশ কেন অহেতুক গুম করতে যাবে?’’ আর আজ নতুন আমলেও যখন নাগরিক অধিকারকর্মী মিরাজ হঠাৎ ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে যায়, কিংবা জীবিকার তাগিদে নদীতে জাল ফেলা কোনো সাধারণ জেলের বুক নৌ পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়, তখন ওনাদের থিওরির রং আবার বদলে যায়! স্যারেরা তখন সোফায় হেলান দিয়ে ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে বলেন, ‘‘দেখুন, মিরাজের এই নিরুদ্দেশ হওয়া কিংবা নদীতে পুলিশের এই অ্যাকশনকে কিন্তু সরল চোখে দেখলে চলবে না। রাষ্ট্র যখন পুনর্গঠনের গভীর ট্রমার ভেতর দিয়ে যায়, তখন কিছু প্যারানরমাল মিসিং কেস তৈরি হতে পারে, নদীতেও মৎস্যসম্পদ রক্ষার স্বার্থে ট্রিগার-হ্যাপি ফ্রাস্ট্রেশন দেখা দিতে পারে। এর পেছনে কি কোনো থার্ড ফোর্সের ডিপ-স্টেট সাবোতাজ নেই?’’ নদীর জলে রক্ত ভেসে গেলে কিংবা বুলেটে বুক ঝাঁঝরা হওয়া জেলের লাশ মর্গে পড়ে থাকলে মানবাধিকারের ঠিকাদার বুদ্ধিজীবী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বিজ্ঞের মতো নিদান দেন, ‘‘ঘটনাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। নৌসীমার নিরাপত্তা আর প্রান্তিক মনস্তত্ত্বের ভেতর একটা এন্ট্রপিক টানাপোড়েন থাকে। আমরা একটা উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল মেটাফিজিক্যাল তদন্ত কমিটির রূপরেখা লিখছি, ততদিন পর্যন্ত নিহত জেলের পরিবারকে ধৈর্য ধরতে হবে!’’ অর্থাৎ, লাশ পড়ে থাকে মর্গে, স্বজনের আহাজারি ভাসে বাতাসে, আর স্যারেরা এনজিওর কনফারেন্সে বসে ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স অ্যান্ড ব্লু-ইকোনমি ভায়োলেন্স বনাম পোস্ট-অথরিটারিয়ান স্টেটহুড’ শিরোনামে গবেষণাপত্র পাঠ করে ডেনমার্কের ফান্ড হাসিল করেন!
আরও চমকপ্রদ সার্কাস দেখা যায় যখন শম্পা গোস্বামীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা ঠুকে দেওয়া হয়। যে বুদ্ধিজীবীরা এতদিন ধরে মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশ আর ভিন্নমত ধারণের ওপর সেমিনার করে বক্তৃতার টেবিলে ঝড় তুলেছেন, এক শম্পা গোস্বামীর সাধারণ, নিয়মিত ও প্রতিবাদী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাবার পর তাদের প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হবে রাষ্ট্র বুঝি এই মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো! আগের আমলে শম্পা গোস্বামীর মতো কেউ নিপীড়নের শিকার হলে ওনারা ‘ফ্যাসিবাদী থাবা’ বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে চিঠি পাঠাতেন। আর এখন ক্ষমতার নতুন বারান্দায় বসে নিজেদের আখের গোছাতে গিয়ে সেই একই বুদ্ধিজীবীরা নখ-দাঁত বের করে বলছেন, ‘‘না না, এটা কোনো সাধারণ ভিন্নমত নয়! রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সুতোটা এখন খুব নরম। এই সময়ে এমন কথা বলা মানে তো সরাসরি নতুন বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে কালাপাহাড়ি ষড়যন্ত্র! অতএব দণ্ডবিধির ১২৪(ক) ধারা তো ওনার ওপর লাগাই উচিত!’’ অর্থাৎ, স্বৈরাচারের অস্ত্রগুলো যে এতদিন খারাপ ছিল, তা কিন্তু অস্ত্রের দোষে নয়; ওটা ভুল লোকের হাতে ছিল বলেই ওনাদের রাগ ছিল! এখন বন্দুকের নলটা নিজেদের পছন্দের শিকারের দিকে তাক করা গেছে বিধায় রাষ্ট্রদ্রোহের পুরনো ধারাই ওনাদের চোখে হয়ে উঠেছে ‘জাতীয় সংহতির পরম ঢাল’!
একই দ্বিচারিতা দেখা যায় রাজধানীর মাদক সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রেও। আগের সরকারের আমলে টেকনাফ থেকে কারওয়ান বাজার যখন ইয়াবা আর আইসের বন্যায় ভাসতো, তখন এই বুদ্ধিজীবীরা একে দেখতেন ‘ভোগ্যপণ্যের ডাইভারসিফিকেশন’ হিসেবে। আর এখন নতুন আমল শুরু হতেই ওনাদের বয়ান একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এখন টিভি টকশোতে এসে বলছেন, ‘‘দেখুন, পাড়া-মহল্লায় যে কোটি কোটি টাকার ক্রিস্টাল মেথ ঘুরছে, এটা হলো আন্তর্জাতিক ডিপ-স্টেট ও সাবেক স্বৈরাচারের এক গভীর হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার! তরুণদের বিপ্লবী মস্তিষ্ক অবশ করে দিতে পার্শ্ববর্তী দেশ পাইপলাইন দিয়ে মাদক পাঠাচ্ছে।’’ সমাধান কোনো কার্যকর সীমান্ত পাহারা কিংবা গডফাদারদের ধরা নয়; সমাধান হলো স্যারের এনজিওকে দিয়ে ‘মাদকবিরোধী মনস্তাত্ত্বিক জ্যামিতি’ শীর্ষক একটা দুই কোটি টাকার রিসার্চ প্রজেক্ট পাস করানো! প্রজেক্টের টাকায় স্যার গুলশানের লাউঞ্জে বসে সেমিনার করবেন, আর ওদিকে গলির মুখে পুরিয়া আগের চেয়ে বিশ টাকা বেশিতে নির্বিঘ্নে বিক্রি হতে থাকবে।
এরপর রাজধানীর চিরন্তন বিনোদন— খাল উদ্ধার ও পলিথিন অভিযান। যেই ম্যাজিস্ট্রেট এস্কেভেটর হাঁকিয়ে খালের সীমানা ভাঙতে গেলেন, অমনি পরিবেশবাদী বুদ্ধিজীবীরা ক্যামেরা নিয়ে খালের পাড়ে এসে পোজ দেন। তারা পলিথিনে ভরা দুর্গন্ধযুক্ত কালো পানির দিকে আঙুল তুলে বিষণ্ণ মুখে বলেন, ‘‘এই যে খালের তলদেশে তিন ফুট পুরু চিপসের প্যাকেট, এটা আমাদের সামগ্রিক উত্তর-ঔপনিবেশিক ট্রমার বহিঃপ্রকাশ!’’ আগের সরকারের আমলে যিনি খালের ওপরে নিজের নামে আটতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ফ্ল্যাট তুলেছিলেন, তিনি এখন নতুন নগর রক্ষা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা হয়ে মাইকে হাঁক ছাড়ছেন, ‘‘কোনো দখলদারকে ছাড় দেওয়া হবে না!’’ তবে উচ্ছেদ অভিযানটা চলে খালের ওপর ঝুপড়ি তোলা টোকাই কিংবা চায়ের টংয়ের ওপর দিয়ে। স্যারের ভায়রা-ভাই বা কোনো শীর্ষ নেতার যে শপিং মলটা খালের অর্ধেক পেটে পুরে দাঁড়িয়ে আছে, তার সামনে এসে এস্কেভেটর হঠাৎ ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’তে থমকে দাঁড়ায়। তখন স্যার প্রেস ব্রিফিংয়ে মিষ্টি হেসে বলেন, ‘‘উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মধ্যে একটা টেকসই ডায়ালগ দরকার। সব ভেঙে ফেললে তো ইকোসিস্টেমের হারমনি নষ্ট হবে!’’ ব্যস, ড্রেনের ময়লা ড্রেনেই পচে, আর স্যার ‘রিভার অ্যান্ড ড্রেন গভর্নেন্স’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে জেনেভার টিকিট কনফার্ম করেন।
সবচেয়ে করুণ কিন্তু চরম নাটকটি মঞ্চস্থ হয় পোশাক কারখানার শ্রমিক আন্দোলনে। গাজীপুর বা আশুলিয়ায় যখন বকেয়া বেতন আর ন্যূনতম ভাতার দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিক পেটের দায়ে রাজপথে নেমে আসেন, তখন ড্রয়িংরুমে বসে ফরাসি বিপ্লব আর মার্ক্সের দাস ক্যাপিটাল আওড়ানো বুদ্ধিজীবীদের চোখে-মুখে শঙ্কার মেঘ জমে। আগের আমলে যেখানে শ্রমিকের স্বার্থের চেয়ে তথাকথিত ‘দেশের ইমেজ’ বড় ছিল, এখন ক্ষমতার নতুন বারান্দায় জায়গা পেয়ে তাদের সুর আরও মারমুখী— ‘‘শ্রমিক ভাইদের আবেগ আমরা বুঝি, কিন্তু এই যে তারা রাস্তা আটকালেন, এর পেছনে কি পরাজিত শক্তির উসকানি নেই? নিশ্চিত কোনো ভিনদেশি বায়ার আমাদের রপ্তানি অর্ডার ভিয়েতনামে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য এই চক্রান্ত পাকাচ্ছে!’’ শ্রমিকের ঘরে চাল নেই, পেটে ভাত নেই—তাঁদের খালি পেটের ডাকটাও এখন স্যারের কাছে ‘জিয়োপলিটিক্যাল কন্সপিরেসি’! বুদ্ধিজীবী মহোদয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টুডিওতে বসে টাই ঠিক করতে করতে নিদান দেন, ‘শ্রমিকদের উচিত পোস্ট-মডার্ন ধৈর্য ধারণ করা। আমরা তো তাদের অধিকার রক্ষার জন্য একটা উচ্চপর্যায়ের জাতীয় লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের প্রস্তাবনা সাজাচ্ছি।’ এদিকে শ্রমিক রাস্তায় টিয়ারগ্যাস আর গরম পানির কামানের মুখে দাঁড়িয়ে ভাবেন—স্বৈরাচারী আমলে মালিকপক্ষ মারত ডান্ডা দিয়ে, আর নতুন জমানায় বুদ্ধিজীবীরা মারছেন নসিহত আর থিওরির প্যাঁচে ফেলে!
দিনশেষে নদী শুকায়, খালের ওপর দখলদারের সাইনবোর্ড আরও চকচক করে, মাদক সিন্ডিকেট নতুন ক্ষমতার সাথে সমঝোতা সারে, আর বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকের পেটে কিংবা নদীর বুকে নিরীহ জেলের শরীরে রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেটের আঘাত অবিকল একই জায়গায় এসে লাগে। ক্ষমতার চেয়ার বদলায়, স্লোগান বদলায়, কমিশনের চেয়ারপারসন বদলায়—কিন্তু মিরাজের স্বজনের দীর্ঘশ্বাস আর নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার সেই ‘অপেক্ষমাণ তালিকা’তেই জমা থাকে। সাধারণ মানুষ যখন নিজের নাগরিক হিসেব কিংবা জবাবদিহিতা চাইতে যায়, তখন এই জ্ঞানপাপী হাইব্রিড ময়নার দল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মোটা অভিধান ছুড়ে প্রমাণ করে দেয়—নাগরিক এখনো অধিকার পাওয়ার মতো যথেষ্ট সাবালক বা যোগ্য হয়ে ওঠেনি, অতএব নাগরিকদের বিরুদ্ধে নথি সাজিয়ে আর দমনমূলক পুরাতন-নতুন আইনের ফাইলে সিলমোহর মেরে স্যারেরাই দেশটাকে উদ্ধার করতে থাকুন!
লেখক: গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী