মিডিয়ার কারণেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ে!

কাঁচাবাজার২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট দেশের খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৪৫ টাকা থেকে ৪৮ টাকা। এর পরদিন ১৯ আগস্ট গণমাধ্যমে বলা হলো, ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোতে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরদিন থেকেই বাংলাদেশে কেজিতে দশ থেকে পনের টাকা দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২৫ আগস্ট বাংলাদেশের বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় নব্বই টাকার ওপরে। মাত্র এক সপ্তাহে অতি প্রয়োজনীয় এই নিত্য পণ্যটির দাম বৃদ্ধি পায় শতকরা ষাট ভাগেরও বেশি। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে দেশে পেঁয়াজের কোনও সংকট ছিল না। ওই সময় দেশে পেঁয়াজের উৎপাদনও ভালো হয়েছিল, সরবরাহও ছিল পর্যাপ্ত। আবার ভারতীয় পেঁয়াজও প্রচুর আমদানি করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী এই পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দেয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। সেই সময় আরও পাঁচ লাখ টন পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছিল।
রাজধানীর কারওরান বাজারের পেঁয়াজের আড়তদার মাহবুব হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, যখনই গণমাধ্যমে বলা হলো ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে তার পরদিন থেকেই বাংলাদেশে কেজিতে দশ থেকে পনের টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যদিও তখন দেশে পেঁয়াজের কোনও সংকট ছিল না।

জানা গেছে, শুধু পেঁয়াজই নয়, পবিত্র রোজার মাস ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ছোলা, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যায়।এছাড়া প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এলে গণমাধ্যমে প্রচারের কারণে ইলিশের দামও বেড়ে যায়। কয়েক বছর আগে চিনির সংকট নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর চিনির দাম বেড়ে যায়। একইভাবে কয়েক বছর আগে কুরবানীর চামড়ায় লবন ব্যবহারকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে ‘লবন সংকট’ প্রচারণার পর লবনের দাম বেড়ে যায়। একইভাবে সয়াবিন তেল, কাঁচামরিচের দাম বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। কখনও কখনও মিডিয়ার প্রচারণায় শিশুদের গুঁড়া দুধেরও দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মিডিয়া দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করার কারণে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটে। এই জন্য গণমাধ্যমের আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি বলে মত দেন তিনি। হেলাল উদ্দিন বলেন, কেবল পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিই নয়, কোনও কোনও মিডিয়া যথাযথ দায়িত্বপালন না করার কারণে অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে।

তিনি মনে করেন, অসৎ ব্যবসায়ীরা অনেক সময় গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে কোনও অসৎ ব্যবসায়ী যাতে সাংবাদিকদের ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য সংবাদ মাধ্যমগুলোকে আরও যত্নবান হতে হবে। দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে। যে সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ নয়, বা প্যানিক সৃষ্টি করে, বা সংবাদের কারণে ভোগ্য পণ্যে দাম বেড়ে যেতে পারে, অথবা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে সেই ধরনের খবর প্রকাশ থেকে বিরত থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বা রেগুলেটরি বোর্ড গঠন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে একমত পোষণ করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্ক আইপিএন’র সিনিয়র গবেষক আনোয়ারুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এক শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী আছেন, যারা বিভিন্ন গণমাধ্যমেরও মালিক। তারা অনেক সময় গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর কৌশল হিসাবে মিডিয়াকে ব্যবহার করে। গুজব ছড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও গণমাধ্যমের এক শ্রেণির দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভুল বুঝিয়েও পণ্য সংকটের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এর ফলে দেখা যায়, সত্যিই ওই পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এ কারণে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নজরদারি বাড়াতে হবে।

এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের একজন সংবাদকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়বে’। বাংলাদেশের গণমাধ্যম যেদিন এই সংবাদ প্রকাশ করেছে, সেদিন থেকে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংবাদ করার জন্য সাংবাদিকরা যে তথ্য সংগ্রহ করেন, তা সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। কোনও কোনও সময় অসৎ ব্যবসায়ীরা সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দেন। এর ফলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এছাড়া বাজারের এক শ্রেণির ব্যবসায়ী আছেন, যারা টিভির মাইক্রোফোন দেখলেই পণ্যের দাম ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেশি বলেন। এর ফলে সত্যি সত্যি ওই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন ক্রেতারা।

অবশ্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের কোনও ভূমিকা নেই বলে মনে করেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব একাত্তর টিভির পরিচালক (বার্তা) সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মিডিয়ার কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, এটা ঠিক না। কারণ হলো, মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর জন্য কোনও নিউজ করেন না। তবে সত্যিকার খবর না নিয়ে, সঠিক খবর না নিয়ে কেউ যদি শুধু মনগড়া খবর পরিবেশন করেন, সে ক্ষেত্রে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণেই মিডিয়ার দায়িত্বটা অনেক বেশি।

তিনি বলেন, যে তথ্যটা গণমাধ্যমে আমি প্রকাশ করবো, তা যেন সঠিক হয়, প্রমাণিত সত্য হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় মিডিয়ার কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে এটা ঠিক বলা যাবে না। পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে বাজারে সিন্ডিকেট থাকে।

তিনি মনে করেন, সাংবাদিকদের চাইতে অনেক বেশি তথ্য থাকে যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করেন তাদের কাছে। তারা নানা ধরনের কারসাজি করেন বলেই জিনিপত্রের দাম বাড়ে। ইশতিয়াক রেজা জানান, জিনিসপত্রের দাম যাতে না বাড়ে সে জন্য সরকারের যেসব সংস্থার মনিটর করার কথা, তারা সেইভাবে মনিটর করে না। আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ডিপার্টমেন্ট ছিল, যারা বাজারে মূল্য পর্যবেক্ষণ করতো। সেটা এরশাদ আমলে তুলে দেওয়া হয়। তারপর থেকে বাজার অনেকটা লাগামহীন।

এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যে সংবাদিকতার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সেটাকে মৌলিক সাংবাদিকতা বলা যাবে না। তিনি মনে করেন, দ্রব্য মূল্যের ব্যাপারে রিপোর্টিংটা হওয়া উচিত কোন জিনিসের দাম বাড়ছে, কেন বাড়ছে, সেটা বোঝানোর জন্য। কোনও ব্যবসায়ী কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর জন্য পণ্যের মজুত বাড়াচ্ছে কিনা। এই তথ্যকে যদি আমি উপস্থাপন করি, তাহলে দাম বাড়ার আশংকা থাকে না।

তিনি বলেন, কোনও একটা দ্রুটি-বিচ্যুতি বা অপরাধমূলক কাজ উম্মোচন করে দেওয়াই সাংবাদিকতা। আমরা যদি রোজার ৬ মাস আগে বলি যে, আমাদের আমদানিকারকরা, কিংবা সরকারি মহল, রোজার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে না। ছোলা এখনও আমদানি করার যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পর্যাপ্ত তেলের আমদানির ব্যবস্থা করা হয়নি। এর ফলে আমাদের ছোলার দাম বেড়ে যাবে, তার মানে হচ্ছে, আমি সরকারকে সাবধান করছি। সাংবাদিকরা আগে থেকে ধরিয়ে দেবে। নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, সাংবাদিকরা এমন কোনও কাজ করবে না, যেটা করলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে কোনও নিউজের প্রতিক্রিয়ায় যেকোনও ধরনের নেতিবাচক ঘটনা ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে নৈতিক জায়গা থেকে দুঃখ দেখা দেবে। আমাদের খারাপও লাগবে। আমরা গ্লানিবোধ করবো। হয়ত, এর জন্য দুঃখ প্রকাশও করবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সাংবাদিকতা অপরাধমূলক হয়ে গেল।

এপিএইচ/আপ-এজে