দীর্ঘ ৫ বছর পর অবশেষে সফল হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের ২ মাস আগে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসের শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। গত এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ আগের বছরের জুনে যদি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেসরকারি খাতে ১০০ টাকা ঋণ গিয়ে থাকে, তাহলে চলতি বছরের জুনে ১১৬ টাকা ঋণ নিয়েছে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা।
এ প্রসঙ্গে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণে সুদহার কম থাকার কারণে উদ্যোক্তারা ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক নতুন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করেছেন। আবার পুরনো অনেকে ঋণসীমা বৃদ্ধি করেছেন। এ কারণেই ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।
গত টানা ৫ বছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিনিয়োগ পরিবেশ স্বাভাবিক না থাকার কারণে টানা ৫ বছর প্রাক্কলিত ঋণ প্রবৃদ্ধি পূরণ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম প্রবৃদ্ধি হওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয় সাড়ে ১৫ শতাংশ। এই অর্থবছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যায় ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ। অবশ্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জানুয়ারির আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। সেই আলোকে জানুয়ারি-জুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে জুন নাগাদ ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়। কিন্তু ২০১৪ সাল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয় ১৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত অর্থবছরের শেষার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য বেসরকারি খাতে সাড়ে ১৫ শতাংশ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অর্জন হয় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সবর্শেষ ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের ২ মাস আগেই এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষপাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। বর্তমানে কোনও রাজনৈতিক সঙ্কট নেই। এ কারণে অনেকে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন। যার ইতিবাচক প্রভাব বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে পড়তে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগে মনোনিবেশ করছেন। ব্যাংকগুলোর কাছেও বিনিয়োগযোগ্য তহবিল রয়েছে। এর সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে স্বল্প সুদহারের সুবিধা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১০ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কিন্তু ২০১৩ সালের শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঋণ প্রবাহে ভাটা পড়ে, যা পরের বছরেও প্রলম্বিত হওয়ায় ঋণ প্রবাহে মন্দাভাব দেখা দেয়। এরপর থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে কমে ১৩ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৫ সালের জুনে ছিল ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ। ডিসেম্বরে এসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে। এই প্রবৃদ্ধি জানুয়ারিতে ছিল ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। আর মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা চলতি মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।
এ প্রসঙ্গে বিআইডিএসের গবেষক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মেট্রোরেলসহ বড় বড় প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় দেশে বিনিয়োগের এক ধরনের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের কাজের উদ্বোধন হয়েছে। এছাড়া দেশে রাজনৈতিক কোনও অস্থিরতা নেই। আবার ব্যাংক ঋণে সুদ হারও কমে গেছে। যার ফলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে মনোযোগ দেওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে এপ্রিল শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময় শেষে ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে ঋণ বেড়েছে ৮৬ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর বাইরে গত এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ রয়েছে ৭০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে রফতানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের সমস্যা কেটে গেলে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি আরও হওয়া দরকার। কারণ, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা বিরাজ করছিল। এখন দেশে কোনও রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছর ২ বার মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও প্রকাশ করে থাকে। একটি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই মাসে এবং অন্যটি জানুয়ারি মাসে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে এই মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হল-মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি ঋণের যোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।
/জিএম/এমএসএম /
আরও পড়ুন:
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে সরকার ‘চিন্তিত’: সংসদে অর্থমন্ত্রী
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ ৪ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা
আবদুস সালাম মুর্শেদী: রফতানি মুদ্রানীতি চায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা