আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও

বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনিয়ম ধরতে যাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারাও জড়িয়ে পড়ছেন নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে। এর ফলে রেগুলেটরি সংস্থা বলে খ্যাত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ফেঁসে যাচ্ছেন এই ব্যাংকের ছোট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তারাও। কারও কারও বিরুদ্ধে ঋণের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আবার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় গ্রেফতারও হয়েছেন কেউ কেউ। গ্রেফতার এড়াতে অনেকে পালিয়েও বেড়াচ্ছেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই সব তথ্য জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো- মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বদরুল হক খানকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এবি ব্যাংকের প্রায় ৩২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বদরুল হক খান ছিলেন অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত ছিলেন। তিনি এবি ব্যাংকের ডিএমডি থাকা অবস্থায় ঋণ অনিয়মের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে থাকা কর্মকর্তাদের আর্থিক দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের প্যানেল বাতিল করা হয়েছে। নতুন করে গত ২১ জুলাই দ্বিতীয়বারের মতো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এর আগে ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের জন্য গত ২৪ মার্চ ড. কাজী খলীকুজ্জমানকে প্রধান করে সার্চ কমিটি গঠন করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি ২৭ মার্চ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করে। পরে আবেদনকারী অর্ধশতাধিক প্রার্থীর মধ্যে ২১ জনকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়। এতে দুই ধাপে ১৯ জন উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে সাক্ষাৎকার শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করে কমিটি। এদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এসএম মনিরুজ্জামান এবং ও মো. আবদুর রহিম ছিলেন অন্যতম। কিন্তু এই দুই জনের বিরুদ্ধেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই দুই জনের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করায় নিয়োগের প্যানেল বাতিল করা হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দুই নির্বাহী পরিচালক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাত, কমিশনের বিনিময়ে ভুয়া ঋণ অনুমোদন ও বিতরণে সহায়তা করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক-১ এসএম মনিরুজ্জামান, প্রধান কার্যালয়ে ব্যাংকিং প্রবৃদ্ধি-নীতি বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ ও সচিব বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দুদক তা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দিয়েছে। আর অভিযোগগুলো তদারকি করার জন্য দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের কথা বলা হয়েছে তা ভিত্তিহীন। গত ৩২ বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকে কাজ করছি, কেউ বলতে পারবে না, আমি কারও কাছ থেকে কোনও সুবিধা নিয়েছি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে দুদকে আনা অভিযোগে বলা হয়, কমিশনের বিনিময়ে ভুয়া ঋণ অনুমোদন দেওয়া, ঋণ বিতরণে সহায়তা করে তিনি অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখতে দুদকের উপ-পরিচালক মো. সামসুল আলমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় জড়িত থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০ জনেরও বেশি কর্মকর্তার দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিমান, স্থল ও নৌবন্দরগুলোতে সংশ্লিষ্টদের ছবি ও বায়োডাটা দেওয়া হয়েছে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে। নজরদারিতে রাখা হয়েছে অর্ধ্বশতাধিক কর্মকর্তাকে। অবশ্য রিজার্ভ চুরি নিয়ে গঠিত ফরাসউদ্দিনের কমিটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়ে বসে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দফতরকে বিশেষ নিরীক্ষা চালিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন: বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করতে হবে ব্যাংকগুলোকে

এপিএইচ/আপ-এসটি