ঝুঁকিতে থাকা ১৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা

বাংলাদেশ ব্যাংকদেশের সব নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ‘রেড জোন’ বা অধিক ঝুঁকিতে থাকা ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। বুধবার বিকালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যকার বৈঠকে এই সতর্কতা দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কনফারেন্স হলের ওই বৈঠকে এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘ফটকাবাজি’ না করে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরামর্শ দেওয়া হয় ব্যাংকের মতো আচরণ না করে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মাত্রাতিরিক্ত অনিয়ম হচ্ছে। এ কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরপরও এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বাড়লে জড়িত কর্মকর্তাদের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।’

বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক ও ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। ফজলে কবির বলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যেকোনও ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থানে থাকবে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর ফল ভোগ করতে হবে।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলাপি ঋণ প্রায় ৮ শতাংশ, যা মোটেই সন্তোষজনক নয়। শুধু তাই নয়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা বিদ্যমান নীতিমালা লঙ্ঘন করেছেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ে এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে পরিচালকদের ব্যক্তিগত ঋণ ও স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ঋণ প্রদানে অনিয়ম, শেণিকৃত ঋণকে অশ্রেণিকৃত ঋণ হিসেবে দেখানোসহ বেশ কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি এসব অনিয়মের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া গেছে। ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠানে তা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। মাত্রাতিরিক্ত অনিয়মের কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বাজারে ধার্যকৃত সুদহারের চেয়ে অযৌক্তিকভাবে বেশি সুদ আরোপ করবেন না। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুদহার তহবিল ব্যয়ের ৫ শতাংশের বেশি হওয়া সমীচীন নয়।’ বিনিয়োগ সম্পর্কে গভর্নর বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ শিল্পখাতে ৪৩ শতাংশ, ব্যবসা-বাণিজ্যে ১৮ শতাংশ ও হাউজিংয়ে ১৭ শতাংশ। কিন্তু কৃষিতে দুই শতাংশেরও কম। তাই এ খাতে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।’

তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাসেল নীতিমালা অনুযায়ী কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম আবশ্যকীয় মূলধন তাদের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের নিচে। শিগগিরই এই মূলধন ১০ শতাংশের উপরে উন্নীত করতে হবে।

বৈঠক শেষে ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এসব খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের অনিয়ম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিচালকদের নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে শেয়ারের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ নেওয়ার বিধান রয়েছে। কেউ যেন তথ্য গোপন করে এর চেয়ে বেশি ঋণ নিতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের কারণে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’

বৈঠক শেষে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘বিএলএফসিএ’র চেয়ারম্যান মফিজউদ্দিন সরকার বলেন, ‘বীমা কোম্পানিগুলোর ডিপোজিটের ২ শতাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়টি বীমা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ সংস্থা- আইডিআইরএকে জানানো হবে বলে গভর্নর আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া বন্ড মার্কেটে পুনরায় কর অব্যাহতি চাওয়া হয়েছে, যদিও এটি এনবিআরের ওপর নির্ভর করে। তবুও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মফিজউদ্দিন সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবো। এছাড়া বর্তমানে বিদ্যমান সার্ভিস চার্জ বা প্রসেসিং ফি শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ২ লাখ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৫ লাখ করার আবেদন করা হয়েছে।’

/জিএম/এআরএল/