তৃতীয় এ ঋণচুক্তির আওতায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে সেগুলো হচ্ছে– পায়রা বন্দরের বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ, বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার ও তীর সংরক্ষণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, মোল্লাহাটে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরি, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে এক লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যন্ত্রপাতি সরবরাহ। এছাড়াও চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নতকরণ, চট্টগ্রামে ড্রাই ডক নির্মাণ, মিরসরাইয়ের বারৈয়ারহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত দ্বৈতগেজ রেলপথ নির্মাণ, কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর হয়ে সরাইল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ, বেনাপোল-যশোর-ভাটিয়াপাড়া-ভাঙ্গা সড়ককে চার লেনে উন্নীত করা, ঈশ্বরদীতে কনটেইনার ডিপো নির্মাণ, মোংলা বন্দর উন্নয়ন, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে রেলপথ নির্মাণ ভারতের ট্রানজিট বাস্তবায়নে কার্যকরী হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের চাহিদা অনেক বেশি। তাই যে করেই হোক এই ঋণচুক্তি আমাদের কার্যকর করতে হবে। এই ঋণ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে। এ ঋণ চুক্তির অর্থ পুরনো প্রকল্পে নয়, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এতে বিনিয়োগের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেহেতু আমাদের নিজস্ব অর্থ নেই, সেহেতু বিনিয়োগের নতুন এরিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। আমার জানা মতে,এ ঋণের অর্থে রেলপথ, বিদ্যুৎ, বন্দর উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ব্যয় হবে। সেহেতু এটি নতুন দিগন্ত তৈরি করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবায়নের বিষয়টি দু’পক্ষের ওপরই নির্ভর করে। ঋণদানকারী পক্ষ যদি সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণে অর্থ ছাড় না করে তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে। আবার ঋণ ব্যবহারকারী পক্ষ যদি প্রকল্প গ্রহণে ত্রুটি করে এবং কাজে গাফিলতি করে তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি করবে।’
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এখন আমাদের দেশের আমলাদের দক্ষতা বেড়েছে। তাই প্রকল্প ও ঋণের অর্থ যথার্থ ব্যবহারের আরও নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। আমাদের চাহিদা রয়েছে এমন খাত চিহ্নিত করতে হবে।’ বাংলাদেশের ইপিজেড, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো খাতে ভারতীয় বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ঋণ বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ছিল। যে ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হবে সে ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে সমস্যা যেখানে হবে সেটি হলো, অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আমাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনতে হবে।’ ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বেশি জটিলতা সৃষ্টি করে জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্পের পর নকশা প্রণয়নে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে জটিলতা, টেন্ডার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া ইত্যাদি। এগুলো নিরসন করতে হবে। এগুলোয় সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ভারতীয় ইপিজেডে বিনিয়োগ আসবে। তবে বাংলাদেশ যেকোনও ক্রয় সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে পারদর্শী। সে পরিচয় বাংলাদেশ দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে ঋণের অর্থ ছাড়েও যত্নশীল হতে হবে ভারতকে। সময়মতো প্রকল্পের অর্থ ছাড় না হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে এটিই স্বাভাবিক। প্রতিবছর ২০ শতাংশ হারে ঋণের অর্থ ছাড়ের যে শর্ত রয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে ভারতের এক্সিম ব্যাংককে আরও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।’
মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইকোনমিক জোন বা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হলে খরচ বেড়ে যাবে, তখন ওই বাড়তি অর্থ আমাদের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দিতে হবে। এ জন্য প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর সুবিধা চূড়ান্ত করতে হলে ওইসব বিনিয়োগও আমাদের লাগবে। এসব প্রকল্প সাশ্রয়ীভাবে এবং সময়মতো করার জন্য নিজেদের হোমওয়ার্ক করার দরকার আছে বলে মনে করেন তিনি।