অবশেষে সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামছে

বাংলাদেশ ব্যাংকব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। রূপালী ব্যাংক ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকই এখন সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ ঋণ বিতরণ করছে। একইভাবে ডজনখানেক বেসরকারি ব্যাংকও সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ ঋণ বিতরণ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রসঙ্গত, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ দাবি করে আসছিলেন দেশের ব্যবসায়ী মহল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি মাসে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ ঋণ বিতরণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংকটি স্বল্পমেয়াদি ঋণও সিঙ্গেল ডিজিট সুদে বিতরণ করেছে। তবে কনজ্যুমার ক্রেডিট ঋণে ব্যাংকটি দুই অঙ্কের সুদে ঋণ বিতরণ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গত জানুয়ারিতে সোনালী, জনতা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) সিঙ্গেল ডিজিট সুদে বিতরণ করেছে। তবে কনজুমার ক্রেডিট ঋণে এই ব্যাংকগুলো দুই অঙ্কের সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক সিঙ্গেল ডিজিট সুদে দীর্ঘমেয়াদি বড় ঋণ বিতরণ করলেও ক্ষুদ্র শিল্প ও গৃহ ঋণে দুই অঙ্কের সুদ আরোপ করেছে। বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সব ধরনের ঋণে সিঙ্গেল ডিজিট সুদারোপ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের চিত্র ছিল ভয়াবহ। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় শিল্পের জন্য ছোট ও বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীকে ব্যাংক ঋণে দুই অঙ্কের সুদ গুনতে হয়েছে। ওই সময় শিল্প প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণের বিপরীতে ১৫ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ আরোপ করছে কোনও কোনও ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই শিল্পের মেয়াদি ঋণে অথবা চলতি মূলধন ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএবির ঘোষণা অনুযায়ী সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসছে। সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে আমরা সবাই চেষ্টা করছি। তিনি বলেন, যেসব ব্যাংক সুদহার এখনও এক অঙ্কে আনতে পারেনি, তারাও চেষ্টা করছে। আশা করা যায়, অচিরেই সব ব্যাংক সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে পারবে।
এর আগে দেশকে বিনিয়োগবান্ধব, শিল্পবান্ধব, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও রফতানি বাণিজ্যকে গতিশীল করতে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গত বছরের ২০ জুন ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। এই সিদ্ধান্ত গত বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এক বছর আগেও যেসব ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদহার ছিল দুই অঙ্কের ঘরে, তারাই এখন এই ঋণ দিচ্ছে ৯ শতাংশ সুদে। বেশ কিছু ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি ঋণও দিচ্ছে এক অঙ্কের সুদে। তবে অধিকাংশ ব্যাংকই ভোক্তা ঋণ, এসএমই ঋণ দুই অঙ্কের সুদ আরোপ করছে। আর যেসব ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে তারা এই সেবার বিপরীতে দুই অঙ্কের সুদ আরোপ করছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ক্রেডিট কার্ডে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে কোনোভাবেই নামবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গৃহ ঋণ ও কনজুমার ক্রেডিট খাতে দুই অঙ্কের সুদারোপ করলেও শিল্পের মেয়াদি ঋণে ও চলতি মূলধন ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে এনেছে বেসরকারি ৯টি ব্যাংক। তারা হলো- আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক (বিসিবিএল), ঢাকা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক এনএ (বিদেশি)।
অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণের গড় সুদহার এখন ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে সরকারি, বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর গড় সুদহার যথাক্রমে ৬ দশমিক ৭৫, ৭ দশমিক ৫৬ ও ৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী ৯ শতাংশ বা এর থেকে এর নিচে ঋণ বিতরণ করে মাত্র ৪টি ব্যাংক। অন্যদিকে, ১০ শতাংশের বেশি গড় সুদহার রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা মোট ২৯টি।
উল্লেখ্য, ব্যাংক ঋণে সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ওঠে ২০১৮ সালের শুরুতে। শুধু তাই নয়, সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাংকের মালিকরা বেশ কয়েকটি সুবিধেও নিয়েছেন। এরমধ্যে ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ও সংখ্যা দুটোই বাড়িয়ে নিয়েছেন। ব্যাংকের করপোরেট কর আগের চেয়ে আড়াই শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিএবি’র চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা; ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। সর্বশেষ গতবছরের ২ জুলাই বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ৬ শতাংশ সুদে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পড়ে থাকা অলস’ টাকা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণ (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও বা সিআরআর) এক শতাংশ কমিয়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশ করা এবং এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ করা হয়েছে।