আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিমানযোগে বরিশাল যাওয়ার প্রাক্কালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলা ট্রিবিউনকে এ সব তথ্য জানান শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ।
৭২ ঘণ্টা পার হবার পর কোনও ট্যানারি মালিক হাজারীবাগ থেকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কারখানা স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে, সাভারে বরাদ্দকৃত প্লট বাতিল করে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার করেছিলেন শিল্পমন্ত্রী।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটি ছেলে খেলার বিষয় নয়। যারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারখানা সরিয়ে নেননি তাদের কারখানা অবশ্যই বন্ধ করে দেওয়া হবে। আর সময় নয়। বহুবার বহু সময় দেওয়া হয়েছে। ট্যানারি শিল্প মালিকরা সরকারের কাছ থেকে একর পর এক সময় নিয়েছেন। নিয়েছেন আর্থিক অনুদানসহ সব সুযোগ-সুবিধা। তারা প্রতিশ্রুতি রাখেননি। সাভারের শিল্পনগরীতে সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেন কারখানা সরিয়ে নিচ্ছেন না তা বোধগম্য নয়। সাভারে প্রত্যেক মালিকের নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে ব্যাংকিং সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তাঘাটসহ সব অবকাঠামো। সরকারি অর্থায়নেই কেন্দ্রীয় বর্জ শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী বলেন, কোনও শক্তি আমার অবস্থান থেকে আমাকে সরাতে পারবে না। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের। আমি সরকারের মন্ত্রী। আমার নির্দেশ সরকারের নির্দেশ। সরকারের নির্দেশ যারা মানবেন না সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পিছ পা হবে না।
মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, প্রয়োজনে সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে বরাদ্দকৃত প্লট নতুন উদ্যোক্তাদের দেওয়া হবে। এর আগে হাজারীবাগের কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।
শিল্পমন্ত্রী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হাজারীবাগের পরিবেশগত কারণে বিদেশি ক্রেতারা এখন আর কার্যাদেশ দিচ্ছেন না। এ অবস্থায় নিজেদের স্বার্থেই ওখান থেকে দ্রুত ট্যানারি স্থানান্তরে ব্যবসায়ীদের আগ্রহী হওয়া উচিৎ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারাখানা সরিয়ে না নিলে আমাদের চামড়া রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অপরদিকে রাজধানীর পরিবেশের দিকটিও দেখতে হবে।
এর আগে ২০১৫ সালের এপ্রিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় শিল্পমন্ত্রী ২০১৫ সালের ৩০ জুন ও পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ট্যানারি না সরালে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। পরবর্তীতে শিল্প মালিকরা মন্ত্রীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে নানা সমস্যার কথা জানিয়েছিলেন। শিল্পমন্ত্রী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, বৃষ্টি, হরতাল-অবরোধ, নাশকতা ইত্যাদি কারণে শিল্পনগরীর নির্মাণকাজের তেমন অগ্রগতি হয়নি। এ সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ ট্যানারি সাভারে স্থানারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ট্যানারি সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করতে পারবে না তাদের প্লটের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। এর পর উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক হাজারীবাগের ওই ট্যানারিগুলোয় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।
এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ওই সভায় শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, বিসিকের সেই সময়কার চেয়ারম্যান আহমদ হোসেন খান, বাংলাদেশ ফিনিস লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম আবু তাহের, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ১২ বছর আগে ট্যানারি পল্লী স্থানান্তরের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তা এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ হাজারীবাগের বাসিন্দা, পরিবেশবিদ ও এ খাতের উদ্যোক্তারা। কারণ শিল্পটি স্থানান্তর না হওয়ায় স্থানীয়দের দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। বুড়িগঙ্গা নদী ও আশপাশের এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। পরিবেশবান্ধব কারখানা না হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কেনাও কমিয়ে দিয়েছে।
২০০৩ সালে সাভারের কান্দিবৈলারপুর ও চন্দ্রনারায়ণপুর এবং কেরানীগঞ্জের চরনারায়ণপুর মৌজায় ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চামড়া শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে লক্ষ্যে ট্যানারি শিল্প মালিকদের মধ্যে ২০৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
২০০৩ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। তৃতীয় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে এক হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে ১৭৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাভারের হেমায়েতপুরে ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৫৫ জন শিল্পোদ্যোক্তার মাঝে ২০৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর বাইরেও সিইটিপি নির্মাণের জন্য সাড়ে ১৭ একর জমিসহ মসজিদ, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, বিসিকের লোকাল অফিস নির্মাণেও জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাভার চামড়া শিল্পনগরিতে বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫৫টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে ১৫২টি কারখানা লে-আউট প্লান দাখিল করেছে। ইতোমধ্যে সবগুলো লে-আউট প্লান অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ১৪৯টি শিল্প ইউনিট সাইটে নির্মাণ সামগ্রীর মজুদসহ আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর মধ্যে ৯৭টি শিল্প ইউনিট পাইলিংসহ নির্মাণের মূল কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া, ৪২টি শিল্প ইউনিট সীমানা প্রাচীর ও গার্ডশেড নির্মাণ, ৩৭টি শিল্প ইউনিট শুধু সীমানা নির্মাণ, ২টি ইউনিট শুধু গার্ডশেড নির্মাণ শেষ করেছে বলে জানা গেছে।
/এসআই/এফএ/আপ-এনএস/