এদিকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় শতভাগ অনলাইন সেবা থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলো এখনও গ্রাহকদের অনলাইন সেবা দিতে পারছে না। বেসরকারি ১৮টি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংসেবা দিলেও রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকেরও এই ব্যাপারে কোনও আগ্রহ নেই। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সার্বিক পারফরম্যান্সে অবনতি হওয়ায় গত বছরের ১৮ নভেম্বর সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করেই পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা চেষ্টা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত পর্ষদে তুলে ধরতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে রূপালী ব্যাংক। এ ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের ৯৪ শতাংশই কুঋণ। এর পরেই রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। এ ব্যাংকের কুঋণ রয়েছে ৮৪ শতাংশ। সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে কুঋণ ৮২ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। কিন্তু সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে মোট ঋণের ২৪ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপি ঋণ। আর রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংকে ব্যাংকে বিতরণ করা মোট ঋণের ২১ দশমিক ৮৪ শতাংশই খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের খেলাপী ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৭৬২ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৪ হাজার ৭২১ কোটি এবং রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের হার সোনালী ব্যাংকে ২৭ দশমিক ৬৩, অগ্রণীতে ২২ দশমিক ২০, জনতায় ১২ দশমিক ৩৮ এবং রূপালীতে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
সুদের হার বেশি: বেসরকারি ব্যাংকে ঋণে সুদের হার ১১ থেকে ১৩ শতাংশ। কিন্তু সরকারি মালিকানার ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিতে গেলে উদ্যোক্তাদের সুদ গুনতে হচ্ছে ১৪ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক মেয়াদি ঋণে ১৪ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আরোপ করছে গ্রাহকের ওপর। এই ব্যাংকটি সর্বোচ্চ সুদ নিচ্ছে ১৬ শতাংশ। সরকারি অন্যান্য ব্যাংকও ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আরোপ করছে। এর মধ্যে রূপালী ব্যাংক সর্বোচ্চ সুদ আরোপ করছে আবাসন খাতে ১৬ শতাংশ।
মূলধন ঘাটতি: বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন উদ্বৃত্ত থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। এই ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি রয়েছে দুই হাজার ৯৯১ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে দুই হাজার ১৫ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি ৬৬৩ কোটি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ৫৩২ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৩৭৪ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে। অবশ্য বেসরকারি খাতের ৩টি ব্যাংকে মুলধন ঘাটতি রয়েছে। এগুলো হচ্ছে, আইসিবি ইসলামি ব্যাংকের এক হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ২৮৫ কোটি ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৫ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে।
লোকসানি শাখা: সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ব্যাংকের শাখা রয়েছে ৯ হাজার ১৯৭টি। এর মধ্যে সাড়ে তিনশ’র মতো শাখা লোকসানি। এই সাড়ে তিনশ’ লোকসানি শাখার মধ্যে ৩০৩টি শাখাই রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের। অথচ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ শাখাই রয়েছে লাভে। গত বছরের জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ছিল ৮৯টি। তিন মাস পর সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০টিতে। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য তিন বাণিজ্যিক ব্যাংক জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকেও লোকসানি শাখা বেড়েছে। সব মিলিয়ে তিন মাসেই (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই চার ব্যাংকের লোকসানি শাখা ২৪৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০৩টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের লোকসানি শাখা ৭০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২টিতে। অগ্রণী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ৬৬ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২টিতে। রূপালী ব্যাংকের লোকসানি শাখা ২১ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৯টি।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১ হাজার ১৮৯টি, অগ্রণী ব্যাংকের ৯২৮টি, রূপালী ব্যাংকের ৫৪৭টি ও জনতা ব্যাংকের ৯০২টি।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী প্রদীপ কুমার দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারা ও বেতন বেড়ে যাওয়াসহ একাধিক কারণে লোকসানি শাখা বেড়েছে। একইভাবে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন ও প্রভিশন রাখতে গিয়ে মূলধনের ঘাটতি বেড়েছে।
খেলাপী ঋণ আদায়: এদিকে খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে সরকারি ব্যাংক। শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি থেকে চার ব্যাংককে ৯৭৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল। নয় মাসে ব্যাংকগুলো আদায় করেছে ১১৭ কোটি টাকা বা ১২ শতাংশ। শীর্ষ ২০ খেলাপির থেকে আদায়ে তুলনামূলক ভালো করেছে জনতা ব্যাংক, আর খারাপ করেছে রূপালী ব্যাংক। শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি থেকে সোনালী ব্যাংকের আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৩০ কোটি টাকা। ব্যাংকটি আদায় করেছে ২৫ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৬ শতাংশ। জনতা ব্যাংক ২৩৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে নয় মাসে আদায় করেছে ৭৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক ১৮ কোটি ও রূপালী ব্যাংক ২ কোটি টাকা আদায় করেছে।
এছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের শীর্ষ-২০ ঋণখেলাপি থেকে আদায়ও সন্তোষজনক নয়। গত অর্থবছর এ ব্যাংক দুটি আদায় করতে পেরেছে লক্ষ্যমাত্রার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। গত অর্থবছর এ ব্যাংক দুটিকে ৩১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ২২ কোটি টাকা।
অনিয়ম: বেসরকারি ব্যাংকে অনিয়ম হলেও আলোচিত সব অনিয়ম হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্র করে। হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারি ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিসহ অধিকাংশ ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে সরকারি এই ব্যাংকগুলোয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, ঋণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মানও সন্তোষজনক নয়। ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের অভাবেই এ অবস্থা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর এ অবস্থার জন্য প্রধানত দুর্নীতি ও অনিয়মই দায়ী। তিনি বলেন, এই ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি হয়েছে লুটপাট ও অনিয়মের কারণে। এ কারণে এই ব্যাংকগুলো থেকে অনিয়ম দুর করা জরুরি।
মোবাইল ব্যাংকিং: সুবিধাবঞ্চিতদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে ২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অনুমতি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর থেকে বেসরকারি ১৮টি ব্যাংকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা থাকলেও সরকারি মালিকানার একটি ব্যাংকও এই ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। জানা গেছে, ব্যাংকগুলো বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সেবা দিচ্ছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করলেও এখন সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ। বর্তমানে মোট লেনদেনের ৫৫ দশমিক ১১ শতাংশ হয় বিকাশের মাধ্যমে। আর ডাচ-বাংলার ৩৮ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংক লেনদেন করে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
অনলাইন ব্যাংকিং: বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় শতভাগ অনলাইন সেবা থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলো এখনও গ্রাহকদের অনলাইন সেবা দিতে পারছে না। সরকারি এই ব্যাংকগুলো কম্পিউটারাইজড সার্ভিস চালু করেছে হাতে গোনা কয়েকটি শাখায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো অনলাইন ব্যাংকিং সার্ভিস চালু করতে না পারায় রাজধানীর বাইরের শাখার গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোর প্রায় ৫৯ শতাংশ শাখা অনলাইন সুবিধার বাইরে রয়েছে। এতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এসব ব্যাংকের গ্রাহক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবেই সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো সেবার মান উন্নত করতে পারছে না। ফলে প্রতিযোগিতায়ও পিছিয়ে পড়ছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি খাতের এ আট ব্যাংকের মোট শাখা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৩টি। এর মধ্যে অনলাইনের আওতায় এসেছে ২ হাজার ১১৬টি। শতকরা হিসাবে এ হার ৪১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের প্রায় ৫৯ শতাংশ শাখা এখনও অ্যানালগ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভোপলমেন্ট এই পাঁচ ব্যাংকের ৩ হাজার ৬৮৭টি শাখার মধ্যে অনলাইন সুবিধার আওতায় এসেছে ২ হাজার ২৮টি। শতকরা হিসাবে এ হার ৫৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ভিত্তিতে বেসরকারি বাণিজ্যিক ৩০টি ব্যাংকের শাখা রয়েছে ৩ হাজার ৮৭০। এর মধ্যে ৩ হাজার ৮৬৯ বা ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ শাখা অনলাইনের আওতায় এসেছে। নতুন ৯টি ব্যাংকের ২৩৩টি শাখার মধ্যে অনলাইন সুবিধায় রয়েছে ২২৯ বা ৯৮ দশমিক ২৮ শতাংশ। আর বিদেশি ৯ ব্যাংকের ৭৫টি শাখাই অনলাইনের আওতায় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সরকার এই ব্যাংকগুলোতে পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়। তাদের মেয়াদ বৃদ্ধি করেও প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ডিএমডির নিয়োগ দেয় সরকার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে থাকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রতিনিধিত্ব। এসব কারণে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ছুটে যায় মন্ত্রণালয়ে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক কর্মকাণ্ডের সূচকের উন্নতির দিকে আগ্রহ থাকে না ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের। এ কারণে এই ব্যাংকগুলো ক্রমশ অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
/এমএনএইচ/