ডিম তুমি কার?

কিছু দিন ধরে দেশের বাজারে ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। রাজধানীতে একটি ডিম ১৫ টাকা বা এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ফার্মের মুরগির বাদামি ডিম হালিতে পাঁচ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। হাঁসের ডিমের হালি ৮০ টাকা, যা রীতিমতো রেকর্ড। পাইকারি বাজারগুলোতে দরদাম করে এক ডজন ডিম কিনতে গেলে কমপক্ষে ১৭০ টাকা লাগে। পাড়া-মহল্লার দোকানে দাম আরও বেশি।

অপরদিকে অস্বাভাবিক হারে ডিমের এই মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। চাইলেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিম আমদানির অনুমতি দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। ডিমের বাজারও তদারকি করতে পারে না তারা। দেশের পোলট্রি খাত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হলেও ডিমের বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তাদের নয়। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ডিমের এই অস্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কারা? ডিম তুমি কার?

অভিযোগ উঠেছে, পোলট্রি খাতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় সরকারি তদারকি না থাকায় বাজারে তাদের আধিপত্য বেড়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে জনগণ। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ডিমের দাম হয়তো আরও বাড়বে, এমন আশঙ্কা ডিম উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ের।

ডিমের হালি গিয়ে পৌঁছেছে ৬০ টাকার ওপরে (ছবি: ফোকাস বাংলা)

খালে-বিলে পানি কমে মাছের সরবরাহ কমেছে। আবার মাংসের দাম সাধারণ ক্রেতাদের বড় অংশের নাগালের বাইরে। সবজির দামও চড়া। ফলে ডিমের চাহিদা বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, মুরগির খাদ্য সংকট, খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর দাম বেড়েছে। উৎপাদন ঘাটতির কথাও বলছেন তারা।

জানা গেছে, ডিম উৎপাদন ১০ শতাংশ কমেছে। দেশে প্রতিদিন ৪ কোটি ৭০ লাখ ডিমের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৪ কোটি ১০ লাখ পিস পর্যন্ত। গত দুই সপ্তাহের টানা গরমের আগে উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ। অতি গরম, লোডশেডিংয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এদিকে ডিমের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়ে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পোলট্রি খাতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় সরকারি তদারকি না থাকায় তাদের আধিপত্য বেড়েছে, যার খেসারত দিচ্ছে জনগণ। এই করপোরেট সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ডিমের দাম হয়তো আরও বাড়বে।

সংগঠনের সভাপতি সুমন হাওলাদার স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডিম ও মুরগির দাম বেড়ে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির আরেক কারণ প্রান্তিক পর্যায়ের অধিকাংশ ছোট ছোট খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া। এ কারণে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাজারে।

এ খাতের বড় সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব খোন্দকার মো. মহসিন জানিয়েছেন, কিছু দিনে প্রচণ্ড গরমে বিভিন্ন খামারে অনেক মুরগি মারা গেছে। ফলে ডিম উৎপাদনে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অক্টোবরের আগে এই ঘাটতি পূরণ হবে না। এছাড়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে পোলট্রি ফিডসহ অন্যান্য সব খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। এতে ক্ষুদ্র খামারিরা টিকতে না পেরে খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। 

ব্যবসায়ীদের দাবি ডিমের উৎপাদন কমেছে (ছবি: ফোকাস বাংলা)

এ প্রসঙ্গে ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (বিএবি)-এর সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান জানিয়েছেন, আমাদের দেশে এখন প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি ডিম দরকার। উৎপাদন হচ্ছে চার কোটি বা ৪ কোটি ২০ লাখ পিস। কখনও কখনও আরও কম হচ্ছে। এটি একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। এখানে যদি উৎপাদন ১০ লাখ কমে তাহলে কিন্তু বাজারে সংকট হয়। আর যদি ১০ লাখ বেশি হয় তাহলেও কিন্তু ওভার প্রোডাকশন হয়ে যায়। সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে ডিমের দাম আরও বাড়বে বলে আভাস দিয়েছেন তিনি।

পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন মহাসচিব খন্দকার মোহসিন জানিয়েছেন, ডিমের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে রবিবারের মিটিংয়ে মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারীদের (ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন) ডাকা হয়। কিন্তু যারা ডিম উৎপাদন করেন তাদের ডাকা হয়নি। সরকার ২০১০ সালে মুরগির বাচ্চা ও ডিমের মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত একটি কমিটি করে দিয়েছে। সেই কমিটিকে কখনও ডাকা হয় না। মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারীদের নিয়ে সরকার মিটিং করেছে, ডিমের দাম সহনীয় রাখার মিটিংয়ে তাদের কাজ কী? অথচ চাহিদার ৭৮ শতাংশ ডিম উৎপাদন করেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি। বাকি ২২ শতাংশ উৎপাদন করে করপোরেট কোম্পানিগুলো।

এদিকে রবিবার (১৩ আগস্ট) এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলেই ডিম আমদানি করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ইমপোর্ট পারমিশন লাগবে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া ডিম আমদানির সুযোগ নেই। আমি আশা করবো শিগগির এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গ্রিন সিগন্যাল দিলেই ডিম আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের বিষয়ে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, দেশে পর্যাপ্ত ডিমের সরবরাহ আছে। ডিমের সংকট নাই। ডিম আমদানি করা না করার বিষয়টি আমরা অন্যভাবে বিবেচনা করবো। এই বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইন্ডিপেনডেন্টলি বিবেচনা করবে কিনা, এটা তাদের বিষয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, দেশে যে ডিম উৎপাদন আছে, আমরা যদি বাজার ব্যবস্থা বিন্যাস করতে পারি তবে আমদানির কোনও প্রয়োজন হবে না।