বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে আনতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সোমবার (১২ আগস্ট) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এই সুপারিশ তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বন্ধ হয়ে গেলে বিভাগটির আওতায় থাকা ব্যাংক ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্ষদ নিয়োগ দেওয়াসহ অন্যান্য কাজ তাহলে কে করবে— এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থ বিভাগ করবে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই তার সব দিক সামাল দিতে পারবে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, এফআইডি বিভাগটি বিলুপ্ত করার সময় এসেছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, কোনও ধরনের বিবেচনা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে জারি করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই তার সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতো। সিপিডির অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকাণ্ডে নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের জন্যই এফআইডি গঠন করা হয়েছিল।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থনৈতিক অবদানে সহযোগিতার জন্য ব্যাংকিং খাতকে বিশদ কাঠামোগত সংস্কার করা দরকার। এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। যা আমরা অতীতে দেখতে পাইনি। তিনি বলেন, দুই বছর ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে। দরকার ছিল সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর যাতে সুবিধা হয়, সে জন্য সুদহার বাড়ায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা তারা ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির অন্যান্য খাতকে পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হবে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ না করে ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নররা যেসব নীতিমালা গ্রহণ করেছেন সেগুলো ব্যাংকিং আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেসব ভালো চর্চাগুলো ছিল সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অথবা নতুন নিয়ম তৈরি করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছেন তারা। এই অনিয়মের মাধ্যমে বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ চলে গেছে। এর প্রত্যেকটি ঘটনা তদন্ত হওয়া উচিৎ এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকদের মধ্যে যাদের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে তাদেরকেও পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বক্তব্য দেন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
ব্যাংক খাতের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করতে ব্যাংক কমিশন গঠন করার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
সিপিডি বলেছে, পুরো ব্যাংক খাত চলে গেছে নিয়মনীতির বাইরে। এত দিন বিশেষ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রসারে কাজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক দশকের বেশি সময় ব্যাংক খাতে ২৪টি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হয়েছে। এসব কেলেঙ্কারির পরিমাণ ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই তো কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে। সেখানে কি আলাদা কোনও সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করে? আমাদের দেশে তো এফআইডি আমরা তুলে দিয়েছিলাম। যদি আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বাধীনতা দিতে পারি এবং স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে পারি এবং সে যদি সংসদের কাছে তার জবাবদিহি করে, তাহলে এরকম দ্বৈতশাসন দরকার হয় না।
এফআইডির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয় অভিযোগ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা যে কীভাবে নিয়ম-কানুন না মেনে করা হয় সেটা তো আমরা দেখেছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আমরা যদি শক্তিশালী করতে পারি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে পারি, তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি এফআইডি না থাকলেও আমরা এটা করতে পারবো।
সিপিডি বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে লাইসেন্স পাওয়া তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের কিছু ব্যাংক মৃতপ্রায় হয়ে আছে। এদের চলনশক্তি নেই। এদের জনগণের করের টাকা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এরা মরে যাক। এতে শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাক এসব ব্যাংক।
এ ছাড়া কিছু ব্যাংকের পারফরম্যান্স খারাপ, আরেকটু ধাক্কা লাগলেই মরে যাবে। এগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে পরিচালনার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
সিপিডি আরও বলেছে, চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের হাতেই সাতটি ব্যাংক। এস আলম গ্রুপ একাই ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। একসময় ইসলামী ব্যাংক ভালো ব্যাংক ছিল। দখলের পর তা–ও মুমূর্ষু হয়ে গেছে। এ ছাড়া একক গ্রাহকের জন্য ঋণসীমা নীতি লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংক এননট্যাক্স গ্রুপকে দিয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এভাবে একক গোষ্ঠী যদি এত বেশি পায়, অন্য গ্রাহকেরা কী পাবে?