যেকোনও শর্তে গভর্নর থাকতে চেয়েছিলেন ড. আতিউর রহমান

বাংলাদেশ ব্যাংক-ড. আতিউর রহমানব চেষ্টা করেও শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পারলেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আতিউর রহমান। যেকোনও শর্তে মেয়াদ চলতি বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। তাতে তার ইজ্জত কিছুটা হলেও রক্ষা পেত বলে মনে করেন এই বিদায়ী গভর্নর। লুট হওয়া টাকা ম্যানেজ করে রিজার্ভের সঙ্গে যুক্ত করা ও অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার শর্ত মানতেও রাজি ছিলেন তিনি।  এই শর্তেই ২ আগস্ট পর্যন্ত সময় চাইতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন ড. আতিউর রহমান। বিষয়গুলোই মূলত বোঝাতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্রগুলো জানায়, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে রাত পর্যন্ত সচিবালয়ে বসিয়ে রেখে তার ডাকে সাড়া না দিয়ে গণভবনে যাওয়াকে ভালোচোখে দেখেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই ড. আতিউর রহমান পেলেন না সেই সুযোগ। উদ্ভূত পরিস্থিতি ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে সোমবার গভীর রাতে অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়েও পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনতে পারেননি তিনি। শেষপর্যন্ত পদত্যাগ করতেই হলো তাকে।
জানা গেছে, বরাবরই অর্থমন্ত্রীর প্রতি বিরক্তি ছিল বিদায়ী গভর্নরের। সব সময়ই অর্থমন্ত্রীকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার নিয়োগে অর্থমন্ত্রীর সায় ছিল না। এরপরও প্রধানমন্ত্রীর পছন্দে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পান ড. আতিউর রহমান। সে কারণেই রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গভর্নরের সঙ্গে পরামর্শ করতে অর্থমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দেননি গভর্নর। 

যদিও বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমেই গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে না গিয়ে গভর্নর গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে। ৮৪ বছর বয়সে এ বিষয়টিকে চরম অপমান বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীও গভর্নরের এই আচরণে অসন্তুষ্ট হয়েছেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পরিস্থিতি কিছুটা ঠাণ্ডা করতেই সোমবার গভীর রাতে (রাত সাড়ে ১১ টার দিকে) অর্থমন্ত্রীর হেয়াররোডের সরকারি বাসভবনে (তন্ময়) গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। অর্থমন্ত্রীকে নিজের অনুকূলে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরেরদিন মঙ্গলবার সকালে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলেও নিজের অনূকুলে সায় আনতে পারেননি তিনি।  পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে নিজগৃহে ফিরে যান ড. আতিউর রহমান।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পেয়ে রাতে অনেকের কাছেই ধর্ণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ২ আগস্ট পর্যন্ত এই পদে থাকার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি সবার কাছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষক অ্যামিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গেও এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অধ্যাপক আনসুজ্জামানকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু একজন শিক্ষক হিসেবেই নয়, একজন পরম অভিভাবকও মনে করেন। তাই তাকে দিয়েও তদবির করাতে চেয়েছিলেন ড. আতিউর রহমান।   

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ চুরির ঘটনা দীর্ঘ সময় কাউকে না জানিয়ে লুকিয়ে রেখে প্রায় পার পেয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ঘোল পাকিয়ে সব কিছু ওলটপালট করে ফেলেছে ফিলিপাইনের ইংরেজি দৈনিক দ্য ইনকোয়ার। পত্রিকাটি  বাংলাদেশের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা প্রথম ফাঁস করে। পরে তা দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দুপুরে কোনও কূল-কিনারা না পেয়ে পদত্যাগ করেন ড. আতিউর রহমান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতবড় ঘটনা ঘটলেও তা গোপন রাখা এবং পরবর্তী সময়ে  প্রকাশ পেয়েই গেছে, সেই মুহূর্তে লুট হওয়া সেই টাকা উদ্ধার ও দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে হুট করে দেশ ছেড়ে বাইরে যাওয়াকে ভালো চোখে দেখেননি কেউ। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা চাপা দিতে এবং সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিশেষ সুনজরে থাকতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এমনকি ভারতীয় নেতাদের সুপারিশ আনতে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। আইএমএফ আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিতে চারদিন দিল্লিতে অবস্থানকালে ড. আতিউর রহমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।

অনেকেই বলছেন, এত বড় ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরেও তা ফেলে রেখে দিল্লি যাওয়া গভর্নরের ঠিক হয়নি। এটি তার প্রথম ভুল। অর্থমন্ত্রীর ডাকে সাড়া না দেওয়া দ্বিতীয় ভুল। প্রটোকল অনুযায়ী অর্থমন্ত্রীকে বসিয়ে রেখে অপমান করা তার তৃতীয় ভুল।

উল্লেখ্য, এশিয়ার অর্থনীতির ওপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ভারত সরকার আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দিল্লি গিয়েছিলেন ১০ মার্চ শুক্রবার। এ সময় বাংলাদেশের একটি পত্রিকার ভারতের প্রতিনিধিকে তিনি অর্থ চুরির বিষয় নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার দেন।  সম্মেলনের ফাঁকে দিল্লির তাজমহল হোটেলে তিনি এ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে পত্রিকাটি জানায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানে চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আগামী ২ আগস্ট। ২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল ড. আতিউর রহমানকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০ম গভর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ২ মে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। ২০১৩ সালের ২ মে তারিখে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার তাকে পুনরায় তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়।  সেই অনুযায়ী ড. আতিউরের ২০১৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত এ পদে থাকার কথা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়  থেকে জারি করা  প্রজ্ঞাপনে বলা  হয়েছিল, ‘২০১৩ সালের ১ মে অথবা যোগদানের তারিখ থেকে ড. আতিউরের বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত গভর্নর পদে আতিউর রহমানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলো।’ 

/এসআই/ এমএনএইচ/