সূত্র মতে, গত ৪ ফেব্রুয়ারি, দিবাগত রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের বার্তা বা সংকেত ব্যবহার করে ৩৫টি অর্থ স্থানান্তরের পরামর্শ বা অ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমে। পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারও বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছিলে ৮ কর্মকর্তা। কিন্তু ওইদিন তারা কম্পিউটার চালু করতে পারেননি। কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত প্রিন্টারগুলোও ছিল অকেজো। অথচ ওই ৮ কর্মকর্তার কেউই ঊর্ধ্বতনদের কাছে বিষয়টি জানাননি। আর এর মধ্যেই রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি হয়ে যায়। এ কারণে দায়িত্বে থাকা ওই ৮ কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটনা ঘটলেও প্রায় এক সপ্তাহ পরে জানানো হয় গভর্নর আতিউর রহমানকে। শ্রীলঙ্কার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং করপোরেশনে চলে যাওয়া অর্থ আটকে যায় একটি বানান ভুলের কারণে। ৮ ফ্রেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘স্টপ পেমেন্ট রিকোয়েস্ট’ বার্তা পাঠানোর পর ২০ মিলিয়ন ডলার আটকে দেয় সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০ মিলিয়ন ডলার ফিরে আসে।
প্রসঙ্গত, ২০ মিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ার কৃতিত্ব নেওয়া কর্মকর্তারাই ফিলিপাইনে চলে যাওয়া বাকি ৮১ মিলিয়ন ডলার অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করেন। ওই সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, শ্রীলঙ্কার মতো ফিলিপাইন থেকেও অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০ মিলিয়ন ডলার আটকে দেওয়ার কৃতিত্ব নেওয়া কর্মকর্তারা ৮ ফেব্রুয়ারি ‘অচিরেই অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হবে’ এমন তথ্য দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে। এর ফলে এত বড় ঘটনা চেপে যাওয়া হয়। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ মহল বা অর্থমন্ত্রীকে জানানো জরুরি হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ ফেরত আনার কৌশল হিসেবেই চেপে যায়। কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় এক মাস কেটে গেলে পরিস্থিতির অবনতি হয়।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা যেমন বিষয়টি সময়মতো জানাননি, তেমনি বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লুকিয়ে রেখেছে সরকারের প্রায় সব পক্ষের কাছ থেকেই। অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়নি, জানতেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও। ফলে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এমন পরিস্থিতিতে গভর্নর পদ থেকে মঙ্গলবার সরে যেতে হয় ড. আতিউর রহমানকে।
সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি নিরাপত্তার ঘাটতির কারণেই রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা ঘটেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাবেক সচিব ড. এম আসলাম আলম নিজেও এই অদক্ষতার কথা সাংবাদিকদের বলেছেন।
এর আগে এই কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো জব্দ করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। জব্দকৃত কম্পিউটারগুলোর হার্ডডিস্ক ও সংশ্লিষ্ট সার্ভারের ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। জব্দকৃত কম্পিউটারের হার্ডডিস্কের ফরেনসিক পরীক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে ধারণা করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গত ১২ মার্চ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, যা ঘটেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুম’ শাখাতেই ঘটেছে। এ কারণে ঘটনার জন্য দু’জনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজাভের অর্থ চুরি যাওয়ার এক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ দল তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ঘটনার ছায়া তদন্তে নামে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিলিং রুম শাখায় দু’জন যুগ্ম পরিচালক (জেডি) মর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা হলেন- জোবায়ের বিন হুদা ও মিজানুর রহমান। এছাড়া উপপরিচালক (ডিডি) পদে রয়েছেন লাকী সুলতানা, আবদুল্লাহ সালেহ ও প্রভাষ চন্দ্র সিংহ এবং সহকারী পরিচালক (এডি) পদে রয়েছেন আলমগীর হোসেন, রফিক আহমেদ মজুমদার ও সনজিৎ রায়।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের অধীন ‘ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুম’ শাখা ঘিরেই তদন্ত শুরু হয়েছে। একজন যুগ্ম পরিচালকের (জেডি) নেতৃত্বে ৮ কর্মকর্তা এ বিভাগে কাজ করেন। গোয়েন্দাদের কাছে এখন অনেকটাই স্পষ্ট যে, ‘ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুম’ শাখার মাধ্যমেই অর্থ কেলেঙ্কারির এই ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিকভাবে গোয়েন্দারা ১২ জনের একটি তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও কর্মকর্তা নজরদারিতে থাকতে পারেন। কিন্তু তিনি বা তারা কে তা আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানি, অর্থ চুরির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই।’
তবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মনে করেন, রিজার্ভের টাকা চুরির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাই জড়িত। তাদের যোগসাজশ ছাড়া এতবড় চুরির ঘটনা ঘটতে পারে না।
/এজে/