ভুগছে মধ্যবিত্ত, আরও কষ্টে আছে নিম্নবিত্তরা

উচ্চমূল্যের বাজারে স্বল্প আয়ের মানুষেরা যেন এক অদৃশ্য দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রতিদিনই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম তাদের পিঠ ঠেকিয়ে দিচ্ছে দেয়ালে। লাগামহীন দ্রব্যমূল্য কেড়ে নিচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। উচ্চমূল্যের এই বাজারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। একইসঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়ছে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

এমনই একজন হাফিজুর রহমান। কাঁচাবাজারে অন্যের মালামাল বহনের কাজ করেন। এই কাজ উনি করছেন আনুমানিক ২৫ বছর ধরে। তার প্রতিদিন গড়ে আয় হয় ৫০০ টাকা। অন্যের বাজার বহন করলেও নিজের বাজার করতে হিমশিম অবস্থায় পড়তে হয় তাকে।

নিজের অবস্থার কথা জানিয়ে হাফিজুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৫০০ টাকা দিয়ে সংসার কীভাবে চালাই আমি নিজেই জানি না। আল্লাহই চালায় মনে হয়। আমার বাসায় আমার স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, ছেলের বউ থাকে। দুইটা রুম ভাড়া নিয়ে থাকি। ছেলে আর ছেলের বউ বাসা ভাড়া দেয়। আর আমি খাবার খরচ দেই। কোনও রকমে টিকে আছি। যে টাকা পাই তা দিয়ে চাল কিনবো নাকি মাছ মাংস সবজি কিনবো বুঝতে পারি না। অথচ লাগে সবকিছুই। সঙ্গে তেল লবণ মসলা তো আছেই। কীভাবে চলছি সত্যিই জানি না।’

ছোট পেঁয়াজ ৭৫ টাকা ও বড় সাইজের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে/বাংলা ট্রিবিউন

এমনই এক পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্র ঢাকাকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় থেকে চলা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আর বেশিদিন হয়তো থাকতেও পারবো না। তাই চিন্তা করেছি রোজার ঈদের পর গ্রামের বাড়ি (নেত্রকোনা) চলে যাবো। ওখানে গিয়ে নিজের জমিতে কাজ করে খাবো। ঢাকায় আমরা আর থাকতে পারছি না।’

এই চিত্র কেবল হাফিজুর রহমানের একার না। হয়তো এমন অনেক হাফিজুর রয়েছে এই শহরে কিংবা এই দেশে, যারা উচ্চমূল্যের বাজারের চাপ আর সইতে পারছেন না। প্রতিনিয়তই ভুগছেন নিজেকে নিয়ে, পরিবারকে নিয়ে।

শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজার গিয়ে কথা হাফিজুর রহমানসহ বাজার করতে আসা আরও ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে। জানা যায়, তাদের অবস্থা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আজকের পরিস্থিতি।

মো. ইকবাল হোসেন এসেছিলেন তার স্ত্রীকে নিয়ে বাজার করতে। তিনি একটি ডিমের দোকানে গিয়ে ভাঙা ডিম কিনছিলেন। কেনা শেষে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ইকবালের। সে সময় তিনি জানান ভাঙা হাঁসের ডিম কিনছেন বাসার জন্যই। তিনি বলেন, ‘যখন পারি তখন ভালোটা কিনি আর যখন পারি না তখন যেগুলো ভাঙা ডিম কিন্তু নষ্ট না সেগুলো কিনে নেই।’

আরেক ক্রেতা শারমিন সুলতানা এসেছিলেন বাজার করতে। তিনি বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাসায় ১০০ টাকার ওপরের সবজি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এর নিচে যা পাই তাই কিনি আজকাল। কারণ আমার বাজেটে কুলায় না। আর যদি আরও দাম বাড়ে তাহলে সবজি খাওয়াই বন্ধ করে দিবো।’

বাজারে ডিমের দাম বাড়ছে/বাংলা ট্রিবিউন

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন সাইফুল ইসলাম। তিনি মূল বাজার থেকে না কিনে কিনছিলেন রাস্তায় ঝুড়ি নিয়ে বসা বাজার থেকে। মূলত বাজারের ভেতরের থেকে বাইরে বসা এই বাজারে সবজির দাম কিছুটা কম।

সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘বাজারে জিনিসের দাম মানুষের নাগালের বাইরে। সবজির দাম তো অত্যধিক, মাছ-মাংসের কথা তো বাদই। মানুষ যে মাছ-মাংস না খেয়ে সবজি খাবে সেটার উপায়ও নাই। এতো দাম কিভাবে হয়? এটার পেছনে অবশ্যই সিন্ডিকেট আছে। আমি আজকে এক আঁটি লাল শাক কিনেছি ২০ টাকা দিয়ে। এটার দাম কি এমন হওয়ার কথা ছিল?  এমন না যে কৃষক বেশি দামে বিক্রি করছে। তারা হয়তো ৫ টাকা করে বিক্রি করে। কিন্তু আমাদের কাছে আসতে হয়ে যায় ২০ টাকা। পরিবহন খরচ কি এতোই বেশি!’

তিনি আরও বলেন, ‘বাজারের এই পরিস্থিতিতে যারা নিম্ন আয়ের মানুষ আছে তাদের ঢাকায় থাকা অসম্ভব হয়ে গিয়েছে। আমি মনে করি তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাওয়া উচিত, তাহলে যদি একটু স্বস্তি হয়। ঢাকায় খরচ বহন করে বাস করা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। আমি নিজেই আমার সঞ্চয় ভেঙে চলতে শুরু করেছি। পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয় তাহলে হয়তো আমাকেও গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অথবা পরিবারকে পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে একা এখানে থাকতে হবে।’

এমনই চিত্র দেখা যাচ্ছে আমাদের নগরীতে। স্বল্প আয়ের মানুষগুলো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা জানে কি হতে যাচ্ছে। তাদের জন্য কেবল দরকার সকলের জন্য সহনশীল দ্রব্যমূল্য। যেখানে খাবার নিয়ে ভুগতে হবে না।

আজও সবজির দাম আকাশছোঁয়া, কমেছে ক্রেতাদের কেনাকাটা

আজকের বাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় টমেটো ১৪০-১৬০ টাকা, দেশি গাজর ৮০ টাকা, চায়না গাজর ১২০ টাকা, লম্বা বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১৫০-১৬০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা, উচ্ছে ১০০ টাকা, করল্লা ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১০০-১২০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০-১২০ টাকা, পটল ৮০- ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি  ৮০ টাকা, কচুরমুখী  ৬০-৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৬০- ২০০ টাকা, ধনেপাতা (মানভেদে) ২০০-৪০০ টাকা, শসা (হাইব্রিড) ৮০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০-৬০ টাকা করে  বিক্রি হচ্ছে। আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৮০-১২০ টাকা, চাল কুমড়া ৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।  আর প্রতি হালি কাঁচা কলা ৪০-৫০ টাকা। এছাড়া, প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ২০-৪০ টাকা করে।

লাগামহীন দ্রব্যমূল্য কেড়ে নিচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ/বাংলা ট্রিবিউন

সবজি বিক্রেতা মো. সাকিব বলেন, ‘বাজারে সবজির দাম এখন বাড়তিই। বেশি দাম হওয়ায় মানুষ এখন কম কিনে। কেউ যদি একটা সবজি আগে দুই কেজি কিনতো এখন সে কিনে এক কেজি। আর যে এক কেজি কিনতো সে কিনে আধা কেজি। আর যাদের আয় কম তারা আমাদের কাছে থেকে কিনে না। তারা রাস্তায় যারা ঝুড়ি নিয়ে বসে তাদের থেকে কিনে। কারণ তাদের ভালোমন্দ আর দেখা লাগে না। তাদের দরকার কম দাম। সত্যি বলতে কিছু করার নাই মানুষের। অনেক দাম। কম দাম হলে আমাদের জন্যও ভালো হতো। আমাদের বিক্রি বেশি হতো।’

আলু-পেঁয়াজের বাজার রয়েছে অপরিবর্তিত

গত সপ্তাহের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের আলু পেঁয়াজের বাজারের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। আজকের বাজারে আকার ও মানভেদে ক্রস জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫- ৮০ টাকায়। এর মধ্যে ছোট পেঁয়াজ ৭৫ টাকা ও বড় সাইজের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা করে। দেশি পেঁয়াজ ৮০ টাকা, লাল আলু ২০-২৫ টাকা, সাদা আলু ২০-২৫ টাকা, বগুড়ার আলু ৩৫ টাকা, দেশি রসুন ১০০-১২০ টাকা, চায়না রসুন ১৪০-১৫০ টাকা, চায়না আদা ২০০ টাকা, ভারতীয় আদা মান ভেদে ১৬০-১৮০ দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাছ- মাংসের বাজারও চড়া

আজকেও মাছ মাংসের বাজার রয়েছে চড়া। সব ধরনের মাছ এবং মাংসই বিক্রি হচ্ছে উচ্চমূল্যে। বিক্রেতারা বলছেন চড়া বাজারে তারা যেমন কমিয়ে কিনছেন আবার ক্রেতারাও কিনছেন কমিয়েই।

আজকের বাজারে ইলিশ মাছ আকার ও ওজন অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকা, রুই মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, কাতল মাছ ৪০০-৬০০ টাকা, কালবাউশ ৫০০-৮০০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৮০০-১,৩০০ টাকা, কাচকি মাছ ৬০০-৮০০ টাকা, কৈ মাছ ২৫০ টাকা, পাবদা মাছ ৪০০-৫০০ টাকা, শিং মাছ ৪০০- ১,২০০ টাকা, টেংরা মাছ  ৬০০-১,০০০ টাকা, বেলে মাছ ৮০০-১,২০০ টাকা, মেনি মাছ ৭০০-৮০০ টাকা বোয়াল মাছ ৫০০-১,২০০ টাকা, রূপচাঁদা মাছ ৮০০-১,৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে বেড়েছে সব ধরনের মুরগির দাম/বাংলা ট্রিবিউন

মাছের বিক্রেতা গিয়াসউদ্দিন বলেন, ‘আগে যারা মাছ নিতো এক কেজি এখন নেয় আধা কেজি। এরকম অনেক কাস্টমার আছে আমার। আমিই দেখেছি যারা ৪/৫টা করে ইলিশ নিতো এখন নেয় দুইটা বা একটা। দাম বাড়তি মানুতো আর খাওয়া বন্ধ করতে পারে না কিন্তু কমিয়ে দিতে পারে। তারা সেটাই করেছে।’

নিজের ব্যবসার অবস্থা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে আমরাই ইলিশ কিনতাম ২৫/৩০টা বা তারও বেশি। এখন কিনি ১২/১৫ টা। কারণ এতো দামে আমরা কিনে ঠিক মতো বিক্রি করতে পারি না।’

এছাড়া আজকে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ টাকা কেজি দরে। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১,২০০ টাকা কেজি দরে। ব্রয়লার মুরগি ১৭৩- ১৮০ টাকা, কক মুরগি ২৯৫-৩০০ টাকা, লেয়ার মুরগি ২৯০ -৩২০ টাকা, দেশি মুরগি ৫৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি ডজন মুরগির লাল ডিম ১৩০- ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিম ১২০-১২৫ টাকা, হাঁসের ডিম ২২০  টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। 

এক্ষেত্রে দেখা যায় আজকে ব্রয়লার মুরগিসহ অন্যান্য মুরগির মাংস বিক্রি হচ্ছে চড়া দামেই। গরু ও খাসির মাংসও রয়েছে উচ্চ দামে অপরিবর্তিত।

বাজারে ইলিশ মাছ আকার ও ওজন অনুযায়ী এক হাজার থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে/বাংলা ট্রিবিউন

ডিমের দাম বাড়ছে জানিয়ে সাইদ ডিমের ঘরের বিক্রেতা মো: সামিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজকে ডিমের দাম বেড়েছে। গতকাল ১০০ ডিম কিনেছি এক হাজার টাকা করে কিন্তু আজকে কিনতে হয়েছে ১,০২০ টাকা করে। এখন বেচাকিনি বাড়ছে বলে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন চাহিদা কম থাকে তখন দাম কমিয়ে দেয় তারা।’

অপরিবর্তিত মুদি দোকানের পণ্যের দামও

আজকের বাজারে মুদি দোকানের পণ্যের দামে কোন পরিবর্তন আসেনি। কেবল প্রতি কেজিতে ডাবলির দাম কমেছে ১০ টাকা করে। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত।  

আজকে প্যাকেট পোলাওয়ের চাল ১৫৫ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চাল মান ভেদে ৯০-১৩০ টাকা, ছোট মুসরের ডাল ১৫৫ টাকা, মোটা মুসরের ডাল ১০৫ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা,  ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারি ডাল ১২০ টাকা, বুটের ডাল ১২০ টাকা, ৫৫ টাকা, ছোলা ১১০ টাকা মাসকলাইয়ের ডাল ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৭২ টাকা, কৌটাজাত ঘি  ১,৪৫০ -১,৫৫০ টাকা, খোলা ঘি ১,২৫০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১১০ টাকা, খোলা চিনি ১০৫ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৩০ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১২০ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এলাচি ৪৭৫০ টাকা, দারুচিনি ৫০০ টাকা, লবঙ্গ ১,২৮০ টাকা, সাদা গোল মরিচ ১,৩৫০ টাকা ও কালো গোল মরিচ ১,১০০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।