চ্যালেঞ্জে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মধ্যবিত্তের সামনে আরও কঠিন দিন

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বিবেচনায় নিলে সেই লক্ষ্য অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ। সীমিত আয়ের চাকরিজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ক্রমেই জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আয় বাড়ছে না, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বেড়েই চলেছে। ফলে অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, খাদ্য তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে, এমনকি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও পিছিয়ে দিতে হচ্ছে।

১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে। অর্থাৎ শুধু খাবার নয়, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবার খরচও দ্রুত বাড়ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি। গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ হলেও শহরে তা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংসারে নিত্য টানাপোড়েন

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা নুর আলমের মতো হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা এখন প্রায় একই। মাসিক ৪৫ হাজার টাকা বেতন পেলেও পরিবারের চার সদস্যের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে।

বাসাভাড়া, ইউটিলিটি বিল, সন্তানের স্কুল ফি ও যাতায়াত ব্যয় মেটানোর পর মাসের খাবারের জন্য হাতে থাকে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। অথচ ডাল, তেল, মুরগি, ডিম, চিনি ও সবজির দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

সম্প্রতি সন্তানের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাকে সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে। এখন মাছ, ফল কিংবা দুধ কেনাও বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; দেশের অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের বাস্তব চিত্র।

কেন বাড়ছে মূল্যস্ফীতি

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। ফলে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সেবাখাতের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রভাব

অর্থনীতিতে জ্বালানি হচ্ছে প্রায় সব পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহনের প্রধান উপাদান। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।

কৃষক সেচের জন্য বেশি খরচ করেন, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব জুন ও জুলাই মাসে বাজারে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ-মাংসসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম নতুন করে বাড়তে পারে।

আয় বাড়ছে কম, কমছে প্রকৃত মজুরি

মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সমান হারে বাড়ে না।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।

অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে। ফলে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে কিংবা ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।

বাজার সিন্ডিকেট কি এখনও সক্রিয়?

নতুন সরকারের কাছে জনগণের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা।

সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকির মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু খুচরা বাজারে এখনো তার দৃশ্যমান সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, খুচরা পর্যায়ে অভিযান পরিচালনা করলেও বড় আমদানিকারক, পাইকারি আড়ত এবং শক্তিশালী করপোরেট গোষ্ঠীর ওপর কার্যকর নজরদারি এখনও যথেষ্ট নয়।

অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মুনাফা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখছে।

সামনে আরও কঠিন সময়

বাজেট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী অর্থবছরেও তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করা হতে পারে।

ফলে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু সুদের হার বাড়ানো বা মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহ চেইনের অদক্ষতা দূর করা, চাঁদাবাজি বন্ধ করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বর্তমান বাস্তবতা বলছে সেই পথ মোটেও সহজ নয়।

মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা।

ফলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে। কারণ দ্রব্যমূল্যের চাপই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, আর বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনাই হবে সরকারের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।