অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো জ্বালানি। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্পায়ন, বিদ্যুতায়ন এবং দৈনন্দিন জীবনের এক বিরাট অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ও তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গৃহস্থালির চুলা থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিবহন খাত পর্যন্ত এই সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছে— যা সার্বিক অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি। এতে করে চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা।
সরবরাহ ঘাটতি ৪৪ শতাংশ
দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি সামিট গ্রুপ। গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
তিতাস গ্যাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের দৈনিক প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আগে পাওয়া যাচ্ছিল প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পাঞ্চল, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশে গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। বিগত এক দশকের ব্যবধানে দেশীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেলেও গত কয়েক দশকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। বিশেষ করে সমুদ্রে (অফশোর) বিশাল সম্ভাবনাময় অঞ্চল থাকার পরও পর্যাপ্ত উত্তোলনের উদ্যোগের অভাব ছিল। নিজস্ব সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে আমদানিকৃত এলএনজি’র ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে কোনও একটিতে কারিগরি ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণজনিত বিভ্রাট ঘটলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস নামে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ প্রবাহকে অনিয়মিত করে তুলেছে।
গ্যাস সরবরাহ সচল হওয়ায় অনিশ্চয়তা
গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে পরিবহন সেক্টর, বাসাবাড়িসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি কবে নাগাদ মেরামত হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে সরকার আশাবাদী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, আমাদের চাহিদা অনুযায়ী কিন্তু আমরা সরবরাহ করতে পারছি না। তাহলে চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে যে গ্যাপটুকু রয়েছে সেই গ্যাপটা মিনিমাইজ করবার জন্য প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়েছেন।
তিনি বলেন, এক্সেলারেট এনার্জির রিজিওনাল হেড আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাপ্লাই করতেন। আমরা আশা করছি, আগামী সপ্তাহের প্রথমে এখান থেকে আমরা ইনশাল্লাহ ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট তারা গ্যাস সরবরাহ করতে সমর্থ হবেন এবং পরের সপ্তাহের শেষের দিকে বাকিটা অর্থাৎ পুরো এফএসআরইউ তারা ফাংশনাল করতে পারবেন।
তিনি জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
কেন বারবার এমন সংকট?
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি নয়— বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা। গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ছয় বছরে দেশীয় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। ফলে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যেকোনও একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় কোনও অতিরিক্ত সক্ষমতা বা বিকল্প ব্যবস্থা নেই। তাই একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্প খাতসহ পুরো অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা তৈরি না করলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।
বাসাবাড়িতে জ্বলছে না চুলা
গ্যাস না থাকায় ভোর থেকে রাত অবধি বাসা বাড়িতে গ্যাসের অভাবে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছেন মোহাম্মদপুরের মানুষ। প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাস-সংকটে আছেন তাঁরা। শুরুতে জলাবদ্ধতার কারণে পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস বন্ধ হয়ে যায় বেশ কিছু আবাসিক এলাকায়। শেখেরটেক এলাকায় এখনো এই সমস্যা কাটেনি। এর মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ কমায় অন্যান্য এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। গ্যাসের চাপ না বাড়লে পাইপলাইনে পানি বের করা কঠিন। বাসাবাড়িতে কেউ কেউ বিদ্যুৎ-চালিত চুলা কিনছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।
মনসুরাবাদের গৃহিণী আসমা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন চলা যায়? রামপুরার মোর্শেদা সেতু বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে, কোনও রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত ৯টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্য কোনো রান্না করা সম্ভব হয়নি।
বাড্ডা এলাকার মার্জিয়া আক্তার বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
নাকাল পরিবহন খাত, ভোগান্তিতে চালক-শ্রমিকরা
চলমান গ্যাস সংকটে ভোগান্তির চিত্র রাজধানীর গ্যাস পাম্পগুলোতেও। ফিলিং স্টেশনের বাইরে যানবাহনের লম্বা সারি। তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না চালক-শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ভাড়ায় চালিত গাড়ি চালকরা। ফলে পুরো পরিবহন খাতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পাম্পগুলোও। দ্রুত সমাধানের আকুতি জানিয়েছেন পাম্প শ্রমিকরা। তবে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, এলএনজি সরবরাহ নির্বিঘ্ন হলে এ সংকট কেটে যাবে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি পাম্পে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় গ্যাস বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা মোতাবেক গ্যাস পাচ্ছেন না সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালকরা। পাম্পগুলো থেকে মাত্র ২০০ টাকার গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে দিনের অর্ধেক সময় অলস ব্যয় করে গাড়ির জমা ও পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। টানা এই সংকটে ক্রমান্বয়ে ভোগান্তি বাড়ছে যানবাহন নির্ভর অন্য কর্মজীবীরাও। তারা বলেন, গ্যাসের জন্য পাম্পের বাইরে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। তবুও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না তারা। এতে ফের এসে গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা বলেছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় আয় রোজগারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে তাদের। গ্যাসের অভাবে ভাড়ার গাড়ি চালাতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। পাম্পের কর্মচারীরাও বলেন, চাহিদা অনুসারে গ্যাস দেওয়ার মতো মজুত নেই তাদের কাছে। সরবরাহ কমে আসায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আর্থিক ক্ষতি এড়াতে পাম্প বন্ধও রাখছেন।
রাইড শেয়ারিংয়ে ভাড়ায় গাড়ি চালান গাবতলী এলাকার আশরাফ আলী। তিনদিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল আশরাফ আলী বলেন, গাবতলীতে অনেক পাম্প, কিন্তু বেশিরভাগই বন্ধ। তার ভাষ্য, শুধু গাবতলীই নয়, বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেই। যেগুলোতে আছে, চাপ খুব কম। সে কারণে সিলিন্ডারের অর্ধেক পরিমাণও গ্যাস ঢুকছে না।
তিনি বলেন, সাভার এলাকার পাম্পগুলোও সব বন্ধ। আজকে একটা ট্রিপ নিয়ে গেছিলাম ডেমরা। স্টাফ কোয়ার্টারে (পাম্পে) লাইনে দেয়ে দাঁড়াইতে গেলাম। দেখি, বিশাল সিরিয়াল। কিছুক্ষণ পর পাম্প এমনিই বন্ধ হবে। বাধ্য হয়ে খালি ট্যাংক নিয়েই এখন বাসার দিকে রওনা দিছি।’ কল্যাণপুরের হাফিজা সিএনজি পাম্পের কর্মী ফিরোজ বলেন, ‘সারাদিন কমপ্রেসার মেশিন চালাইয়াও প্রেসার উঠতাছে না। লাইনে গ্যাসই নাই।’
এদিকে গ্যাস সংকটে ঢাকার রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল কমে গেছে, বেড়ে গেছে ভাড়া। চালক জহির মোল্লা বলেন, ‘আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগতেছে পাম্পেই। তাও যে গ্যাস ঢুকে, তাতে আধা বেলা গাড়ি চালান যাচ্ছে না। এজন্য ড্রাইভাররা গাড়িই বাইর করছে না।’

পেট্রোনাসের কাছে এলএনজি চেয়েছে বাংলাদেশ
জ্বালানি সহযোগিতা চেয়ে মালয়েশিয়ায় ফোন-চিঠি প্রধানমন্ত্রীর
গ্যাস সংকট, রান্নায় ভরসা এখন বৈদ্যুতিক চুলা
গ্যাস নিয়ে আরও দুঃসংবাদ






