অর্থনীতিতে নীরব সংকট, ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধি

দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন বিনিয়োগের স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ ঋণসুদ, খেলাপি ঋণের চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবেই ঋণপ্রবাহ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জুন শেষে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত বছরের জুলাইয়ে যেখানে এ হার ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ, এক বছরের ব্যবধানে তা কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি করোনা মহামারির সবচেয়ে কঠিন সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার অর্থ হলো অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের গতি শ্লথ হওয়া। এর প্রভাব উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানে পড়তে পারে।

নতুন ঋণের চেয়ে আদায়ে জোর

ব্যাংকারদের ভাষ্য, বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক নতুন ঋণ বিতরণের পরিবর্তে পুরোনো ঋণ আদায়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। খেলাপি ঋণের চাপ এবং অনেক ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে বড় ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তারা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ এখন কার্যত এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকটকাল অতিক্রম করছে। রপ্তানি চাহিদা কমে যাওয়া, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, গ্যাস সংকট এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ঋণের চাহিদাও কমেছে এবং রপ্তানি আদেশ কম থাকায় আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলাও প্রায় স্থবির।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, ব্যাংক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা

ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু উচ্চ ঋণসুদ নয়, একাধিক কাঠামোগত সমস্যার কারণে নতুন বিনিয়োগ কমে গেছে।

তাদের ভাষ্য, বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট শিল্প উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা। অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোথাও নতুন কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীও জানিয়েছে, বিনিয়োগ সম্পন্ন হলেও গ্যাস-সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এর পাশাপাশি ডলারের অস্থিরতা, কাঁচামাল আমদানির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণেও উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

খেলাপি ঋণের চাপ

নতুন ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থানের আরেকটি কারণ খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

এ অবস্থায় অনেক ব্যাংক বড় শিল্পঋণের পরিবর্তে তুলনামূলক কম ঝুঁকির এসএমই ঋণ কিংবা সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরও কমছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান নিম্ন ঋণ প্রবৃদ্ধিকে শুধু নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।

তাদের মতে, আগের সরকার আমলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলেও ওই ঋণের বড় অংশ প্রভাবশালী গ্রাহকদের কাছে গিয়েছিল। পরে এসব ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপিতে পরিণত হয় এবং অর্থ পাচারের ঘটনাও সামনে আসে।

তাদের ভাষ্য, এ কারণে এখন ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অনেক বেশি সতর্ক। ফলে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম হলেও ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সরকারের উদ্যোগ, কর্মসংস্থান ও সামনে কী

অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নীতিসুদ হার (রেপো রেট) ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। প্রায় ছয় বছর পর এটিই প্রথম নীতিসুদ কমানোর সিদ্ধান্ত।

এর ফলে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে এবং ধীরে ধীরে ঋণের সুদও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পসুদের প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ঋণসীমা শিথিল করা হয়েছে, যাতে বড় বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থায়ন সহজ হয়।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সুদহার কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, করব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগে বড় পরিবর্তন আসবে না।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। কারণ দেশের নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই সৃষ্টি হয় বেসরকারি খাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, নীতিসুদ কমানো, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পরিবেশের উন্নতির মাধ্যমে আগামী কয়েক মাসে ঋণপ্রবাহ বাড়বে। চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অর্থবছর শেষে ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না; বাস্তব খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তাদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, নীতিগত স্থিতিশীলতা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ঋণপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না।