একসময় দেশের সবচেয়ে লাভজনক, শক্তিশালী এবং আস্থাভাজন বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অন্যতম ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। কোটি কোটি গ্রাহকের আস্থা, দেশের সবচেয়ে বড় আমানতভিত্তি এবং বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্কের কারণে ব্যাংকটি ছিল বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু কয়েক বছরের অনিয়ম, বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় আজ সেই ব্যাংকই ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটি— পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া আর কতদিন চলবে ইসলামী ব্যাংক?
দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে ব্যাংকটি চেয়ারম্যান, পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ এবং নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ দেওয়া একজন প্রশাসক কার্যত পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছেন। দৈনন্দিন কার্যক্রম চললেও বড় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, করপোরেট অর্থায়ন, আমদানি ঋণপত্র (এলসি), ঋণ পুনঃতফসিল, চলতি মূলধন অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্তে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহক ও উদ্যোক্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্যাংক কিছু সময় প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া চলতে থাকলে গ্রাহকের আস্থা, ব্যবসায়িক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি— সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
লোকসানের পাহাড়ে ইসলামী ব্যাংক
ব্যাংকটির সর্বশেষ অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৩১৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৬৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।
শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় প্রান্তিকেই পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রথম প্রান্তিকে ছিল ২৭৪ কোটি টাকা। ফলে বছরের প্রথম ছয় মাসে পরিচালন লোকসান বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই লোকসান হঠাৎ তৈরি হয়নি। কয়েক বছর ধরে বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে মুনাফা পরিশোধের চাপ ব্যাংকটিকে ধীরে ধীরে এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
আস্থার ব্যাংক থেকে সংকটের ব্যাংক
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ইসলামী ব্যাংক যখন আগের পরিচালনা কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হতো, তখন ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য ছিল শক্তিশালী। মুনাফা, মূলধন, তারল্য এবং গ্রাহক আস্থা— সব ক্ষেত্রেই এটি দেশের সেরা ব্যাংকগুলোর একটি ছিল।
পরবর্তীকালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নিরীক্ষা ও তদন্তে উঠে এসেছে, নামে-বেনামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ, অনিয়ম এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।
একইসঙ্গে পরীক্ষা ছাড়াই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগও ব্যাংকটির সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কেন পর্ষদহীন ইসলামী ব্যাংক
গত মে মাসে চেয়ারম্যান পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিলে একাংশ গ্রাহক ও কর্মকর্তার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর টানা বিক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ এবং গ্রাহকদের ব্যাপক হারে আমানত উত্তোলনের ফলে ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়ে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অনেক শাখায় বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হয়। পে-অর্ডার গ্রহণে অনীহা, আরটিজিএস লেনদেনে জটিলতা এবং আন্তঃব্যাংক আস্থার সংকটও দেখা দেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক ধাপে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত তারল্য সহায়তা দেয়। শেষ পর্যন্ত গত ১৪ জুন পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দৈনন্দিন ব্যাংকিং চলছে, কিন্তু বড় সিদ্ধান্তে ধীরগতি
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা বলছেন, দৈনন্দিন লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে। আমানতও ধীরে ধীরে ফিরছে। তবে করপোরেট গ্রাহকদের বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, এলসি, চলতি মূলধন, ঋণ পুনঃতফসিল এবং বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে আগের মতো গতি নেই।
করপোরেট গ্রাহকদের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন, কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
একজন পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা জানান, চলতি মূলধনের অভাবে হাজার হাজার শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সময়মতো এলসি খুলতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
আমানত কমেছে ২১ হাজার কোটি টাকা
চলতি বছরের মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জুন শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক প্রান্তিকেই আমানত কমেছে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা।
অপরদিকে অনাদায়ী মুনাফা যুক্ত হওয়ায় ঋণের স্থিতি বেড়েছে। এতে ঋণ-আমানত অনুপাত আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যার প্রায় অর্ধেকই খেলাপি হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রশাসকের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে
প্রশাসক মোহাম্মদ জহির হোসেনের দাবি, পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। আতঙ্ক কমেছে, নতুন আমানত বাড়ছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাও কমেছে। তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এবং যৌক্তিক আবেদনগুলো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। তবে অযৌক্তিক সুবিধা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।
ভারপ্রাপ্ত এমডি মো. আলতাফ হুসাইনও বলেছেন, করপোরেট আমানত সংগ্রহে কিছুটা সমস্যা হলেও ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো ব্যাংকে দীর্ঘ সময় নেতৃত্বের শূন্যতা থাকলে তা গ্রাহক আস্থার জন্য ইতিবাচক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরীর মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। এতে করপোরেট গ্রাহকদের আস্থা বাড়বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত হবে এবং ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সংকট শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার কার্যকারিতারও একটি বড় পরীক্ষা।
প্রশাসকের মাধ্যমে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হলেও দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ ছাড়া পরিচালিত হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে প্রায় তিন কোটি গ্রাহক, লক্ষাধিক কোটি টাকার আমানত, বিশাল করপোরেট গ্রাহকভিত্তি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বহনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য দ্রুত ও কার্যকর নেতৃত্ব অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে সেটি কবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে প্রতিদিনই প্রশ্নটি আরও জোরালো হচ্ছে— প্রশাসকের ওপর ভর করে ইসলামী ব্যাংক আর কতদিন চলবে? নাকি দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য, দক্ষ ও স্বচ্ছ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেই দেশের সবচেয়ে বড় এই ব্যাংককে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনা হবে? সেই উত্তরই এখন জানতে চাইছেন কোটি কোটি গ্রাহক, উদ্যোক্তা এবং পুরো ব্যাংকিং খাত।








