দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে। এর আগে জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমেছে দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
জুলাইয়ের এই মূল্যস্ফীতি গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপর আর এত কম মূল্যস্ফীতি দেখা যায়নি।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম কমে আসার প্রভাব ছিল বেশি।
খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বড় স্বস্তি
জুলাইয়ে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। জুনে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে ১ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
এটি ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন খাদ্য মূল্যস্ফীতি। ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির এই পতনই জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৯ শতাংশের ওপরেই খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি
খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। জুনে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ, যা জুলাইয়ে কমে হয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে কমেছে দশমিক ৩৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনও বেশ উঁচু। টানা কয়েক মাস ধরে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় আসেনি।
জুলাইয়ের ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের মার্চের পর সর্বনিম্ন। মার্চে এ হার ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। গত বছরের জুলাইয়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
শহরের চেয়ে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি
বিবিএসের পরিসংখ্যানে গ্রাম ও শহরের মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সামান্য পার্থক্য দেখা গেছে। জুলাইয়ে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর শহরাঞ্চলে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।
অর্থাৎ শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা বেশি ছিল।
সরকারের লক্ষ্যের চেয়ে এখনও বেশি
মূল্যস্ফীতি কমলেও তা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে এখনও অনেক বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এলেও তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দশমিক ৮২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্বস্তি ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কমেছে মূল্যস্ফীতি, তবে স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি
সার্বিকভাবে জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ঘরে নেমে আসা এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন হওয়া ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কমেছে। ফলে দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এক মাসের পরিসংখ্যানে পুরোপুরি দূর হওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি আরও কমিয়ে সরকারের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যের কাছাকাছি নেওয়াই এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।