শনিবার ঢাকার ব্রাক সেন্টার ইন-এ প্রতিবেদন প্রকাশকালে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি এবং পোশাক খাতের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
গবেষণায় মোট ১৩শ জন অংশ নেন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগেরই বয়স ২১ থেকে ৩০-এর মধ্যে। আর মৃত শ্রমিকের পরিবারের ক্ষেত্রে ৫শ পরিবার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিবেদন বলছে, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের ২০ ভাগেরই পরিবারে ২ জন করে নির্ভরশীল সদস্য আছেন। ২৩ ভাগের আছে ৪ জন করে নির্ভরশীল সদস্য। গবেষণার ফলে দেখা যায়, বেঁচে থাকা শ্রমিকদের প্রায় ৭৯ শতাংশ নিজে ব্যবসা করতে চান। মাত্র ৫ ভাগ শ্রমিক আবারও পোশাক শিল্পে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শ্রমিক নাজমা আক্তার বলেন, আমি ফ্যান্টম ফ্যাক্টরিতে কাজ করতাম। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর একটা বিকট শব্দে সব ভেঙে পড়ল। শরীরে প্রচণ্ড আঘাত পাই। আমি আর গার্মেন্টসে ফিরে যেতে চাই না। ঘটনার পর তিন ধাপে একলাখ ৪৫ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে জানান নাজমা। তিনি এখনও মাথায় সমস্যা বোধ করেন বলেও জানান।
আরও পড়তে পারেন: পুলিশ থেকে ক্ষমা আদায়কারী সাহসী হাবিবা জান্নাতের কথা
রানা প্লাজায় থাকা ইথার টেকস্ট এ কাজ করা রফিক খান বলেন, ‘আমি এখনও ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। পরবর্তী সময়ে সাভারে কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে কিন্তু আমি আর গার্মেন্টসে কাজ করতে চাই না।
অ্যাকশনএইডের এই প্রতিবেদনে শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্ষতিপূরণ দিতে মালিক, ক্রেতা, সরকার নানা সময় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ক্রেতারা যে টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন, তারা বলছেন, সেটা দেওয়া হয়ে গেছে। তবে শ্রমিকরা যে টাকা পেয়েছেন, সেটা আসলে তাদের কাজে আসছে না। ক্ষতিপূরণে শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আইন ও সালিশ কেন্দ্রে চেয়ারপারসন হামিদা হোসেন বলেন, শ্রমিকরা যা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন, তাকে আসলে ক্ষতিপূরণ বলা যাবে না। বর্তমান আইনে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকরা যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় পড়েছেন, তাতে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা জরুরি। তিনি বলেন, এখন শ্রমিকদের উন্নয়নে নানা কাজ করা হচ্ছে। তবে তার সমন্বিত কোনও উদ্যোগ নেই।
প্রতিবেদনে নানা বিশ্লেষণ করে বলা হয়, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন মানদণ্ডে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলো এটা এখনও শ্রমিকদের কাছে পরিষ্কার না। এছাড়া আগস্ট ২০১৫ পর্যন্ত রেজিস্ট্রিকৃত ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ৪৬৪ যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশ ইতিবাচক। এখন দেখার বিষয় হলো এই সংগঠনগুলো কতটা স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করছে আর অন্য ফ্যাক্টরিগুলো এই সুযোগ পাচ্ছে কিনা।
আরও পড়তে পারেন: আইএস সদস্য জান্দাল ও ইব্রাহিমের খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ফারাহ্ কবির বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ নিয়ে বিভিন্নভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপরও গবেষণার ফল আমাদের আশাবাদী করছে না। আমাদের কাজ ও উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না। তিন বছর পার হয়ে গেল। এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের যা দেওয়া হয়েছে, সেটা আর্থিক সহযোগিতা। ক্ষতিপূরণ বললেই শ্রমিকের মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক বিষয়গুলোকে নিয়ে কাজ করতে হবে। আর এজন্য সমন্বয়টা খুবই জরুরি।
অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ম্যানেজার নুজহাত জেবিন। গবেষণার প্রথম ভাগে রানা প্লাজার দুর্ঘটনার শিকার শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি, দ্বিতীয় ভাগে পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, গবেষণার শেষে পোশাক খাতের উন্নতিতে কিছু সুপারিশ করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে আছে: একটি জাতীয় ক্ষতিপূরণ কাঠামো করা; নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন ও এ সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা; কারখানায় স্বাধীনভাবে সংগঠন করার অধিকার নিশ্চিত করা; শ্রম আইনের দুর্বল দিকগুলো সংশোধন করা।
/ইউআই/এমএনএইচ/