প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, অর্থনীতি কি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিললেও সংকট এখনও কাটেনি। প্রবাসী আয় বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি ফিরেছে এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমেছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি এখনও দুর্বল, মূল্যস্ফীতি উঁচু, ব্যাংক খাতে বড় সমস্যা রয়ে গেছে, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটেনি। এর সঙ্গে জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদনেও বাধা হয়ে আছে।

সাম্প্রতিক পূর্বাভাসগুলোও বলছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও সেই গতি ধীর। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’-এ চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। জুলাইয়ে সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় ৪ শতাংশ কিছুটা বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়ছে, যদিও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার এখনো বহিরাগত ধাক্কা ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কার দ্রুত করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রমাণ?

শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দেখলে গত বছরের তুলনায় কিছুটা উন্নতির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিবির হিসাবে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে হতে পারে ৪ শতাংশ।

কিন্তু এই ৪ শতাংশও আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কম। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য ৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আইএমএফ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। ফিচ রেটিংসের পূর্বাভাসও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতি কিছুটা গতি পেলেও কাঙ্ক্ষিত গতিতে ফিরতে পারেনি।

এডিবির হিসাবে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে। উচ্চ ঋণব্যয়, বেসরকারি খাতে সীমিত ঋণপ্রবাহ, জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক বাজারে দুর্বল চাহিদা শিল্প ও বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে থাকবে।

আসল সমস্যা বিনিয়োগে

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়া। কিন্তু এখানেই বড় দুর্বলতা। সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, নীতির অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল বাজার চাহিদা, সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, শুধু সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ ও নীতির ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হবে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যাংক খাতে অর্থ থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ছে না। অর্থাৎ সমস্যা শুধু অর্থের জোগানে নয়, বিনিয়োগের পরিবেশেও।

একজন উদ্যোক্তা নতুন কারখানা করবেন কি না, তা শুধু ঋণের সুদের ওপর নির্ভর করে না। তিনি দেখেন বিদ্যুৎ-গ্যাস নিয়মিত পাবেন কি না, বাজারে চাহিদা আছে কি না, করনীতি কতটা স্থিতিশীল, ব্যবসা পরিচালনায় কতটা ঝামেলা এবং আগামী দিনে নীতি বদলে যাবে কি না।

এই জায়গায় আস্থা না ফিরলে অর্থনীতির গতি বাড়ানো কঠিন।

জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির দ্বৈত চাপ

অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। এডিবি চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জুলাইয়ে এ পূর্বাভাস ছিল ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থার চাপ এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় মূল্যস্ফীতিকে উঁচু রাখতে পারে।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, এতে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তিনি সরকারের ব্যয় ও ঋণের চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা নিয়েও সতর্ক করেছেন।

জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচই বাড়ে না। কৃষি থেকে শিল্প, কারখানা থেকে বাজারজাতকরণ, সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

তাই রেমিট্যান্স বাড়লেও মানুষের প্রকৃত স্বস্তি কতটা ফিরেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আয় বাড়ার পাশাপাশি যদি খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে, তাহলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা খুব বেশি বাড়ে না।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটেনি

অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি এখনো ব্যাংক খাত। উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। দুর্বল ব্যাংক নতুন করে ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিতে চায় না। অন্যদিকে উচ্চ সুদহারের কারণে উদ্যোক্তারাও নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক।

এডিবি বলছে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ ঋণব্যয় ও সীমিত ঋণপ্রবাহ বিনিয়োগকে আটকে রাখছে।

আইএমএফও ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের ওপর জোর দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে টাকা দিলেই হবে না। খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, সুশাসন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার সমস্যারও সমাধান করতে হবে।

ফাহমিদা খাতুনও ব্যাংক খাত সংস্কারকে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ, দুর্বল ব্যাংকের সময়বদ্ধ পুনর্গঠন এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি

তবে সব চিত্রই নেতিবাচক নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। রেকর্ড রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমিয়েছে এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে।

এই উন্নতির কারণে মুডিস সম্প্রতি বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে। রিজার্ভ বৃদ্ধি, তুলনামূলক নমনীয় বিনিময় হার এবং শক্তিশালী প্রবাসী আয়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সংস্থাটি।

তবে বৈদেশিক খাতের স্বস্তিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির পূর্ণ সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আমদানি বাড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি। এডিবি চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

ফলে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

রাজস্বের দুর্বলতা আরেক ঝুঁকি

অর্থনীতির দীর্ঘদিনের আরেক সমস্যা কম রাজস্ব আদায়। সরকারের আয় কম হলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো কঠিন হয়। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন বা বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হলে সরকারের ওপর চাপ বাড়ে।

ড. সেলিম রায়হানও সরকারের ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাবের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ব্যয় বাড়ার সঙ্গে রাজস্ব না বাড়লে ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ কারণে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তাহলে কি অর্থনীতি সত্যিই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে?

সব সূচক একসঙ্গে দেখলে উত্তরটা একেবারে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’, কোনোটিই নয়। অর্থনীতি আগের গভীর চাপ থেকে কিছুটা বেরিয়ে এসেছে। প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে এবং চলতি অর্থবছরে ৪ শতাংশ হতে পারে। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি এসেছে। বৈদেশিক খাতেও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে। কিন্তু একই সময়ে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমছে, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি, শিল্প ও বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংক খাতে বড় সমস্যা এবং জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।

ড. ফাহমিদা খাতুনের ভাষায়, অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করতে শুধু বিনিয়োগের প্রণোদনা নয়, বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

আর ড. সেলিম রায়হানের সতর্কতা হলো, বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে।