বাজারে কাটছাঁট-ক্রেডিট কার্ড-ঋণ: বাড়তি ব্যয় সামলাতে যত কৌশল করছে মানুষ

‘আগে বাজারে গিয়ে ভাবতাম, কী কিনবো। এখন ভাবতে হয় কী বাদ দিলে মাসটা চালানো যাবে।’ বিমা কোম্পানিতে চাকরি করা মাহিম আহমেদের কথায় উঠে এসেছে বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে গিয়ে মানুষের বদলে যাওয়া বাস্তবতা। পাঁচ সদস্যের পরিবারে আগে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ-মাংস রাখার চেষ্টা করলেও এখন প্রায়ই মাংস বাদ দিয়ে মাছ বা ডিম কিনতে হয়। দাম বেশি মনে হলে ডিমের পরিমাণও কমিয়ে দেন।

একদিকে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় বেড়েছে যাতায়াত ও পরিবহন খরচ। গ্যাস, বিদ্যুৎ, রান্নার জ্বালানি থেকে শুরু করে খাবার, শিক্ষা ও চিকিৎসা; সংসারের প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ অনুভব করছেন মানুষ। আয় একই হারে না বাড়ায় মাসের বাজেটও আর আগের মতো মিলছে না।

এই পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে বদলে যাচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন নানা অভ্যাস। কেউ বাজারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ দিচ্ছেন, কেউ কম দামের পণ্য কিনছেন। কেউ বাইরে খাওয়া বন্ধ করেছেন, কেউ রিকশা বা বাসের বদলে হেঁটে বা একসঙ্গে যাতায়াতের চেষ্টা করছেন। আবার বড় খরচ মেটাতে কেউ কেউ ব্যাংকের ভোক্তাঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভর করছেন।

অর্থাৎ, মানুষের ব্যয় কমানোর কৌশল এখন শুধু বিলাসী খরচ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রয়োজনীয় খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে ঋণ

জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে ব্যাংকঋণের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ার একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন, এই তিন মাসে দেশে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। জুন শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা।

এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ভোক্তাঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৪১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নয় মাসে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ১৩ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা।

ভোক্তাঋণের মধ্যে বাড়ি বা ফ্ল্যাট, গাড়ি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ক্রেডিট কার্ড ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ঋণ রয়েছে। ফলে এই ঋণের পুরোটা যে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নেওয়া হচ্ছে, তা বলা যাবে না। তবে ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের ব্যক্তিগত আর্থিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ভোক্তাঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায়, অনেক পরিবার বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করছে। মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো প্রয়োজনীয় খরচেও ঋণ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

তবে তার মতে, আয় একই হারে না বাড়লে স্বল্পমেয়াদে ঋণ মানুষকে খরচ সামলাতে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের ঋণের বোঝা ও আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ব্যবসায় ঋণ কম, ব্যক্তিগত খরচে বাড়ছে

ভোক্তাঋণ বাড়ার আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণের চাহিদা দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে শিল্প খাতে ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ৯৫ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে শিল্প খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র ৫৫২ কোটি টাকা।

নির্মাণ খাতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ঋণের স্থিতি কমেছে ৩ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। পরিবহন খাতেও ঋণের স্থিতি কমেছে। এর বিপরীতে একই সময়ে ভোক্তাঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

বড় শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ সুদ, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপকে কারণ হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।

বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শিল্প খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি না হওয়া উদ্বেগের বিষয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের সমাধান না হলে উদ্যোক্তারা নতুন করে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে যেতে চাইবেন না।

অন্যদিকে একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বড় করপোরেট ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন খুচরা ও ব্যক্তিগত ঋণের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।

অর্থাৎ অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে ঋণের চাহিদা যখন দুর্বল, তখন পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ঋণের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি আলাদা করে নজরে আসছে।

বাজারে যাওয়ার আগে তালিকা ছোট করছেন মানুষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারের তালিকায়। সীমিত আয়ের পরিবারে আগে যে পরিমাণ মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও ফল কেনা হতো, এখন অনেকেই তা কমিয়ে দিয়েছেন। মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডিম, ডিমের পরিবর্তে ডাল বা অপেক্ষাকৃত কম দামের খাবার বেছে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে।

মাহিম আহমেদের পাঁচ সদস্যের পরিবারেও এমন পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, আগে সপ্তাহে অন্তত এক দিন মাছ-মাংস রাখার চেষ্টা করতেন। এখন প্রায়ই মাংস বাদ দিয়ে মাছ বা ডিম কিনতে হয়। দাম বেশি মনে হলে ডিমের পরিমাণও কমিয়ে দেন।

তার ভাষায়, ‘আগে বাজারে গিয়ে ভাবতাম কী কী কিনবো। কোনও কিছু বাদ পড়লো কিনা, কোনোটার জন্য বাড়িতে গিয়ে আবার বকা খেতে হবে কিনা। আর এখন ভাবতে হয়, কী বাদ দিলে মাসটা চালানো যাবে।’

এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক হলো, বাইরে খাওয়া কমে যাওয়া, প্রয়োজন ছাড়া কেনাকাটা বন্ধ করা এবং বড় কেনাকাটা পিছিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ মানুষ এখন শুধু কম দামে পণ্য খুঁজছেন না; অনেক ক্ষেত্রে পণ্য কেনাটাই কমিয়ে দিচ্ছেন।

একই দামে কম পণ্য

বাজারের আরেকটি পরিবর্তনও ভোক্তার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে দাম একই রেখে প্যাকেটের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিতে যাকে বলা হয় ‘শ্রিংকফ্লেশন’। মোহাম্মদপুরের একটি দোকানের বিক্রেতা রবিউল ইসলাম জানান, বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেটের ওজন কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়মিত চোখে পড়ছে। একই দামের প্যাকেটে আগের তুলনায় কম পণ্য থাকছে।

এতে ক্রেতার কাছে পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ার বিষয়টি সব সময় দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু একই পরিমাণ পণ্য কিনতে মাস শেষে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। ফলে কোথাও দাম বাড়ছে, কোথাও প্যাকেটের পরিমাণ কমছে।

জ্বালানির দাম বাড়ায় বাড়ছে পরিবহন ব্যয়

সাম্প্রতিক সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে গণপরিবহনের ভাড়াতেও।

দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। নৌপথেও ভাড়া বেড়েছে। ফলে পরিবারের মাসিক বাজেটে যাতায়াতের খরচের অংশও বেড়েছে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাড়ি যাওয়া এক যাত্রী আবদুর রহমান বলেন, ‘কষ্ট হচ্ছে, কী আর করার। পরিবারের কাছে তো যেতে হবে।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম নিয়মিত যাতায়াত করা আরেক যাত্রী নাদিমের অভিজ্ঞতাও একই। তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাসের ভাড়ায় নয়, খাবারসহ দৈনন্দিন অন্যান্য খরচেও পড়ছে।

অর্থাৎ যাতায়াতের খরচ বাড়লে শুধু যাতায়াতের বাজেটই বাড়ে না। কর্মস্থলে যেতে বাড়তি টাকা লাগে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, আর সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়।

চাল, ডিম, সবজি; বাজারেও চাপ

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপণ্যের বাজারেও নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। টিসিবির সাম্প্রতিক বাজারতথ্যে কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, ময়দা ও মসুর ডালের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

কাঁচামরিচের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০-১৬০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। বেগুন ৮০-৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এক হালি ডিমের দাম ৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ টাকা হয়েছে। প্যাকেটজাত ময়দা ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। মসুর ডালের দামও বেড়েছে।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর চালের বাজারেও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দূরবর্তী জেলা থেকে রাজধানীতে চাল আনতে ট্রাক ভাড়া বাড়ায় প্রতি কেজি চালের ওপর পরিবহন ব্যয় বাড়ছে কয়েক পয়সা। কিন্তু ভোক্তার জন্য সেই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পয়সায় থেমে থাকছে না। সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে হাতবদল, মজুত, পরিবহন ও ব্যবসায়িক মার্জিন যোগ হয়ে খুচরা বাজারে তার প্রভাব টাকার অঙ্কে দেখা দিতে পারে।

কৃষকের খরচও বাড়ছে

জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্য উৎপাদনের খরচ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, কৃষিকাজে সেচের জন্য দেশে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ছোট ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় সম্পূরক সেচের খরচ বাড়বে। আমন ও শীতকালীন সবজি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তার মতে, কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, থ্রেশার, পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যবহার বাড়ায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে সরাসরি পড়বে। অর্থাৎ আজ যে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় কৃষক করছেন, তার একটি অংশ আগামী দিনে খাদ্যপণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রান্নার খরচেও বাড়তি চাপ

গ্যাসের সরবরাহ সংকটের কারণে অনেক পরিবার এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আবার কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। ফলে রান্নার জ্বালানির খরচ কমানোর সুযোগও সীমিত।

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারদরের পার্থক্য নিয়েও ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। সরবরাহ সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামের কারণ ব্যাখ্যা করছেন। ফলে রান্নার খরচ কমাতে চাইলেও অনেক পরিবারের সামনে বিকল্প সীমিত।

শিক্ষা-চিকিৎসার খরচও পিছিয়ে যাচ্ছে

জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে মানুষ প্রথমে সাধারণত যে খাতগুলোতে কাটছাঁট করে, তার মধ্যে বিনোদন, বাইরে খাওয়া ও পোশাকের মতো ব্যয় থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান থাকলে প্রয়োজনীয় খরচেও হাত দিতে হয়।

শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কোচিং বা ব্যক্তিগত খরচ কমানো, চিকিৎসা কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া, কম দামের ওষুধ বা পণ্য বেছে নেওয়া কিংবা বড় চিকিৎসা পরে করার মতো সিদ্ধান্তও অনেক পরিবারের বাজেটে দেখা যাচ্ছে।এখানেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাবটি তৈরি হয়; মানুষ শুধু কম খরচ করছে না, কিছু প্রয়োজনও পিছিয়ে দিচ্ছে।

স্বস্তির পথ কোথায়

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর টেকসই পথ হলো মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানো এবং পণ্য ও সেবার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, পণ্যের দাম কমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। আবার আয় বাড়লেও ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভালো মজুরির কর্মসংস্থান তৈরির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

তার মতে, অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের আয় বাড়ানোর সঙ্গে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ; দুই দিকেই কাজ করতে হবে।

অপরদিকে জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন অর্থনীতিবিদদের অনেকে। কারণ জ্বালানির দাম ও সরবরাহের সঙ্গে উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজারদর; সবকিছুই যুক্ত।

মানুষের বাজেটে এখন ‘কাটছাঁটের হিসাব’

সব মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার সঙ্গে মানুষের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। বাজারের তালিকা ছোট হচ্ছে, পণ্যের মান বা ব্র্যান্ড বদলাচ্ছে, বাইরে খাওয়া কমছে, যাতায়াতের বিকল্প খোঁজা হচ্ছে, বড় কেনাকাটা পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ অতিরিক্ত কাজ করছেন, কেউ পরিবারে দ্বিতীয় আয়ের উৎস খুঁজছেন। আবার কেউ প্রয়োজন মেটাতে ঋণ নিচ্ছেন।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্যাকেটের পরিমাণ কমে যাওয়া, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর উৎপাদন ব্যয় বাড়ার নতুন চাপ। ফলে মূল্যস্ফীতির সরকারি হার কিছুটা কমলেও মানুষের ব্যক্তিগত বাজেটে স্বস্তি ফিরেছে কি না; সেটি শুধু একটি সংখ্যায় বোঝা যাচ্ছে না। কারণ বাজারে মানুষ যে পণ্য কিনছেন, যে পরিমাণ কিনছেন এবং যে খরচগুলো বাদ দিচ্ছেন; সেখানেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রকৃত চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

একজন সীমিত আয়ের মানুষের ভাষায়, আগে মাসের শুরুতে হিসাব হতো কী কী কেনা হবে। এখন হিসাব করতে হয় কী কী বাদ দিলে মাসটা পার করা যাবে। এই পরিবর্তনই বলে দিচ্ছে, জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে মানুষের প্রধান কৌশল এখন আয় বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমানো, প্রয়োজন পিছিয়ে দেওয়া এবং সামর্থ্যের সঙ্গে জীবনযাত্রাকে নতুন করে মানিয়ে নেওয়া।