নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এখনও নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমে একটি মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে, তবে নেতিবাচক প্রবণতার আধিক্য রয়েছে এবং এসব সমস্যার বড় অংশই কাঠামোগত।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে ৩৬২টি পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে শাসন ও প্রশাসন, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা, শিল্প ও বাণিজ্য, ব্যাংক ও আর্থিক খাত, জ্বালানি ও পরিবহন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা— এই ৯টি খাত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কেবল ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তবে নেওয়া পদক্ষেপগুলোই মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি, তবে জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও বেশি
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ এখনও রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনও নেতিবাচক থাকায় মূল্যস্ফীতি কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
রাজস্ব, বিনিয়োগ ও শিল্পে উদ্বেগ
সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। মার্চ থেকে মে সময়ে মোট কর রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, চলতি অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়ন ব্যয়, বিশেষ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি কাটছাঁটের চাপ বাড়তে পারে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে বরাদ্দ সুরক্ষিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে সংস্থাটি। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক থেকে নেতিবাচক হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে।
সিপিডির মতে, এসব সূচক দ্রুত বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের কোনও সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত
চলমান গ্যাস সংকটকে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, বিকল্প এলএনজি কার্গো সংগ্রহে জটিলতা এবং সরবরাহ পরিকল্পনার দুর্বলতায় গ্যাসনির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। মার্চ-এপ্রিল সময়ে শিল্প উৎপাদনের সাধারণ সূচক এবং উৎপাদনশিল্পের সূচক– দুটির প্রবৃদ্ধিই শূন্যে নেমে এসেছে। শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণও কমেছে।
এ পরিস্থিতিতে সময়বদ্ধ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কৌশলগত জ্বালানি মজুত, উৎস বহুমুখীকরণ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে ভর্তুকির চাপ কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি।
ব্যাংক খাতে সংস্কার উদ্যোগ, তবে আস্থা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সরকারের কয়েকটি পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। এর মধ্যে পাঁচটি সংকটাপন্ন ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা এবং সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক রেজুলেশন আইন প্রয়োগের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা, শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। সিপিডির মতে, ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রয়োজন।
রিজার্ভ বেড়েছে, কিন্তু বহিঃখাতে চাপ
বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ আগস্টের মধ্যে বিপিএম-৬ হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে একই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে গেছে এবং প্রবাসী আয় ও বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এ ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে বলে সিপিডির মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার গতি পাচ্ছে না
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের উপস্থাপনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ধীরগতির কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কার কর্মসূচির অভাব, দুর্বল রাজস্ব ও আর্থিক কাঠামো, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের ধাক্কা, প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের অভাব।
সিপিডির মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বলতে শুধু মূল্যস্ফীতি কমাকে বোঝানো যাবে না। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার ও সুদের হারে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দৃশ্যমান উন্নতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন।
এখন কী করা দরকার
সিপিডি বলছে, দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে সহায়তা দিতে আগামী অক্টোবর থেকে জুন পর্যন্ত একটি বাস্তবসম্মত ‘মূল বাজেট’ বা কোর বাজেট প্রস্তুত করা দরকার। এটি হতে হবে বাস্তব সময়ের তথ্য ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামোর ভিত্তিতে।
পাশাপাশি জ্বালানি, ব্যাংক সংস্কার, রাজস্ব প্রশাসন, উন্নয়ন ব্যয়ের যৌক্তিকীকরণ, নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা ও ডিজিটালাইজেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং সংসদের কাছে নিয়মিত জবাবদিহিও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
সামগ্রিক মূল্যায়নে সিপিডি মনে করছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু সংস্কারমূলক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অর্থনীতির প্রধান কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।