‘পোশাক খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিকল্প নেই, বাধা কর ও অর্থায়নে’

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫২আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫২

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বা সবুজ শিল্পে রূপান্তরের কোনও বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের মান ও দাম নয়, কীভাবে পণ্যটি উৎপাদিত হচ্ছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কতটা কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। ফলে পোশাক কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে এ রূপান্তরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ কর ও শুল্ক, ঋণের উচ্চ সুদ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির সীমিত প্রাপ্যতা। এমনকি সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামে শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে উদ্যোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ কর দিতে হচ্ছে। এর ফলে শতাধিক সৌর প্যানেলভর্তি কন্টেইনার বন্দরে আটকে রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

রবিবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘পোশাক খাতের শিল্প কারখানায় কার্বন নিঃসরণ কমানো: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা উঠে আসে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কমবে উৎপাদন ব্যয়

সংলাপে সিপিডির ৩৫০টি পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল তুলে ধরেন সংস্থাটির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট সামী মোহাম্মদ। গবেষণায় দেখা গেছে, পোশাক কারখানাগুলোর মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণ করা গেলে গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমানো সম্ভব। আর বিদ্যুতের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা গেলেও গড় মাসিক ব্যয় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে।

সামী মোহাম্মদ বলেন, আমদানি করা এলএনজি ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পোশাকশিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের গতি বাড়ানোর এখনই উপযুক্ত সময়।

তিনি বলেন, দেশের অনেক পোশাক কারখানা কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও কাঠামোগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানায় আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে।

করের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন

বিজিএমইএর সহসভাপতি ব্যারিস্টার বিদিয়া অমৃত খান বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের মান দেখছেন না, পণ্যটি কতটা পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত হয়েছে, সেটিও বিবেচনা করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘গ্রিন ডিল’ ও ‘ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট’-এর মতো নতুন উদ্যোগ পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনই কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে দেশের পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে। ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ দেশে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জাম আমদানিতে এখনও উচ্চহারে শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হচ্ছে।

বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সরকার বাজেট বক্তৃতায় সৌর প্যানেলের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বললেও বাস্তবে আমদানির সময় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের কর দিতে হচ্ছে। বর্তমানে শতাধিক সৌর প্যানেলভর্তি কন্টেইনার বন্দরে আটকে রয়েছে। এতে উদ্যোক্তাদের বিপুল পরিমাণ জরিমানাও দিতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের জটিলতা অব্যাহত থাকলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে। শিল্পকারখানার জন্য ‘মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট’-এর লাইসেন্স প্রক্রিয়াও সহজ করার দাবি জানান তিনি।

নেট মিটারিংয়েও দীর্ঘসূত্রতা

সংলাপে বক্তারা জানান, কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে শুধু অর্থ ও প্রযুক্তির সংকটই নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলোতে নেট মিটারিং সুবিধা না থাকা একটি বড় সমস্যা। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন পেতে যেখানে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগার কথা, সেখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।

এ ছাড়া পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ডাইংয়ের মতো তাপ-নির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ এখনই গ্যাস বা কয়লার কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না। বর্তমান প্রযুক্তিতে বৈদ্যুতিক বয়লার স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় উদ্যোক্তারা এ ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে পারছেন না।

উচ্চ সুদে সবুজ অর্থায়নও কঠিন

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, দেশে সবুজ অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকলেও তা পাওয়া অত্যন্ত জটিল। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য বহন করা কঠিন।

তিনি বলেন, ইডকলের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে উদ্যোক্তারা চাইলেও দ্রুত সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারছেন না।

নতুন শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয়ভাবে বয়লার ও জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, এতে একদিকে কারখানাগুলোর বিনিয়োগ ব্যয় কমবে, অপরদিকে কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

ইডকলের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফ শাহরিয়ার বলেন, ছোট কারখানাগুলোর জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। তবে অনেক কারখানার আর্থিক সক্ষমতা ও পরিশোধের নিশ্চয়তা না থাকায় ঋণ ছাড় করতে দেরি হয়। এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর মতো ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্রেতাদেরও দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান

আলোচনায় বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা পোশাক উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দিলেও এ রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে তারা যথেষ্ট অংশীদারিত্ব নিচ্ছে না। ফলে কারখানা মালিকদের ওপর পুরো বিনিয়োগের চাপ পড়ছে।

বিশেষ করে বড় কারখানাগুলো নিজেদের অর্থায়নে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের কিছুটা সক্ষমতা রাখলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো প্রযুক্তিগত জ্ঞান, অর্থায়ন এবং উচ্চ সুদের কারণে পিছিয়ে পড়ছে। এতে ভবিষ্যতে ছোট ও মাঝারি কারখানার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জরুরি কমিটি গঠনের প্রস্তাব

সংলাপে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে এ কমিটি গঠনের কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, পোশাকশিল্পের সবুজ রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে কর, শুল্ক, অর্থায়ন, জ্বালানি ও প্রযুক্তি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ড. মোয়াজ্জেম আরও বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট আগামী এক দশকেও সহজে পুরোপুরি দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই প্রতিটি কারখানাকে নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস খুঁজে নিতে হবে।

সংলাপে ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক শামীম মুনির উদ্দিন এবং পোশাক খাতের রপ্তানিকারক আশরাফ জামান দিপুও বক্তব্য দেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, পোশাকশিল্পের সবুজ রূপান্তর এখন আর শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগকে পরিবেশগত দায়িত্ব হিসেবে না দেখে শিল্পের টিকে থাকার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত সমন্বিত নীতি সহায়তা, সহজ অর্থায়ন ও কর-শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

/জিএম/এম/
সম্পর্কিত
ইইউর পোশাক বাজারে ধস, ছয় মাসে বাংলাদেশের রফতানি কমলো ১৬.৪৩ শতাংশ
বড় বাজারে পোশাক রফতানি কমলেও ইতালিতে একলাফে বাড়লো ৩২ শতাংশ 
এলপিপির বকেয়া নিয়ে যে সিদ্ধান্ত এলো
সর্বশেষ খবর
এসএসসি ফলের পর শিক্ষার্থীদের মৃত্যু, জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
এসএসসি ফলের পর শিক্ষার্থীদের মৃত্যু, জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
মাদকসহ গ্রেফতার ছাত্রদল নেতা কারাগারে
মাদকসহ গ্রেফতার ছাত্রদল নেতা কারাগারে
‘সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি’ কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড
‘সীতাকুণ্ড ট্র্যাজেডি’ কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড
পাকিস্তানকে নিয়ে আমিরাতি প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য
পাকিস্তানকে নিয়ে আমিরাতি প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টার ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য
সর্বাধিক পঠিত
প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ
প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ
আমার ওপর হামলা হয়েছে, আমি সরকারদলীয় এমপি হয়েও নিরাপদ নই
আমার ওপর হামলা হয়েছে, আমি সরকারদলীয় এমপি হয়েও নিরাপদ নই
শাহজালালে একদিনে চার ফ্লাইটে অভিযান, যাত্রীদের ব্যাগে পাওয়া গেলো যা
শাহজালালে একদিনে চার ফ্লাইটে অভিযান, যাত্রীদের ব্যাগে পাওয়া গেলো যা
বগুড়ার না, তানজিদ বাংলাদেশের ছেলে: তামিমের মন্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী 
বগুড়ার না, তানজিদ বাংলাদেশের ছেলে: তামিমের মন্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী 
প্রধানমন্ত্রী আসবেন, তাই বালুচাপা দেওয়া হলো ২০ বছরের ময়লার ভাগাড়
প্রধানমন্ত্রী আসবেন, তাই বালুচাপা দেওয়া হলো ২০ বছরের ময়লার ভাগাড়