দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি’ বা এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক প্রতিবেদনের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রবিবার (৮ মার্চ) এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন এই পদ্ধতি ২০২৮ সাল থেকে কার্যকর হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী ইসিএল পদ্ধতি চালু হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ শ্রেণিকরণ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো ‘ক্ষতি হওয়ার পর’ ভিত্তিতে ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করে। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে ঋণ খারাপ হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্বাভাসের ভিত্তিতে আগাম প্রভিশন রাখতে হবে।
এর ফলে ব্যাংকগুলোকে পরিচালন মুনাফা থেকে আগাম নিরাপত্তা সঞ্চিতি গঠন করতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় অতীত তথ্যের পাশাপাশি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বিবেচনায় ঋণের ঝুঁকি নির্ধারণ করা হবে। বিশেষ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতিসহ বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা হবে।
ইসিএল পদ্ধতিতে ঋণকে তিনটি ধাপে শ্রেণীকরণ করা হবে—
প্রথম ধাপ: স্বাভাবিক ঋণের ক্ষেত্রে আগামী ১২ মাসে সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি নির্ধারণ করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: ঋণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে পুরো মেয়াদের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে প্রভিশন রাখতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: ‘ক্রেডিট ইমপেয়ার্ড’ বা ক্ষতিগ্রস্ত ঋণের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মেয়াদের সম্ভাব্য ক্ষতির ভিত্তিতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে।
নতুন কাঠামোর আওতায় সুদ আয়ের স্বীকৃতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঋণের ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সুদ আয়ের হিসাব নির্ধারণ করা হবে। ফলে ব্যাংকের প্রকৃত আয় ও ঝুঁকির চিত্র আরও বাস্তবসম্মতভাবে প্রতিফলিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালে ফাইন্যানসিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তবে এতদিন এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ছিল না। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, “বর্তমানে কোনও ঋণ খেলাপি হওয়ার পরই ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা সঞ্চিতি গঠন করে। কিন্তু নতুন নিয়মে ঋণের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগাম প্রভিশন রাখতে হবে। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে এবং কোনও ঋণ খেলাপি হলেও পুরো প্রভিশনের চাপ একসঙ্গে নিতে হবে না। ফলে ব্যাংকের মূলধন ব্যবস্থাপনাও আরও শক্তিশালী হবে।”