বিদেশি বিনিয়োগে উগান্ডা-ঘানার চেয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আফ্রিকার তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশ উগান্ডা, ঘানা এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে এফডিআই প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও মোট বিনিয়োগের পরিমাণ এখনও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড)।

সংস্থাটির প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এ বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন (১৮০ কোটি) মার্কিন ডলার। একই সময়ে উগান্ডা পেয়েছে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, আর ঘানা ও ডিআর কঙ্গো প্রত্যেকেই ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশগুলো মূলত জ্বালানি, খনিজ সম্পদ এবং অবকাঠামোভিত্তিক বৃহৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ পাওয়ার কারণে এগিয়ে গেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ উৎপাদনশিল্প ও সেবা খাতে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদেশি বিনিয়োগ টানতে পারছে না।

প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে, তবে অবদান এখনও সীমিত

পরিমাণে পিছিয়ে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এফডিআই প্রবৃদ্ধির দিক থেকে ২০২৫ সালে শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে দেশে এফডিআই এসেছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।

তবে আঙ্কটাড বলছে, এই প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট স্থাবর মূলধন গঠনের (জিএফসিএফ) মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসে। অর্থাৎ দেশের বিনিয়োগের বড় অংশ এখনও অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরশীল।

কমেছে নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন বা গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ প্রকল্পের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে এ ধরনের প্রকল্পের ঘোষণা ছিল ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫ সালে তা ২২ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টিই এই পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিদেশে বাংলাদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে

অপরদিকে, বিদেশে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে এ খাতে বিনিয়োগ ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে তা ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া দেশে মোট এফডিআই স্টকের পরিমাণ বেড়ে ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আঙ্কটাডের এই তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কেন এগিয়ে আফ্রিকার দেশগুলো

প্রতিবেদন বলছে, ঘানা, উগান্ডা ও ডিআর কঙ্গোর সাফল্যের পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক নীতি সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ।

ঘানায় ২০২৫ সালের শুরুতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি কর বাতিল, সরকারি স্বর্ণ ক্রয় কর্মসূচি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ন্যূনতম মূলধনের শর্ত শিথিল করা হয়। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আইন ও ডিজিটাল সেবা সহজীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

উগান্ডা তাদের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষকে 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার'-এ রূপান্তর করেছে। একই সঙ্গে শিল্পপার্কে বিশেষ কর-সুবিধা ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে ডিআর কঙ্গো অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ খাতের উদারীকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বড় অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।

বৈশ্বিক বিনিয়োগে এশিয়ার আধিপত্য

আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে এশিয়া এখনও বিদেশি বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় গন্তব্য। ২০২৫ সালে এ অঞ্চলে মোট ৬৪৪ বিলিয়ন ডলার এফডিআই এসেছে।

তবে বৈশ্বিক বিনিয়োগের ধরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন ডিজিটাল অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পে বেশি বিনিয়োগ করছে।

২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী এফডিআই ৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা টানা দুই বছরের পতনের পর ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়ের কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আঙ্কটাড।

সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিমাণ ২৭৭ বিলিয়ন ডলার। এরপর রয়েছে সিঙ্গাপুর (১৫১ বিলিয়ন ডলার), হংকং (১১৭ বিলিয়ন ডলার), চীন (১০৫ বিলিয়ন ডলার) এবং ব্রাজিল (৭৭ বিলিয়ন ডলার)।