দেশের ব্যাংক খাতে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ডিস্ট্রেসড (সংকটাপন্ন) সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৬’ বা ডামা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনের আওতায় প্রথমবারের মতো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে তা আদায়ের সুযোগ পাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি বা ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি)।
বর্তমানে খেলাপি ঋণ আদায়ের দায়িত্ব মূলত ব্যাংক ও অর্থঋণ আদালতের ওপর। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, সম্পদ বিক্রিতে জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা এবং অকার্যকর মামলার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বছরের পর বছর আটকে থাকছে। এতে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হচ্ছে, নতুন ঋণ বিতরণ কমছে এবং পুরো আর্থিক খাত চাপে পড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে আইনের খসড়া প্রকাশ করে জনমত আহ্বান করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে দেশের ব্যাংক খাতে গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা হতে পারে।
ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ১১ লাখ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী, খেলাপি, অবলোপন করা, পুনঃতফসিল করা এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ মিলিয়ে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ বা সংকটাপন্ন ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা। এটি মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ।
এর মধ্যে শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণই সম্প্রতি ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এত বিপুল অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলো নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারছে না। অনেক ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
যেভাবে কাজ করবে নতুন ব্যবস্থা
খসড়া আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (ডিএএমইউ)’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন থাকলেও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে থাকবে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা। সংস্থাটির প্রধানের পদমর্যাদা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমান।
ডিএএমইউর দায়িত্ব হবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া, তাদের কার্যক্রম তদারকি করা, খেলাপি ঋণ কেনাবেচার অনুমোদন দেওয়া, প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন, তদন্ত, নিরীক্ষা ও পরিদর্শন পরিচালনা, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা বা লাইসেন্স বাতিল এবং প্রয়োজনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন।
খেলাপি ঋণ কিনবে ডিএএমসি
আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) গঠন। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি, অবলোপন করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কিনে নিয়ে নিজস্ব দক্ষতা ও ব্যবসায়িক কৌশলে তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে—বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে—ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় এ ধরনের সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশও প্রথমবারের মতো সেই মডেলে এগোচ্ছে।
‘শুধু আইন করলেই হবে না’
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানিকে যুক্ত করার সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক ও সময়োপযোগী। বিশ্বের অনেক দেশেই এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেখানে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু আইন করলেই হবে না, সেটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক বা অন্য কোনও প্রভাবের কারণে যদি খেলাপি ঋণ আদায়ে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে এই উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক খাত উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হতে পারে।’
তার মতে, বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা কমাতে প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে নতুন পথ খোঁজা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যত অন্য কোনও বিকল্প নেই।
শুধু ঋণ আদায় নয়, প্রতিষ্ঠানও পুনরুজ্জীবিত করবে
খসড়া আইনে ডিএএমসিকে শুধু ঋণ আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর, ব্যবসার আধুনিকায়ন, নতুন বিনিয়োগকারী আনা, রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবিত করা, সম্পূর্ণ বা আংশিক ব্যবসা বিক্রি, লিজ দেওয়া, জামানত দখল ও বিক্রি, আদালতে মামলা পরিচালনা এবং ট্রাস্ট গঠন করে সম্পদ পরিচালনার ক্ষমতা পাবে।
অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু জামানত বিক্রি নয়, ব্যবসা সচল রেখে ব্যাংকের অর্থ ফেরত আনা।
থাকবে লোন সার্ভিসিং কোম্পানি
ঋণ পুনরুদ্ধারকে আরও পেশাদার করতে আইনে লোন সার্ভিসিং কোম্পানি (এলএসসি) গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা, সম্পদের তথ্য সংগ্রহ, মূল্যায়ন, সমঝোতার উদ্যোগ এবং আদালতের মামলায় সহায়তা করবে। তবে তারা নিজেরা মামলা করতে পারবে না, জনগণের কাছ থেকে আমানত নিতে পারবে না এবং কোনও ধরনের জবরদস্তিমূলক বা বেআইনি উপায়ে ঋণ আদায়ও করতে পারবে না।
সুবিধাভোগীরাও আসবেন আইনের আওতায়
খসড়া অনুযায়ী, শুধু ঋণগ্রহীতা নয়; তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান, উত্তরাধিকারী, উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারী, বর্তমান ও সাবেক পরিচালক, প্রধান কর্মকর্তা, পরিবারের সদস্য, জামিনদাতা, পেশাগত উপদেষ্টা এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুবিধাভোগীকেও প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত মালিকানা গোপন করে সম্পদ সরিয়ে ফেলার প্রবণতা ঠেকাতে এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পারবেন
ডিএএমসি গঠনে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি, প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড, ক্রেডিট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারবেন।
আইনে সিকিউরিটাইজেশন, বন্ড ইস্যু, যৌথ বিনিয়োগ তহবিল এবং বিদেশি মূলধন সংগ্রহের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে স্বার্থের সংঘাত এড়াতে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়নি।
ট্রাস্টের মাধ্যমে সম্পদ ব্যবস্থাপনা
খেলাপি ঋণ কেনার পর সেই সম্পদ কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে না। আলাদা ট্রাস্টের মাধ্যমে সম্পদ পরিচালিত হবে। ফলে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ওই সম্পদের ওপর কোম্পানির পাওনাদাররা দাবি করতে পারবেন না।
অনিয়মে লাইসেন্স বাতিল
ডিএএমসির কার্যক্রমে অনিয়ম হলে তদন্তের মাধ্যমে লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, মিথ্যা তথ্য প্রদান, হিসাব গোপন, প্রতারণা, অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধে ৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে এই মডেল পরিচিত হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে শুধু নতুন কোম্পানি গঠন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. এম কে মুজেরী মনে করেন, খেলাপি সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে বিপুল পরিমাণ অচল ঋণ সরিয়ে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা অনেক বাড়বে।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ে বেসরকারি কোম্পানিকে যুক্ত করার এই উদ্যোগকে দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড় নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক মূল্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে আটকে থাকা বিপুল অঙ্কের অচল সম্পদ ধীরে ধীরে অর্থনীতির মূল ধারায় ফিরে আসতে পারে।