গ্রাহকদের উদ্বেগ: নিজের টাকা তুলতে কেন গুনতে হবে বাড়তি মাশুল

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
১৬ জুলাই ২০২৬, ১৫:১৫আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৫:১৫

ব্যাংকে জমা রাখা নিজের টাকা প্রয়োজনের সময় তুলতে গেলেও অতিরিক্ত ফি দেওয়া লাগতে পারে— এমন একটি সম্ভাবনার খবর সামনে আসতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) প্রস্তাব দিয়েছে, কোনও গ্রাহক মাসে তিনবারের বেশি ব্যাংকের কাউন্টার থেকে নগদ টাকা তুললে প্রতিবার ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ফি নেওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে আরও ১৪ ধরনের ব্যাংকিং-সেবায় নতুন ফি চালু এবং কয়েকটি বিদ্যমান চার্জ বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি হয়— এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তারপরও এই প্রস্তাবই সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ব্যাংকে টাকা রাখা কি ধীরে ধীরে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে?

বর্তমানে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ব্যয়ও আগের তুলনায় অনেক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নিজের সঞ্চয়ের টাকা তুলতেও যদি অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়— তাহলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে মধ্যবিত্ত, নিম্ন আয়ের মানুষ, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।

অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, ব্যাংকে টাকা রাখলে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের চার্জ দিতে হয়। হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি, এটিএম কার্ড চার্জ, এসএমএস চার্জ, চেক বইয়ের ফি, অনলাইন সেবার খরচ— এসবের পর আবার কাউন্টার থেকে টাকা তোলার জন্য আলাদা মাশুল আরোপ করা হলে সেটি গ্রাহকদের কাছে অন্যায্য বলেই মনে হবে।

বিশেষ করে যারা মাসে একাধিকবার চিকিৎসা, ব্যবসা, পরিবারের খরচ বা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তুলতে বাধ্য হন— তাদের জন্য এই প্রস্তাব নতুন আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক বয়স্ক মানুষ, পেনশনভোগী এবং প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত নন— এমন গ্রাহক এখনও কাউন্টারনির্ভর ব্যাংকিং সেবার ওপর নির্ভরশীল। তাদের কাছে ডিজিটাল ব্যাংকিং এখনও পুরোপুরি সহজ বা স্বাচ্ছন্দ্যের নয়।

যা যা প্রস্তাব করেছে এবিবি

এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী— মাসে তিনবারের বেশি কাউন্টার থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেওয়া যেতে পারে। দীর্ঘদিন অচল (ডরম্যান্ট) ব্যাংক হিসাব পুনরায় সচল করতে ৫০০ টাকা ফি নেওয়া হবে। ঋণ প্রক্রিয়াকরণ (লোন প্রসেসিং) ফি কয়েক গুণ বাড়ানো। আরও ১৪ ধরনের ব্যাংকিং সেবায় নতুন ফি চালু অথবা বিদ্যমান চার্জ বৃদ্ধি।

ব্যাংকগুলোর যুক্তি, পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবার বিপরীতে ফি নেওয়া হয়। পাশাপাশি কাউন্টারভিত্তিক লেনদেন কমিয়ে এটিএম, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারে গ্রাহকদের উৎসাহিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজ

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ফি বাড়িয়ে কাউন্টার ব্যবহার কমানো সম্ভব নয়। কারণ দেশের সব এলাকায় এখনও পর্যাপ্ত এটিএম বুথ নেই। অনেক সময় বুথে টাকা থাকে না, আবার কারিগরি ত্রুটির কারণেও গ্রাহকদের হয়রানির শিকার হতে হয়। মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনও সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়।

গ্রামাঞ্চল, মফস্বল এবং ছোট শহরের বহু মানুষ এখনও ব্যাংকের কাউন্টার থেকেই নিয়মিত লেনদেন করেন। তাদের অনেকের স্মার্টফোন নেই, অনেকে ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা শক্তিশালী না করে কাউন্টারে অতিরিক্ত ফি আরোপ করলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই বাড়তি খরচ বহন করবেন।

গ্রাহকদের প্রশ্ন: সেবার মান না বাড়িয়ে বেশি চার্জ কেন?

সাধারণ গ্রাহকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ব্যাংকগুলোর উচিত আগে সেবার মান উন্নত করা। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, সার্ভার জটিলতা, এটিএমে টাকা না থাকা, কিংবা বিভিন্ন ধরনের সেবা পেতে বিলম্ব— এসব সমস্যার সমাধান না করেই যদি নতুন নতুন চার্জ আরোপ করা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।

তাদের মতে, ব্যাংকে টাকা রাখার উদ্দেশ্য হলো নিরাপদে সঞ্চয় করা এবং প্রয়োজনের সময় সহজে সেই টাকা ব্যবহার করা। কিন্তু ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধরনের চার্জ বাড়তে থাকলে ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি কেউ কেউ ব্যাংকের পরিবর্তে নগদ অর্থ নিজের কাছেই রাখাকে বেশি সুবিধাজনক মনে করতে পারেন, যা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্যও ইতিবাচক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান

এ ধরনের উদ্বেগের মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়— এমন কোনও সিদ্ধান্ত সহজে অনুমোদন দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘‘অতিরিক্ত ফি আরোপ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং সেবার প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে। তাই যেকোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোকে শুধু সেবা মাশুলের ওপর নির্ভর না করে ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’’

এবিবির সুপারিশ কি কার্যকর হবে

এবিবির প্রস্তাবটি এখনও কেবল একটি সুপারিশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া এটি কার্যকর হবে না। তবে প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পর যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে যে,  সাধারণ মানুষ এখন ব্যাংকিং সেবায় নতুন কোনও চার্জকে সহজভাবে নিতে প্রস্তুত নন।

বিশেষ করে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, তখন নিজের কষ্টার্জিত টাকা তুলতেও অতিরিক্ত ফি দিতে হবে— এমন ধারণাই মানুষের মধ্যে অস্বস্তি, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, নতুন চার্জ আরোপের আগে ব্যাংকগুলোর উচিত গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, সেবার মান উন্নত করা এবং এমন একটি ব্যাংকিং পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে মানুষ মনে করবেন— ব্যাংকে টাকা রাখা সুবিধার, অতিরিক্ত ব্যয়ের নয়।

/জিএম/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
মাসে তিনবারের বেশি কাউন্টার থেকে টাকা তুললেই অতিরিক্ত ফি? 
বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে বিধিমালা শিথিল
শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১০ শিল্প গ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ
সর্বশেষ খবর
ফেসবুক প্রেমিকার টানে বিনা ভিসায় সীমান্ত পার: শেষ পর্যন্ত মিললো না প্রেম, ঠাঁই হলো জেলে
ফেসবুক প্রেমিকার টানে বিনা ভিসায় সীমান্ত পার: শেষ পর্যন্ত মিললো না প্রেম, ঠাঁই হলো জেলে
শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ: সংঘাত বিস্তারের হুঁশিয়ারি ইরানের
শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ: সংঘাত বিস্তারের হুঁশিয়ারি ইরানের
১৫০ কোটির সম্পত্তির মালিক তিনি, বাড়িতে লোভী ছেলের গুলিতে হলেন খুন
১৫০ কোটির সম্পত্তির মালিক তিনি, বাড়িতে লোভী ছেলের গুলিতে হলেন খুন
‘সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া আবু সাঈদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল’
‘সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া আবু সাঈদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল’
সর্বাধিক পঠিত
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, চলছে যৌথ টহল
গোপালগঞ্জে নিরাপত্তা জোরদার, ৫ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, চলছে যৌথ টহল
এনসিপি নেতার ২ লাখ টাকা জরিমানা করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত
এনসিপি নেতার ২ লাখ টাকা জরিমানা করলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত
অজিত দোভালের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বৈঠক
অজিত দোভালের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বৈঠক
চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনে ছেলে অংশ নেওয়ায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার
চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনে ছেলে অংশ নেওয়ায় বিএনপি নেতা বহিষ্কার
শিক্ষা খাত নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
শিক্ষা খাত নিয়ে নতুন ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী