দেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি নাম— বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ফিরলেও নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ কিংবা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগে এখনও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বরং অধিকাংশ ব্যবসায়ী এখন নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণ, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চিত সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ডলার বাজারের চাপ, নীতিগত অস্থিরতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ মিলেই নতুন বিনিয়োগের গতি থামিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশে এক ধরনের ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ বা ‘অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের’ প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শিল্প খাত নয়; কর্মসংস্থান, উৎপাদন, রফতানি, রাজস্ব আয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলেও অর্থনীতিতে ফেরেনি আস্থা
জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে না। অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানির নিশ্চয়তা, অর্থায়নের সহজলভ্যতা এবং বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে আস্থা তৈরি না হলে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব নয়।
আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানোয়ার হোসেন বলেন, ব্যবসার পরিবেশে আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যবসা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।
তার মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু সরকারের নীতি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; নীতি প্রণয়নের সময় মাঠপর্যায়ের উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
উচ্চ সুদহারই এখন সবচেয়ে বড় বাধা
বর্তমানে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, কাঁচামালের দাম, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় আগেই বেড়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ সুদের ঋণ যুক্ত হওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন আর লাভজনক থাকছে না।
একজন শিল্প উদ্যোক্তার ভাষায়, এখন ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ মানে অনিশ্চয়তার মধ্যে যাত্রা শুরু করা। লাভ হবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়; কিন্তু সুদ ঠিকই পরিশোধ করতে হবে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের উচ্চ হার দীর্ঘমেয়াদি শিল্প বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে না গিয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখার কৌশল গ্রহণ করছেন।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন নিয়েই শঙ্কা
শিল্প উদ্যোক্তাদের অন্যতম বড় অভিযোগ জ্বালানি সংকট। নতুন শিল্পে গ্যাস সংযোগ পাওয়া কঠিন, আর সংযোগ পেলেও অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ নেই। বিদ্যুতের সরবরাহও সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়।
রফতানিমুখী শিল্প মালিকরা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, নতুন বিনিয়োগের জন্য যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, সেটি এখনও তৈরি হয়নি। জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতায় অর্থায়ন নিয়েও অনিশ্চয়তা
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, তারল্য সংকট এবং অনেক ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার কারণে শিল্পঋণ পাওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বিনিয়োগের মূলধন নয়, শিল্প পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর মূলধন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ অনুমোদনে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
রিয়াদ মাহমুদের মতে, ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন বিনিয়োগ করলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।
ডলার সংকট ও বাড়তি আমদানি ব্যয়
বাংলাদেশের অধিকাংশ উৎপাদনশীল শিল্প আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ডলার বাজারের অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি। এলসি খোলা আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে কাঁচামাল আমদানির ব্যয়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দামের ওঠানামা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। কারণ উৎপাদন ব্যয় আগে থেকে নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
নীতিগত অস্থিরতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত
কর, শুল্ক ও বাণিজ্যনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের অভিযোগও করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, একটি শিল্পে বিনিয়োগ মানে ১০ থেকে ১৫ বছরের পরিকল্পনা। কিন্তু নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
মানোয়ার হোসেনের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন না হলে বিনিয়োগে গতি ফিরবে না।
বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে অনেক পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। নির্মাণ, আবাসন, ভোগ্যপণ্য ও মাঝারি শিল্পে এর প্রভাব বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে চাহিদা না বাড়লে নতুন বিনিয়োগও বাড়বে না। কারণ উদ্যোক্তারা তখনই নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেন, যখন ভবিষ্যৎ বাজার সম্পর্কে তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও সতর্ক
দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন নতুন প্রকল্পে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি তারা নীতিগত ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না।
সবচেয়ে বড় সংকট আস্থার
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, আস্থার। তারা বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না। ফলে নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বড় শিল্প প্রকল্পে অর্থ লগ্নির পরিবর্তে অধিকাংশ উদ্যোক্তা অপেক্ষার কৌশল বেছে নিয়েছেন।
তাদের মতে, সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামানো, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কর ও বিনিয়োগনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগে আবারও গতি ফিরতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ নন; তারা কেবল অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। আর এই আস্থার সংকট কাটানোই এখন দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।