দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং দিন যত যাচ্ছে, সংসারের খরচের বোঝা ততই ভারী হচ্ছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা— প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রতিটি মাস যেন নতুন করে টিকে থাকার লড়াই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মান, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের ওপর সরাসরি আঘাত হানে। আর যখন মূল্যস্ফীতির চেয়ে আয় কম বাড়ে, তখন মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। বাংলাদেশে বর্তমানে ঠিক এমন পরিস্থিতিই বিরাজ করছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির দুষ্টচক্রে সাধারণ মানুষ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে এলেও তা টানা তিন মাস ধরে ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় যে গতিতে বাড়ছে, পণ্যের দাম বাড়ছে তার চেয়েও দ্রুত।
এর ফলে প্রতি মাসেই সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আগে যে অর্থে এক সপ্তাহের বাজার করা যেত, এখন সেই টাকায় কয়েক দিনের বেশি চলা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে মাছ-মাংস কম খাচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় কমাচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে।
বাজারে নেই স্বস্তি
জুলাই মাসেও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। দেশি পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবারও বেড়েছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ, মাংস ও সবজির দামও উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে।
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও অনেক পণ্যের দাম কমছে না। বরং ঈদকেন্দ্রিক মূল্যবৃদ্ধির পর অনেক পণ্যের দাম আগের অবস্থায় আর ফিরে আসেনি। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ছড়িয়ে পড়ছে সব খাতে
পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে উৎপাদন থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয় এবং খাদ্য ও সেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। ফলে আগামী মাসগুলোতেও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ পর্যায়েই থাকতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা
এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (জুলাই ২০২৬) অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
একসময় শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখে পড়লেও কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশে টানা চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সংকুচিত হচ্ছে।
বেতন বাড়েনি, বেড়েছে শুধু খরচ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ থাকলেও বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মীর বেতন অপরিবর্তিত রয়েছে।
ফলে একই বাজারে গিয়ে সবাইকে একই দামে পণ্য কিনতে হলেও আয়ের বৈষম্য বাড়ছে। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিন্ডিকেট ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক বাজার বা জ্বালানি ব্যয় নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতি দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ। কিছু পণ্যে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি এবং দুর্বল বাজার তদারকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এসব কারণে উৎপাদন বা সরবরাহে বড় সংকট না থাকলেও অনেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে, যার পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।
অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বা মুদ্রানীতি কঠোর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে।
একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি কমানো, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত ঋণনির্ভর অর্থায়ন থেকে বেরিয়ে আসার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ অতিরিক্ত অর্থের সরবরাহ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে, যার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
স্বস্তির অপেক্ষায় কোটি মানুষ
আজ দেশের কোটি কোটি মানুষের একটাই প্রশ্ন— সাধারণ মানুষের কষ্ট কোথায় গিয়ে থামবে? বাজারে গেলেই বাড়তি খরচ, আয় বাড়ার নিশ্চয়তা নেই, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে অনেকেই এখন সঞ্চয় ভাঙছেন, ঋণ নিচ্ছেন কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদায় কাটছাঁট করছেন।
অর্থনীতির বড় সূচকগুলো যতই উন্নতির ইঙ্গিত দিক না কেন, সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রকৃত অর্থ তখনই থাকবে, যখন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে আসবে, আয় বাড়বে এবং মানুষ আবার স্বস্তির সঙ্গে সংসারের হিসাব মেলাতে পারবে। ততদিন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির এই দীর্ঘ ছায়া নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করেই তুলবে।









