কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হওয়া, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া এবং তরুণদের চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়া, গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতির অনিশ্চয়তা, ডলার ও জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগের খরা দীর্ঘ হয়েছে।
অনেক উদ্যোক্তা আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। সেই প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেটে গেছে প্রায় ছয় মাস বা ১৮০ দিন। এই সময়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের গতি এখনো ফেরেনি। তবে একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ, বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এবং বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করেছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বলছে, বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনো ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ অবস্থানে রয়েছেন। ফলে এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও কার্যকর করা।
ব্যাংকে টাকা আছে, বিনিয়োগের অপেক্ষা
বিনিয়োগের জন্য অর্থের অভাব রয়েছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ হাতে রাখছে। তবে সেই অর্থ নিতে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এখনো সীমিত। এর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধিতে। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। এক বছর আগে জুলাইয়ে এই হার ছিল ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। এর পেছনে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বড় প্রকল্পে উদ্যোক্তাদের অপেক্ষার প্রবণতা রয়েছে।
ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, ব্যাংকে টাকা থাকলেও ভালো ঋণগ্রহীতা বা নতুন প্রকল্পের চাহিদা কম। অন্যদিকে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোও নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক। ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে এক ধরনের ‘দ্বৈত সংকট’। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু উদ্যোক্তার ঋণের চাহিদা কম; আবার ব্যাংকও ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিতে চাইছে না। এই পরিস্থিতি কাটাতে আস্থা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যন্ত্রপাতি আমদানিতে ভবিষ্যতের বার্তা
নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ আগাম সূচক হলো মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। নতুন কারখানা স্থাপন বা পুরোনো কারখানার সক্ষমতা বাড়াতে হলে মেশিনারি আমদানি করতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে ১৮০ কোটি ডলারে নেমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এই তথ্যগুলো অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হলেও ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগও স্পষ্ট করে। কারণ ভোগ্যপণ্য বা জ্বালানি আমদানি বর্তমান চাহিদা মেটায়, আর মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়লে বোঝা যায় উদ্যোক্তারা ভবিষ্যতের উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অর্থ ব্যয় করছেন।
বাংলাদেশের বর্তমান চিত্রে সেই ভবিষ্যৎমুখী বিনিয়োগের প্রবণতা দুর্বল। ফলে এই জায়গাতেই আস্থা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির বড় সুযোগ রয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে সতর্কতা, সম্ভাবনাও আছে
দেশি বিনিয়োগে স্থবিরতার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি এখনো চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট এফডিআই কমেছে ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
তবে এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ২৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন বিদেশি মূলধন কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিকও রয়েছে। মোট এফডিআইয়ের একটি বড় অংশ এসেছে আগে থেকেই বাংলাদেশে থাকা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় এসেছে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলার। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার।
অর্থাৎ বাংলাদেশে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার একটি বড় অংশ আবারও দেশে বিনিয়োগ করছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
‘বিনিয়োগের আগে আস্থা দরকার’
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, গত চার-পাঁচ বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। ব্যাংকে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ থাকলেও উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তার ভাষায়, টাকা থাকলেই বিনিয়োগ হয় না, বিনিয়োগের জন্য আস্থা দরকার।
তিনি মনে করেন, নতুন কারখানা হচ্ছে না, পুরোনো কারখানার সম্প্রসারণও কমেছে। ফলে একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, অন্যদিকে অনেক শিল্পকারখানায় কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। এতে বেকারত্ব ও আয়সংকট আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন, বিনিয়োগ কেবল অর্থের বিষয় নয়; এটি আস্থা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়। ডলার, মূল্যস্ফীতি ও নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে উদ্যোক্তারা বড় ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
উচ্চ সুদে বড় সিদ্ধান্তে অপেক্ষা
বিনিয়োগকারীদের আরেকটি বড় অভিযোগ ঋণের উচ্চ সুদহার। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সুদ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করে লাভজনকভাবে পরিচালনা করা কঠিন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির উচ্চ মূল্য, ডলার বিনিময় হারের অস্থিরতা, এলসি খোলার জটিলতা এবং আমদানি ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোক্তারা সময় নিচ্ছেন। এসব বাধা দূর করতে পারলে বিনিয়োগের সম্ভাবনাও আরও উন্মুক্ত হবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটেও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন অন্যতম বড় বাধা হয়ে উঠেছে জ্বালানি সংকট। শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন শিল্প স্থাপন করা ঝুঁকিপূর্ণ। বিদ্যমান কারখানা চালু রাখতেই যেখানে উদ্যোক্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে নতুন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। তার মতে, নতুন শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়, এমন পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা কেন নতুন বিনিয়োগ করবেন, সেটি বড় প্রশ্ন।
তিনি স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি আমদানি করে সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে
সরকারের প্রথম ছয় মাসকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলছেন না অর্থনীতিবিদরা। বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি সহজ করার উদ্যোগ, একক সেবা ব্যবস্থা বা ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ এবং বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের বেশির ভাগের ফল এখনো দৃশ্যমান হয়নি। তবে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় দেশি বিনিয়োগের আগ্রহ
ছয় মাসের মধ্যে একটি ইতিবাচক দিকও দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ ও লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগে দেশীয় উদ্যোক্তাদের উল্লেখযোগ্য আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিডার হিসাবে, ৪৪টি বন্ধ বা লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার মধ্যে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সুযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে ১৪টি প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠী ৮৬টি বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল, আকিজ, টি কে গ্রুপ, কাজী ফার্মস, ট্রান্সকম, প্যারাগন, নাবিলসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অটোমোবাইল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরবিদ্যুৎ, হালকা প্রকৌশল, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা। দেশের উদ্যোক্তারা পুরোপুরি বিনিয়োগবিমুখ হয়ে যাননি; বরং তারা তুলনামূলক নিরাপদ, প্রস্তুত অবকাঠামো ও বিদ্যমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন।
প্রাণ-আরএফএল ইতোমধ্যে রাজশাহী টেক্সটাইল মিল ও রাজশাহী জুট মিল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে চালু করেছে। সেখানে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি দ্রুত কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগে প্রয়োজন বাস্তব সংস্কার
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক রোডশো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল, সব মিলিয়ে প্রচারণার ঘাটতি নেই। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রচারণা থেকে বাস্তব বিনিয়োগে যাওয়ার পথ এখনো দীর্ঘ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত পাঁচটি বিষয় দেখেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসার খরচ এবং বিনিয়োগের অর্থ ও মুনাফা সহজে দেশে আনা-নেওয়ার নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের দুর্বলতা এখন এসব ক্ষেত্রেই। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীরা এখনো পুরোপুরি আস্থা ফিরে পাননি।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান
বিনিয়োগের স্থবিরতা শুধু ব্যবসার সমস্যা নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, মানুষের আয় ও সামাজিক স্থিতিশীলতায়। নতুন কারখানা না হলে নতুন চাকরি তৈরি হবে না। পুরোনো কারখানা সম্প্রসারণ না হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে না। বরং জ্বালানি সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও চাহিদার দুর্বলতার কারণে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমালে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের চাপ বাড়তে পারে। তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরি না পেলে অর্থনৈতিক হতাশার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে। তাই বিনিয়োগের গতি ফেরানো শুধু ব্যবসার জন্য নয়, নতুন কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ানোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
১৮০ দিনের হিসাবে সম্ভাবনার জায়গাগুলো
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, ব্যাংকে বিপুল তারল্য রয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অর্থের জোগানের একটি ভিত্তি তৈরি আছে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন হলে ব্যাংকের অলস অর্থ উৎপাদনশীল খাতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তৃতীয়ত, নতুন কারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম প্রধান সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। ফলে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এই জায়গায় বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
চতুর্থত, নতুন বিদেশি মূলধন বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে আগে থেকেই বাংলাদেশে থাকা বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে। পঞ্চমত, নিট এফডিআই প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে। ফলে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাস্তব সংস্কারের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ষষ্ঠত, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বিনিয়োগকারীদের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই সংকট কাটাতে পারলে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিকগুলোর একটি হলো বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যাপক আগ্রহ। পাশাপাশি সরকারও বিনিয়োগবান্ধব বিভিন্ন সংস্কারে এগোচ্ছে।
এখন কী করতে হবে?
বিনিয়োগ ফেরাতে সরকারের সামনে তাই শুধু নতুন ঘোষণা দেওয়ার চেয়ে বাস্তব বাধা দূর করাই জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পাঁচটি জায়গায় অগ্রাধিকার দিতে হবে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ, ঋণের সুদ কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা, আমদানি ও এলসি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সরকারি সেবার সময় কমানো।
এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসায়িক পরিবেশে আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। কারণ বিনিয়োগকারী শুধু আজকের পরিস্থিতি দেখেন না; তিনি আগামী পাঁচ, দশ বা পনেরো বছরের সম্ভাবনা বিবেচনা করেই কারখানা স্থাপন করেন।
সরকারের সামনে এখন সুযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছর থেকে যে বিনিয়োগ খরা শুরু হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা আরও গভীর হয়েছে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হলেও প্রথম ১৮০ দিনে সেই আশা এখনো বড় বিনিয়োগে পুরোপুরি রূপ নেয়নি।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশি উদ্যোক্তারা এখনো অপেক্ষায়, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সতর্ক এবং ব্যাংকের অর্থের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব, বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানির মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ এবং সরকারের বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে।
সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বাড়বে। আর আয় ও কর্মসংস্থানের গতি ফিরলে অর্থনীতিতেও কাঙ্ক্ষিত প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে।