দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন শুধু বড় অঙ্কের সমস্যা নয়, এটি কয়েকটি ব্যাংকের জন্য অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। মোট ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে ব্যাংক খাতের প্রায় ৭২ শতাংশ খেলাপি ঋণ। এসব ব্যাংকের বেশির ভাগই নানা অনিয়ম, জালিয়াতি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের রয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক খাতে মোট ঋণস্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শীর্ষে থাকা ব্যাংকগুলোর কয়েকটির খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশের কাছাকাছি বা তারও বেশি। অর্থাৎ এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের বড় অংশ থেকেই এখন নিয়মিত আয় আসছে না।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকেই ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি
পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ব্যাংকটির মোট ঋণস্থিতি প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকটিতে প্রভিশন ঘাটতিও তৈরি হয়েছে।
এরপরই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯৭ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকটির বড় অংশের ঋণ এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময় বিতরণ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। এরপর অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৪৪ শতাংশের মতো এখন খেলাপি।
শীর্ষ ১০-এর অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকের ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ একসঙ্গে হিসাব করলে তা ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
অনিয়মের ঋণ এখন খেলাপি
ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো আগের সময়ে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবে ঋণ বিতরণ। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কয়েকটি ব্যাংক নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, আরামিট, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ, হলমার্কসহ বিভিন্ন আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপি।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, এসব ঋণের অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদ নেই। আবার বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন, কেউ কারাগারে, কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে আদালতের মাধ্যমে ডিক্রি পেলেও অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশই শীর্ষ পাঁচটি গ্রুপের কাছে রয়েছে। এসব ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই জেলে আছেন অথবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড ঋণ পরবর্তী সময়ে ফান্ডেড ঋণে পরিণত হওয়ায় পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদও নেই।
তিনি জানান, খেলাপি ঋণ আদায়ে মেলা আয়োজন, টাস্কফোর্স গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ঋণই বড় চাপ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশই এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বলে ব্যাংকটির তথ্য থেকে জানা যায়। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের বড় অংশই ওই গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেন, “খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ঋণ নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। এর প্রভাব আগামী প্রান্তিকে দেখা যাবে।” এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণ বাদ দিলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩ শতাংশের নিচে রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে সামগ্রিকভাবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে ইসলামী ব্যাংক এখন দেশের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংক।
ছাড়ের পরও কমছে না খেলাপি
খেলাপি ঋণ কমাতে গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা ধরনের সুযোগ দিয়েছে। পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধের সুযোগ, সুদ মওকুফ এবং বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ নিয়মিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এমনকি ১০ বছর মেয়াদে বিশেষ পুনঃতফসিল করা ঋণকে নতুন করে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে নিয়মিত করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখতে বিশেষ প্রণোদনা তহবিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
কিন্তু এত সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে তা আবার ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে— বারবার ঋণ পুনঃতফসিল ও ছাড় দিয়ে আসলে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হচ্ছে কিনা।
শিথিল নীতিতে ভুল বার্তার আশঙ্কা
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম থেকে সরে এসে শিথিলতা দেখানো হলে ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
তার মতে, অতীতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। বরং একই ঋণগ্রহীতাকে বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের মধ্যেই ভুল বার্তা গেছে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বড় ঋণখেলাপিরা যদি মনে করেন ঋণ পরিশোধ না করলেও ভবিষ্যতে আবার সুযোগ পাওয়া যাবে, তাহলে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ আরও কমবে। কর্মসংস্থান রক্ষার প্রয়োজন থাকলে অযোগ্য ব্যবসায়ীকে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন না করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার পক্ষেও মত দেন তিনি।
দরকার কঠোর আদায় ব্যবস্থা
ব্যাংকারদের মতে, এখন শুধু পুনঃতফসিল বা ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করে দ্রুত আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থঋণ আদালতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, বন্ধকি সম্পদ দ্রুত বিক্রির কার্যকর ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়ার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন— এসব উদ্যোগ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
কারণ খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ, ব্যাংকের মূলধন, নতুন বিনিয়োগ, ঋণের সুদহার এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা জড়িত।
৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের মধ্যে যখন প্রায় ৭২ শতাংশ মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত, তখন স্পষ্ট হয়— সমস্যাটি পুরো ব্যাংক খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই; বরং নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের দুর্বলতা ও অতীতের অনিয়মই সংকটকে তীব্র করেছে।
তাই এখন প্রশ্ন শুধু খেলাপি ঋণ কত— তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে অর্থ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেছে, তার কতটা ফেরত আনা সম্ভব এবং কত দ্রুত সেই অর্থ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর ওপরই নির্ভর করছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ এবং সামগ্রিক ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা।