ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থার আওতায় বিশেষায়িত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠান একাধিক প্যানেল গঠন করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী ঋণ আদায়ে কাজ করবে।
মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্যানেলে কোনও রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি থাকতে পারবেন না। একইসঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জালিয়াতি, নৈতিক স্খলন বা এ ধরনের গুরুতর অনিয়মের কারণে চাকরি বা পেশা থেকে বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তি কিংবা কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণখেলাপিকেও প্যানেলে রাখা যাবে না।
খেলাপি ঋণ আদায়ের বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হারে কমিশন পাবে। তবে তাদের কার্যক্রমের ওপর সার্বিক নজরদারি থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ বিষয়ে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির আওতায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ও কার্যক্রম পরিচালনা’ সংক্রান্ত নীতিমালা সার্কুলার আকারে জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালাটি দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব খেলাপি ঋণ প্রচলিত প্রক্রিয়ায় আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেসব ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো যাবে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করে বিরোধ নিষ্পত্তি ও ঋণ আদায়ে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তারল্য, মূলধন ও আর্থিক সক্ষমতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একইসঙ্গে ঋণ আদায়ের জন্য বিপুলসংখ্যক মামলা হওয়ায় আদালতের ওপরও চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় মামলা নির্ভরতার বাইরে গিয়ে দ্রুত ও কার্যকর উপায়ে ঋণ আদায়ের পথ তৈরি করতেই মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেভাবে কাজ করবে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান
নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী বা খেলাপি ঋণের তথ্য দেওয়া হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিরোধ নিষ্পত্তি ও ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নেবে।
তবে এ ধরনের কাজে ঋণগ্রহীতার আর্থিক ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি গোপনীয়তার শর্ত ভঙ্গ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সময় আর্থিক খাতের গ্রাহকদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকার করতে হবে।
কোনও প্রতিষ্ঠান স্বার্থের সংঘাতের তথ্য গোপন করলে, গোপনীয়তা রক্ষার শর্ত ভঙ্গ করলে কিংবা নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তার তালিকাভুক্তি স্থগিত করতে পারবে।
গুরুতর অনিয়মে তালিকা থেকে বাদ
কোনও তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা বা অসদাচরণে জড়িত হলে তাকে তালিকা থেকে বাদ দিতে পারবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে ধারাবাহিকভাবে পেশাগত মানদণ্ড অনুযায়ী সেবা দিতে ব্যর্থ হলেও প্রতিষ্ঠানটির তালিকাভুক্তি বাতিল করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করা, স্থগিতাদেশের কারণ নিরসনে ব্যর্থ হওয়া কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও সুনাম ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনও কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তবে কোনও প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে তাকে কারণ দর্শানোর যুক্তিসংগত সুযোগ দিতে হবে।
কোনও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ফলে চলমান ঋণ আদায় কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারবে। প্রয়োজনে চলমান কার্যক্রম অন্য তালিকাভুক্ত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশও দেওয়া যাবে।
প্যানেলে থাকতে লাগবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা
নীতিমালায় মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের প্যানেলে থাকা ব্যক্তিদের যোগ্যতার বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের আওতায় মধ্যস্থতা সেবা দেওয়ার জন্য গঠিত প্রতিষ্ঠানের প্যানেলে থাকা ব্যক্তিদের ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি, আইন পেশা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা কিংবা বিচারকার্যে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অর্থ আত্মসাৎ, দুর্নীতি, জাল-জালিয়াতি কিংবা নৈতিক স্খলনের অভিযোগে চাকরি বা পেশা থেকে বরখাস্ত হওয়া কোনও ব্যক্তি প্যানেলে থাকতে পারবেন না। একইভাবে কোনও ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির ঋণখেলাপি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিকেও এ কাজে যুক্ত করা যাবে না।
এর ফলে মধ্যস্থতাকারী প্যানেলের সদস্যদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবছর দিতে হবে কার্যক্রমের প্রতিবেদন
মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর তাদের কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা দিতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশ্লিষ্ট ঋণ ও ঋণগ্রহীতার তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। কোনোভাবেই এসব তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকাশ করা যাবে না।
মামলা কমিয়ে দ্রুত ঋণ আদায়ের লক্ষ্য
ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আদায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে মামলা দায়ের থেকে শুরু করে আদালতের বিভিন্ন ধাপ পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে একদিকে ব্যাংকের অর্থ আটকে থাকে, অন্যদিকে মামলা বাড়তে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংকের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করে দ্রুত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হবে। এর ফলে খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মামলা কমবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলাপি ঋণ আদায়ে মধ্যস্থতা ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও এর আগে সীমিত পরিসরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ ছিল। এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার মাধ্যমে সেটিকে একটি কাঠামোবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের একটি অংশ দ্রুত আদায়, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ঋণসংক্রান্ত মামলার চাপ কমাতে তা ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।









